জলাবদ্ধতায় আমন কৃষকের স্বপ্নবীজ লন্ডভন্ড
 জলাবদ্ধতায় আমন বীজতলা সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। পঁচে যাওয়া আমন বীজ হাতে কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক (ছবিঃ আমাদের বরিশাল ডটকম)
দেবদাস মজুমদার, আঞ্চলিক প্রতিনিধি :: ষাটোর্ধ বয়সী কৃষক আব্দুল হালিম দেড় একর জমিতে চলতি আমন মৌসুমে স্থানীয় জাতের মোটা আমন আবাদের জন্য সাড়ে তিন কাঠা জমিতে বীজতলা তৈরী করেছিলেন। এখন ওই ধানবীজ উত্তোলন করে প্রস্তত করা কৃষি জমিতে রোপন করার কথা। কিন্তু তিনি তা পারছেন না। গত দুই সপ্তাহ আগে টানা কয়েকদিনের বর্ষণে তার পুরো বীজতলা ডুবে গেছে। জলাবদ্ধ ওই বীজতলার অবাঞ্ছিত পানি অপসারিত না হওয়ায় ধানের বীজ পঁচে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন নতুন করে বীজতলা করা ছাড়া এই কৃষক হালিমের আর কোন উপায় নেই। ফলে এবারের আমন আবাদ এই বিপন্ন কৃষকের পিছিয়ে পড়েছে।
শুধু কৃষক আব্দুল হালিমই নন পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার টিকিকাটা ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রামের কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ায় আমন বীজতলা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন শতশত কৃষক। গ্রামের খালে অপরিকল্পিত বাঁধ ও কাযকর সৱুইজগেট ব্যবস্থাপনা না থাকায় মাঠের জলাবদ্ধতায় কৃষকরা চলতি আমন আবাদ নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন।
কৃষক আব্দুল হালিম বলেন, ‘মোগো খালে হুদাহুদি (খালি খালি) বান্দা (বাঁধ) দেছে সরকার। আবার কোন স্লুইজগেট নাই। এহন জমিতে জলাবদ্ধতায় মোগো পাঁচ গ্রামের কৃষকগো ফসল মরে (নষ্ট হচ্ছে) হ্যা দেহার কেউ নাই।’
পূর্ব সেনের টিকিকাটা গ্রামের বিপন্ন প্রান্তিক কৃষক মো. সোহরাব হোসেন(৪০) বলেন, ‘দুই একর জমি বর্গা নিছিলাম ধান চাষের লইগ্যা। বীজতলাও করছিলাম। হেই বীজতলা পানিতে ডুইব্যা থাহায় চোহে এহন আন্ধার দেখতাছি। মাঠের পানি সরছেনা। এহন ধানের চারা কিনতে না পারলে আমন আবাদ শ্যাষ।’
ভূক্তভোগী কৃষকরা জানান, মঠবাড়িয়া-গুলিসাখালী লাউয়ার ভাড়ানী খালের টিকিকাটা ইউনিয়ন পরিষদ সংগগ্ন মোহনায় গত ১৭ বছর আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি অপরিকল্পিত বাঁধ দেয়। ওই বাঁধ দেওয়ার ফলে লাউয়ার ভাড়ানী খালটি নাব্যতা হারিয়ে এখন ভরাট হওয়ার পথে। এতে টিকিকাটা ইউনিয়নের পূর্ব সেনের টিকিকাটা, পশ্চিম সেনের টিকিকাটা, বড়শিংগা, ছোট শিংগা, ভেচকি এ পাঁচ গ্রামের প্রায় দুই হাজার হেক্টর কৃষি জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। ফলে উল্লেখিত এলাকার কৃষকরা চলতি আমন আবাদ করতে পারছেন না। মাঠের বীজতলা ৩/৪ ফুট পানিতে তলিয়ে থাকায় বীজতলা নষ্টের পথে।
স্থানীয় বেসরকারী কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের মাঠকর্মী মো. মাসুম মৃধা জানান, এ এলাকার কৃষিজমির জলাবদ্ধতা নিরসনে খালের বাঁধের ওপর একটি স্লুইজগেট নির্মাণ ও নাব্যতা হারানো লাউয়ার ভাড়ানী খাল খনন করা প্রয়োজন। সম্প্রতি উল্লেখিত গ্রামের কৃষিজমির জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে খালে বাঁধ দেওয়া স্থানে স্লুইজগেট নির্মাণ ও নাব্যতা হারানো খাল পূণঃখননের দাবিতে বিপন্ন কৃষকরা মানবন্ধন ও সমাবেশ করেছেন। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পক্ষ্য হতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে টিকিকাটা কৃষি ব্লকের উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নুরুন্নাহার বেগম আমাদের বরিশাল ডটকমকে বলেন, ওই এলাকার কৃষি জমি এমনিতেই নীচু। এছাড়া গ্রামের খালে বাঁধ থাকায় খালের নাব্যতা হারিয়ে খালটি মরা খালে পরিনত হয়েছে। স্লুইজগেট না থাকায় পানি অপসারণের কোন ব্যবস্থা নেই। ফলে কয়েকটি গ্রামের কৃষকদের জলাবদ্ধতায় ধান আবাদে সমস্যা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শহীদুল্লাহ আমাদের বরিশাল ডটকমকে জানান, টিকিকাটা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের আবাদী জমিতে জলাবদ্ধতার মূল কারন গ্রামের খালে বাঁধ ও সুষ্ঠু পানিষ্কাশনের জন্য স্লুইজগেট না থাকা। ফলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নাব্যতা হারানো গ্রামের খাল পূণখনন ও স্লুইজগেট নির্মাণ ছাড়া উল্লেখিত এলাকার আবাদী জমির জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব নয়।
–
(আমাদের বরিশাল ডটকম/পিরোজপুর/দেম/তাপা)
সম্পাদনা: সেন্ট্রাল ডেস্ক |