Current Bangladesh Time
মঙ্গলবার সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৭ ৫:৩৪ অপরাহ্ন
Barisal News
Latest News
প্রচ্ছদ » আগৈলঝাড়া, গলাচিপা, বরিশাল, বরিশাল সদর, সংবাদ শিরোনাম » গৌরনদী হানাদার মুক্ত হয় ২২ ডিসেম্বর
২১ ডিসেম্বর ২০১৬ বুধবার ৩:৫৪:৪৪ অপরাহ্ন
Print this E-mail this

গৌরনদী হানাদার মুক্ত হয় ২২ ডিসেম্বর
আসাদুজ্জামান রিপন, গৌরনদী থেকে


গৌরনদী হানাদার মুক্ত হয় ২২ ডিসেম্বর

তৎকালীন সময়ে পাক হানাদারদের স্থায়ী ক্যাম্প (বর্তমানে সরকারি গৌরনদী কলেজ)

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশের বিজয় ঘোষিত হলেও বরিশালের গৌরনদী উপজেলা পাকহানাদার মুক্ত হয়েছিলো ২২ডিসেম্বর। বাংলাদেশের মধ্যে সর্বশেষ বিজয় পতাকা উড়েছিলো গৌরনদী।

টানা ২৮দিন মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনীর যৌথ আক্রমণের পর ওইদিন গৌরনদী কলেজ ক্যাম্পে অবস্থানরত শতাধিক পাক সেনা মিত্র বাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করেছিল। হানাদার বাহিনী অত্র এলাকায় নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পাঁচ সহস্রাধিক নিরীহ জনসাধারণকে হত্যা ও তিন শতাধিক মা-বোনের ইজ্জত হরণ করে।

ওই বছরের ২৫ এপ্রিল হানাদাররা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক দিয়ে এ জনপদে প্রবেশের মাধ্যমে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। তাদের প্রবেশের খবর শুনে স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মীরা গৌরনদীর সাউদের খালপাড় নামকস্থানে তাদের প্রতিহত করার জন্য অবস্থান নেয়। হানাদাররা সেখানে পৌঁছলে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পরে।

হানাদারদের সাথে সেইদিন সম্মুখ যুদ্ধে প্রথম শহীদ হন নাঠৈর সৈয়দ হাসেম আলী, চাঁদশীর পরিমল মন্ডল, গৈলার আলাউদ্দিন ওরফে আলা বক্স ও বাটাজোরের মোক্তার হোসেন। মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে ওইদিন আটজন পাক সেনা নিহত হয়। এটাই ছিল বরিশালে স্থলপথে প্রথম যুদ্ধ এবং এরাই প্রথম শহীদ। বরিশালে প্রবেশদ্বার মুখে পাক হানাদাররা গৌরনদীর খাঞ্জাপুরে মোস্তান নামক এক পাগলকে গুলি করে হত্যা করেছিল।

সেইদিনের প্রত্যক্ষদর্শী যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সৈয়দ মনিরুল ইসলাম বুলেট ছিন্টু জানান, ওইদিন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আটজন পাকিস্তানি সেনা নিহত হবার পর তারা ক্ষিপ্ত হয়ে এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। তাদের গুলিতে ওইদিন দুই শতাধিক লোক মারা যায়। হানাদাররা গৌরনদী বন্দরসহ শত শত ঘর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। মে মাসের প্রথম দিকে পাকবাহিনী গৌরনদী কলেজে স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে।

ক্যাম্পে ছিল আড়াই শতাধিক সৈন্য ও ৫০ জনের মতো রাজাকার, আলবদর। বাটাজোর, ভুরঘাটা, মাহিলাড়া, আশোকাঠী, কসবাসহ প্রতিটি ব্রিজে পাক মিলিটারীদের বাঙ্কার ছিলো। উত্তরে ভুরঘাটা, দক্ষিণে উজিরপুরের শিকারপুর, পশ্চিমে আগৈলঝাড়ার পয়সারহাট, পূর্বে মুলাদী পর্যন্ত গৌরনদী কলেজ ক্যাম্পের পাকসেনাদের নিয়ন্ত্রণে ছিলো। এদের দোসররা ছিলো এলাকার রাজাকার, আলবদর ও পিচ কমিটির সদস্য।

সূত্রমতে, হত্যাকান্ড, লুটতরাজ, নারী ধর্ষণসহ নানা কাজে এরা হানাদারদের সহযোগীতা করতো। পাক সেনারা গৌরনদী কলেজের উত্তর পার্শ্বে একটি কূপ তৈরি করে সেখানে লাশ ফেলতো। কলেজের উত্তর পার্শ্বে হাতেম পিয়নের বাড়ির খালপাড়ের ঘাটলায় মানুষ জবাই করে খালের পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হতো। গালর্স হাইস্কুলের পার্শ্ববর্তী পুল ও গয়নাঘাটা ব্রিজের উপর বসে মানুষ খুন করে খালে ফেলতো পাক সেনারা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ননায় আরও জানা গেছে, শত শত লোক ধরে এনে ওইসবস্থানে হত্যা করা হতো।

গৌরনদীর ইতিহাসে সবচেয়ে লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটেছিলো ১৯৭১ সালের ১৫ মে। ১৪ মে দোনারকান্দিতে চিত্ত বল্লভের নেতৃত্বে স্থানীয় লোকজন ঢাল শুড়কী নিয়ে পাক হানাদারদের মুখোমুখি ঝাঁপিয়ে পরে চারজন পাক সেনাকে কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় পাকসেনারা ক্ষিপ্ত হয়। কসবার হযরত মল্লি¬ক দুত কুমার পীর সাহেবের মাজার সংলগ্ন রাস্তা দিয়ে চাঁদশী হয়ে পশ্চিম দিকে শতাধিক সেনা অগ্রসর হয়ে জনতার উপর এলএমজির ব্রাশ মারে এবং গুলি করে পাখির মতো মানুষ মারতে থাকে।

পাক সেনাদের ভয়ে সেদিন আশেপাশের সাত থেকে আটটি গ্রামের ৪/৫ হাজার মানুষ এদিক সেদিক ছুটাছুটি করতে থাকে। রাংতার উত্তর পাশের সুবিশাল ক্যাতনার বিলে ধান ও পাট ক্ষেতের মধ্যে আশ্রয় নিতে এসে পাক বাহিনীর গুলিতে ওইদিন পাঁচ শতাধিক লোক প্রাণ হারায়। নরপশুদের কবল থেকে সেদিন পশুরাও রেহাই পায়নি। শত শত ঘর বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ফলে বহু গরু-ছাগল ও হাঁস মুরগী মারা যায় ওইদিন। ২ আষাঢ় কোদালধোয়া নামকস্থানে দি রয়েল বেঙ্গল সার্কাসের মালিক লক্ষণ দাস ও তার একটি পোষা হাতিকে পাকসেনারা এক সাথে গুলি করে হত্যা করে।

জুলাই মাসে বাটাজোরে নিজাম বাহিনীর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে ১০জন পাকসেনা মারা যায় এবং চারজন জীবিত ধরা পরে। পাকসেনাদের গতিরোধ করার জন্য ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের আশোকাঠী বাসষ্ট্যান্ডের ব্রিজ মুক্তিযোদ্ধারা ভেঙ্গে দিয়েছিল অক্টোবর মাসের শেষের দিকে। মুক্তিযুদ্ধের ৯নং সেক্টরের গ্রুপ কমান্ডার নিজাম উদ্দিন আকনের নেতৃত্বে ব্রিজটি সম্পূর্ণরূপে উড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এর কয়েকদিন পর নিজাম উদ্দিনের নেতৃত্বে হোসনাবাদে পাকবাহিনীর অস্ত্র ও মালবাহী বোটে হামলা চালিয়ে প্রচুর অস্ত্র উদ্ধার করেছিল মুক্তিবাহিনীরা। ওইদিন যুদ্ধে প্রায় ২৫জন পাকসেনা মারা যায়।

গৌরনদীর কসবা এলাকার আল্লfহর মসজিদের কাছে ২৭ নভেম্বর পাক বাহিনীর সাথে বন্দুক যুদ্ধে মোঃ ছাত্তার কমান্ডার গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। পরেরদিন একইস্থানে দক্ষিণ চাঁদশীর আলতাফ হোসেন শহীদ হন। গৌরনদী এলাকার কৃষক শ্রমিক নেতা আব্দুর রব সেরনিয়াবাত (সাবেক মন্ত্রী), আব্দুল করিম সরদার (সাবেক এমএলএ) সর্বপ্রথম স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করেন। ওইদলের প্রধান ছিলেন গৈলার মতি তালুকদার, তার সহযোগী ছিলেন পতিহারের নুরু গোমস্তা।

কোটালীপাড়ার মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত উদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত হয় হেমায়েত বাহিনী। তিনি সর্বপ্রথম অত্র অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। তার নেতৃত্বে আগৈলঝাড়ার শিকির বাজার, রামশীল ও পয়সারহাটে পাক সেনাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখে যুদ্ধ হয়। পরবর্তীতে গৌরনদীর হোসনাবাদ গ্রামের নিজাম উদ্দিন আকনের নেতৃত্বে ৬০ থেকে ৭০ জন মুক্তিবাহিনীর একটি দল ভারত থেকে প্রশিক্ষণ শেষে গৌরনদীতে আসেন। নিজাম উদ্দিন কৃতিত্বের সাথে স্বাধীনতা যুদ্ধে ৯নং সেক্টরের গ্রুপ কমান্ডার হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন।

সর্ব শেষে মুজিব বাহিনীর একটি দল ভারত থেকে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ওই দলের নেতৃত্বে ছিলেন আবুল হাসানাত আব্দুল্ল¬াহ (সাবেক চীফ হুইপ), তার চাচাত ভাই রকিব সেরনিয়াবাত, কসবার ফজলুর রহমান হাওলাদার, বিল্বগ্রামের মেজর শাহ আলম তালুকদার ছিলেন তার সহযোগী।

গৌরনদী কলেজে নিজাম বাহিনী ও মুজিব বাহনীর যৌথ প্রচেষ্টায় আক্রমণ চালানো হয়েছিল। পশ্চিম দিক থেকে মুজিব বাহিনী ও পূর্বদিক থেকে নিজাম বাহিনী আক্রমণ করে। দীর্ঘদিন যুদ্ধের পর পাক সেনারা পরাস্ত হয়ে ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনীর মেজর ডিসি দাসের মাধ্যমে মুক্তিবাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণ করে।

স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বশেষ হানাদার মুক্ত গৌরনদীতে ১৯৭৫ সালের ৭ মে তৎকালীন মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি সৌধর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে গেলেও দীর্ঘ বছর পেরিয়ে গেলেও গৌরনদীতে আজও নির্মিত হয়নি কোন স্মৃতি সৌধ। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা গৌরনদীতে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষনে দ্রুত স্মৃতি সৌধ নির্মাণের জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এদিকে দিবসটি পালন উপলক্ষে অদ্যবর্ধি সরকারি উদ্যোগে কোন কর্মসূচি পালন করা না হলেও প্রতিবছরের ন্যায় এবারও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের উদ্যোগে র‌্যালি, আলোচনা সভা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া-মিলাদ ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।

সম্পাদনা: বরি/প্রেস/মপ

শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগ
প্রস্তুত পিলার, যে কোন দিন বসছে পদ্মা সেতুর স্প্যান
বরিশাল জুড়ে বৃষ্টি, বন্দরে ৩ নম্বর সংকেত
বরিশালে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীর বাসায় চুরি
বরিশাল ছাত্রলীগের সম্পাদক অসীম বহিষ্কার
পিরোজপুরে শিশু ধর্ষণ চেষ্টায় যুবক গ্রেপ্তার
Recent: Mayor Hiron Barisal
Recent: Barisal B M College
Recent: Tender Terror
Kuakata News

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
আমাদের বরিশাল ২০০৬-২০১৪

প্রকাশক: মোয়াজ্জেম হোসেন চুন্নু, সম্পাদক: রাহাত খান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: মোঃ জিয়াউল হক
৪৬১ আগরপুর রোড (নীচ তলা), বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, ই-মেইল: [email protected]