Current Bangladesh Time
বুধবার ফেব্রুয়ারী ২২, ২০১৭ ১:১৪ পূর্বাহ্ন
Barisal News
Latest News
২৩ ডিসেম্বর ২০১৬ শুক্রবার ১২:৩২:৪৫ অপরাহ্ন
Print this E-mail this

বরিশাল-ভোলা এক হয় না!
অনলাইন ডেস্ক


বরিশাল সংবাদ মানচিত্রবেড়িবাঁধ, তবে পাকা। অনেক শহুরে রাস্তার চেয়ে মসৃণ। বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর হঠাৎ রাস্তা ভাঙা এবং এরপর একেবারেই কাঁচা। ব্যবধান পরিষ্কার। ভোলার সীমানা পেরিয়ে গেছে মোটরসাইকেল।

জায়গাটি বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার আলিমাবাদ ইউনিয়ন। মানচিত্রে ভোলার ঠিক মাথার ওপর টিকলির মতো। তবে সোনার টিকলি নয়। এখানে শরীরটাই (ভোলা) বরং সোনার। টিকলিটা মাটির। ইউনিয়নটি প্রশাসনিকভাবে বরিশাল জেলার অংশ। কিন্তু ভৌগোলিকভাবে এটি সংযুক্ত ভোলার সঙ্গে। ইলিশা আর তেঁতুলিয়া নদী বরিশালের সঙ্গে ইউনিয়নটির এই ভৌগোলিক বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে।

বেড়িবাঁধে কথা হলো ষাটোর্ধ্ব সুলতান আহম্মদ ফরাজীর সঙ্গে। জানালেন, আলিমাবাদ ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ড তেঁতুলিয়া নদীর ওপারে। চেয়ারম্যান রশীদ কাজী থাকেন সেখানে, শ্রীপুরে। তবে সম্প্রতি ভোলার সঙ্গে যুক্ত আলিমাবাদের ছয় ওয়ার্ডকে ভেঙে নয়টি ওয়ার্ড করে একে আলাদা ইউনিয়ন ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে নদীর ওপারের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের সুতো আরও দুর্বল হচ্ছে। নতুন এই ইউনিয়নে এখনো নির্বাচন হয়নি। ওপারের রশীদ কাজী এখনো তাঁদের চেয়ারম্যান।

সুলতান আহম্মদ জানালেন, জমি রেজিস্ট্রি করতে তাঁদের যেতে হয় ইলিশা পাড়ি দিয়ে পাতারহাট পৌরসভায়। আর খাজনা দিতে যেতে হয় তেঁতুলিয়া পাড়ি দিয়ে শ্রীপুরে। কিন্তু বিয়েশাদি, লেখাপড়া, বাজারঘাট, ব্যাংক-বিমা, চিকিৎসা—সব হয় ভোলায়। ভোলায় গিয়ে বাজার করে এক ঘণ্টায় ফেরত আসা যায়। কিন্তু নদী পেরিয়ে মেহেন্দিগঞ্জে সকালে গেলে আসতে আসতে রাত। পাতারহাটে গেলে একটা পুরো দিন শেষ হয়ে যায়।

কৃষক হাবীবুর রহমান জানালেন, তাঁদের এলাকার রাস্তাঘাট কাঁচা। এখানকার ছেলেমেয়েদের বেশির ভাগ এসএসসি পাস করে কলেজে পড়তে ভোলায় যায়। সাংস্কৃতিক দূরত্ব থাকলেও তাঁদের আত্মীয়তাও ভোলার মানুষের সঙ্গে বেশি হচ্ছে।

কথা বলতে বলতে মানুষের জটলা বাড়ে। উঠে আসে আরও সমস্যার কথা। সামাজিক সমস্যা যেমন বাল্যবিবাহ, নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ইভ টিজিং—এগুলোর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই এখানে। ফলে এসব বাড়ছে। এসব অপরাধের ক্ষেত্রে থানার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কিছু মাতবর পকেট ভারী করেন বলেও অভিযোগ আছে।

তরুণ শিক্ষক শহীদ আফ্রিদি নোমান বলেন, ‘আমি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে দেড় বছর কাজ করেছি। পরে সামাজিকভাবে এমন চাপে পড়েছি যে, সরে আসতে বাধ্য হয়েছি।’ পাতাবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ন্যাশনাল সার্ভিসের আওতায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে আছেন নোমান। হাঁটতে হাঁটতে বিদ্যালয় চলে এসেছে। একই জায়গায় একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জায়গায় অস্থায়ী টিনের ঘরে চলছে দেশনেত্রী শেখ হাসিনা মহাবিদ্যালয়ের ক্লাস।

পাতাবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কক্ষে পাওয়া গেল প্রধান শিক্ষক মো. নিজামুল হক, সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. শাহজাহানসহ কয়েকজন শিক্ষককে। ‘এখন নদীর ওই পারের মানুষদের চেয়ে ভালো আছেন’ জানিয়ে নিজামুল হক বললেন, সাংসদ পঙ্কজ দেবনাথই প্রথম সাংসদ, যিনি বিচ্ছিন্ন এই এলাকার দিকে নজর দিয়েছেন। উন্নয়নের অনেক চেষ্টা করছেন। বিদ্যুতের লাইন টানা হয়ে গেছে। সংযোগ বাকি আছে।

তবে বাল্যবিবাহ নিয়ে এই শিক্ষকেরাও উদ্বিগ্ন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে যে ৯৪ জনকে নিয়ে তাঁরা যাত্রা করেছিলেন, দশম শ্রেণিতে এসে তার ৩৩ জনই নেই। ঝরে পড়ারা মূলত ছাত্রী। এদের সবারই বিয়ে হয়ে গেছে।

রফিকুল ইসলাম এই এলাকার কাজি। টেলিফোনে তাঁর সঙ্গে কথা হলো। বললেন, ‘বিয়ে পড়াতে গিয়ে যদি দেখি পাত্রীর বয়স কম তাহলে ফিরে আসি। কিন্তু অভিভাবকেরা মসজিদের ইমাম সাহেবদের দিয়ে বিয়ে পড়িয়ে ফেলেন। আবার আশপাশের ইউনিয়নে গিয়েও বিয়ে পড়ানো হয়।’ তিনি দাবি করেন, এ পর্যন্ত এক শর মতো বাল্যবিবাহ তিনি না পড়িয়ে ফেরত এসেছেন। তবে কারও বিয়েই আটকে থাকেনি। কেউ না কেউ পড়িয়েছেন।

ভোলার সঙ্গে সংযুক্ত হলে আলিমাবাদের প্রশাসনিক সমস্যা কিছু কমত কি না? ইউপি মেম্বার মো. সবুজ হাওলাদার বললেন, ভোলার সঙ্গে যাতায়াত ভালো। কিন্তু সাংস্কৃতির পার্থক্য প্রবল। বরিশাল-ভোলা এক হয় না।

ভোলা-বরিশালের সম্পর্ক নিয়ে কটি টুকরো কথা—বরিশাল বিভাগের পাঁচ জেলার সবাই বলে ‘আমার বাড়ি বরিশাল’। কিন্তু ভোলার মানুষ বলে ‘আমার বাড়ি ভোলা’। একজন বললেন, তাঁরা এখন ভোলা থেকে ছেলের জন্য বউ আনেন। কিন্তু মেয়ে বিয়ে দেন বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে। কারণ, ভোলার ছেলেদের ডিমান্ড (যৌতুক) বেশি। আবার ভোলার লোকেরা মৌসুমের সময় মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে গাড়ি ভরে আম-কাঁঠাল পাঠায়।

পাতাবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. শাহজাহানও ভোলা-বরিশালের বিষয়ে বেশ রক্ষণশীল। বললেন, ‘ভোলাইয়ারা আমাদের ওপর অনেক অত্যাচার করেছে। আমাদের জমিজমা নিয়ে গেছে। তিনবার তো তাদের সঙ্গে আমাদের সরাসরি বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে। সব যুদ্ধে ভোলার প্রশাসন তাঁর লোকজনের পক্ষে বন্দুক ধরেছে। তারা আমাদের শ্যামপুর, মেদুয়া, মনসা, পূর্বগাজী, চরপক্ষীয়া, চর জব্বার মৌজা ভোলার সঙ্গে কেটে নিয়ে গেছে। সেখানে সব আমাদের লোকজনের জমি ছিল। গজারিয়ার চরের ১ হাজার ৬০০ একর জমি নিয়ে এখনো ভোলার মানুষের সঙ্গে আমাদের মামলা চলছে।’

যে জায়গাটিতে এখন আলিমাবাদ ইউনিয়ন, ৩০-৩৫ বছর আগে এখানেই ছিল তেঁতুলিয়া নদী। কিন্তু তেঁতুলিয়া ভেঙে মেহেন্দিগঞ্জের দিকে সরে গেছে। আর ভোলার সঙ্গে চর হিসেবে জেগে উঠেছে আলিমাবাদ। শিক্ষক শাহজাহানের ৪৫ কানি জমি তেঁতুলিয়ার পেটে গেছে। সঙ্গে গেছে সাড়ে চার হাজার নারকেল গাছ। আড়াই লাখ সুপারি গাছ। ফলে তাঁর কষ্টটা অনেক গভীর।

কিন্তু তরুণেরা তো মনে করে ভোলার সঙ্গে মিলে গেলে তাঁদের প্রশাসনিক ঝামেলা শেষ হয়ে যায়। শাহজাহানও মনে করেন তরুণ প্রজন্ম হয়তো একদিন তা-ই করবে। কিন্তু বয়স্কদের পক্ষে ভোলায় বিলীন হওয়া মানসিকভাবে কঠিন। এ ক্ষেত্রে ওই প্রজন্মের শর্ত হলো—যে ছয়টি মৌজা মেহেন্দিগঞ্জ থেকে কেটে নেওয়া হয়েছে, তা এই ইউনিয়নকে ফেরত দিতে হবে। আর গজারিয়ার চরের ১ হাজার ৬০০ একর জমি তাঁদের দিয়ে দিতে হবে। তবে মানুষের সুখ-সুবিধা বিবেচনা করে শেষ সিদ্ধান্ত তো সরকারকেই নিতে হবে।

জানতে চাইলে ভোলার জেলা প্রশাসক মোহাং সেলিম উদ্দীন বলেন, ‘মানুষের মঙ্গলের কথা চিন্তা করলে তো এই একীভূতকরণে দ্বিমত করার কিছু নেই। এটা হলে তাদের আমরা আরও বেশি সেবা দিতে পারব। তবে উদ্যোগটি এলাকার লোকজনের কাছ থেকে আসলে এটা করা সহজ হবে।’

আর বরিশালের জেলা প্রশাসক গাজী মো. সাইফুজ্জামান বললেন, ‘এক জেলার অংশ আরেক জেলায় কেটে নেওয়া বা যুক্ত করার প্রক্রিয়া অনেক জটিল। তার পরও সবকিছু তো মানুষের কল্যাণের জন্য। ওই ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি বা মানুষেরা যদি এমন কোনো আবেদন করেন, তাহলে আমরা তা বিবেচনা করতে পারি।’ সূত্র: প্রথম আলো

সম্পাদনা: বরি/প্রেস/মপ

শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগ
ষষ্ঠ বছরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, আসছেন শিক্ষামন্ত্রী
ভালোবাসার শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা
বরিশালে একুশে ফেব্রুয়ারী ৩৬০ ডিগ্রি ভিডিওতে
ফুল আর শ্রদ্ধায় ভাষা শহীদদের স্মরণ
স্থায়ী শহীদ মিনার ছাড়াই শহীদদের স্মরণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে
Recent: Mayor Hiron Barisal
Recent: Barisal B M College
Recent: Tender Terror
Kuakata News

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
আমাদের বরিশাল ২০০৬-২০১৪

প্রকাশক: মোয়াজ্জেম হোসেন চুন্নু, সম্পাদক: রাহাত খান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: মোঃ জিয়াউল হক
৪৬১ আগরপুর রোড (নীচ তলা), বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, ই-মেইল: [email protected]