AmaderBarisal.com Logo

বেতাগীর শিশুরা শিখছে সাঁতার, রক্ষা করছে জীবন


আমাদেরবরিশাল.কম

২২ আগস্ট ২০১৯ বৃহস্পতিবার ৪:১৭:৪৮ অপরাহ্ন

বেতাগীর শিশুরা শিখছে সাঁতার,  রক্ষা করছে জীবন

সাইদুল ইসলাম মন্টু , বেতাগী থেকে:: দুর্যোগ প্রবণ উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগীতে ১০ হাজার ৫০০ জন শিশু-কিশোর নিরাপদ সাঁতার কার্যক্রমের মাধ্যমে সাঁতার শিখে প্রশিক্ষিত হয়েছে। ফলে পানিতে ডুবা মাহামারী থেকে জীবন রক্ষায় তারা সক্ষমতা অর্জন করেছে। এতে শিশু মৃত্যুর প্রবনতা কমেছে।

সরেজমিনে জানা যায়, সামিয়া, আহম্মেদ জুবায়ের, মো: কামাল, অলি উল্লাহ, মোমেনা, সুরাইয়া ও সিয়াম ৫ থেকে ১০ বছর বয়েসী এই শিশুরা কিছুদিন আগেও সাঁতার জানতো না। এখন অনায়াসেই ছোটখাটো পুকুর-ডোবা সাঁতরিয়ে পার হয়। এসব শিশুদের বাড়ি উপজেলার পৌর এলাকাসহ বিভিন্ন গ্রামে। উপজেলার ১টি পৌরসভা সহ ৭টি ইউনিয়নের ৬৩ টি ওয়ার্ডে চলছে সাঁতার সেখানো কার্যক্রম। ২০১৭ সালের জুলাই থেকে এখানে প্রাথমিকভাবে কার্যক্রম শুরু হলেও ২০১৮-২০১৯ সালে ওই সব শিশু-কিশোরকে সাঁতার সেখানো হয়েছে।

‘যে পানি মানুষের জীবন বাঁচায়, সেই পানির কারনেই অনেক শিশুর জীবন বিপন্ন হয়’- তা অনুধাবন করে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তাবয়ন করছে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন এন্ড রিচার্স, বাংলাদেশ ( সিআইপিআরবি) নামের একটি বেসরকারি সংগঠন। অস্টেলিয়ার দ্যা জজ ইনষ্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথের কারিগরি সহায়তায় এতে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাজ্যের দ্য রয়াল ন্যাশনাল লাইফবোর্ট ইনস্টিটিউশন।

পটুয়াখালী- বেতাগী আঞ্চলিক সড়ক ঘেষে বেতাগী পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ডে দেখা মিললো এমন একটি প্রশিক্ষন কেন্দ্রের। প্রশিক্ষন কেন্দ্র বলতে ওই ওয়ার্ডের একটি পুকুরের মধ্যে ১৮ ফুট দৈর্ঘের এবং ৯ ফুট প্রস্থের চার কোনাকৃতির বাঁশ দিয়ে ঘেরা জায়গা। এ জায়গাটুকুর নিচে একই মাপের একটি মাঁচা তৈরি করা হয়েছে বাঁশ দিয়ে। সাঁতার শেখার প্রথম ধাপ এখানেই সম্পন্ন হয়। এ ধাপে শিশুদের সুইমিং কিক বোর্ড দেওয়া হয়। বুকের নিচে সুইমিং কিক বোর্ড দিয়ে সাঁতার কাটে শিশুরা। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘কৃত্রিম সাতার প্রশিক্ষন কেন্দ্র’ বলে।

তাছাড়া এ মাঁচার বাইরে ৪০ ফুট দৈর্ঘের একটু জায়গার মধ্যে বাঁশ দিয়ে আরও একটি ঘেরা দেওয়া হয়েছে। এটা হচ্ছে সাঁতার শেখার দ্বিতীয় ও সর্বশেষ ধাপ। সাঁতার শেখার ২১ টি ধাপের মধ্যে সর্বশেষ ধাপ হিসাবে একটি শিশু ৪০ ফুট দৈর্ঘের বাঁশ ঘোরা সীমানার মধ্যে পর পর দুবার সাঁতার দিয়ে দক্ষতা দেখাতে পারলে ‘সুইমিং গ্রাজুয়েট’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। একই ওয়ার্ডের সাঁতার প্রশিক্ষন কেন্দ্রের প্রশিক্ষক মোসা: হাচিনুর বলেন, সিআইপিআরবি থেকে সাঁতার শেখানোর পদ্ধতিগত প্রশিক্ষন আমি আগেই পেয়েছি, এর পর শিশুদের শেখাচ্ছি। সাঁতার শেখানোর বিষয়টি উপভোগ করছি। এখানের কোন শিশু পানিতে ডুবে যাতে মারা না যায়, সে লক্ষেই কাজ করছি।’

সিআইপিআরবি সূত্র জানায়, প্রশিক্ষক হিসেবে কলেজ শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে যাদের অনেকেই নারী। ২০২০ সালের মধ্যে এ উপজেলায় প্রতি বছরে ৩ হাজার ৫০০ জন করে ৩ বছরে ১৫ হাজার শিশুকে সাঁতার শেখানো হবে। এছাড়া কর্মসূচি বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গে একটি জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে দেখা হবে, পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর হার কতটুকু কমেছে।

সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন এন্ড রিচার্স, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) আঞ্চলিক সন্বয়কারী মো: মোতাহের হোসাইন জানান, ধীরে ধীরে হলেও এ এলাকায় এগিয়ে যাচ্ছে নিরাপদ সাঁতার কার্যক্রম। এমন একদিন আসবে যেদিন আর এখানকার একটি শিশুও পানিতে ডুবে মারা যাবে না। এখানের মানুষের সে স্বপ্ন আর বেশি দুরে নয়। সাঁতারে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে ‘সুইমিং গ্রাজুয়েট’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া শিশু তুর্য ও শাহীনের বাবা মাদ্রাসা শিক্ষক মো: মশিউর রহমান বলেন, ‘সাঁতার না জানলে হয়তো সেটাই একদিন তার শিশুর জন্য বিপদের কারন হয়ে দাঁড়াতে পারতো। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমার সন্তান আজ সাঁতার শিখতে পেরেছে।

সাঁতার শেখানোর জন্য ২৫ জনের করে একটি দল গঠন করা হয়। তাদের মধ্যে থেকে ৫ জন করে পুকুরে নামিয়ে সাঁতার শেখানো হয়। ১২ থেকে ১৪ দিনের মতো সময় লেগে যায় একজন শিশুর সাঁতার রপ্ত করতে। শিশুদের স্কুলের সময় বিবেচনা করে প্রশিক্ষন দেওয়া হয়। সাঁতারের সঙ্গে আরও দুটি বিষয় শেখানো হয়। এর মধ্যে পানিতে পড়ে গেলে দীর্ঘ সময় ভেসে থাকার কৌশল এবং পানিতে কেউ ডুবে গেলে তাকে কি ভাবে উদ্ধার করতে হয়।

এর পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ক প্রশিক্ষন প্রাপ্ত ৬ শত ৪৩ জন ব্যক্তির মাধ্যমে ২ হাজার ৬৮ জনকে সেবা প্রদান, সরকারি ও প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৪ হাজার ৪৫১ জন শির্ক্ষীকে স্কুল ভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমের আওতায় অর্šÍভুক্ত করণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠির সম্পৃক্তা বাড়াতে ২৪ টি পথনাটক, ১৪ টি ভিডিও শো, ১৬০ টি উঠান বৈঠক, ৬ টি সামাজিক ময়না তদন্ত এবং পৌরসভাসহ ইউনিয়ন পর্যায় ৮টি ইউনিয়ন ইনজুরি প্রিভেনশন কমিটি ও ৫০ টি ভিলেজ ইনজুরি প্রিভেনশন কমিটি গঠনসহ এ ধরনের সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

বেতাগী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: রাজীব আহসান বলেন, ‘উপকূলীয় এ অঞ্চলে মানুষের জীবন রক্ষায় সাঁতার শেখানোর উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। পানিতে ডুবে প্রায়শই শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। তাই আমরাও এ কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছি।’



সম্পাদনা: বরি/প্রেস/মপ


প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার    সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০। ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : [email protected]
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।