Current Bangladesh Time
বুধবার এপ্রিল ১৪, ২০২১ ২:০৮ পূর্বাহ্ন
Barisal News
Latest News
প্রচ্ছদ » রিপোর্টারের ডায়েরি, সংবাদ শিরোনাম » ৭ মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল যে কারণে
৭ মার্চ ২০২১ রবিবার ১:০২:১৪ অপরাহ্ন
Print this E-mail this

৭ মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল যে কারণে


সোহেল সানি: 

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ যখন জাতিসংঘ কর্তৃক “বিশ্বের ভাষণ” বলে সুমহান মর্যাদার অভিষিক্ত। কিন্তু সেই ভাষণের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল কিভাবে,ঘরে-বাইরে কি কি ঘটেছিল এবং যেসব বিষয় মনস্তাত্ত্বিকভাবে বঙ্গবন্ধুকে প্রস্তুত করে তুলেছিল, সেসবের অনেক অজানা-অপ্রকাশিত  ঘটনাই চমকপ্রদ।

মহান মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রে সেসব খন্ড খন্ড চিত্রের দেখা না মিললেও তা সামগ্রিক ইতিহাসেরই উপাদান।সেসব তথ্য-উপাত্ত ইতিহাসকে সমৃদ্ধি করতে পারে এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বিকৃত ইতিহাস রোধে অবিস্ফোরিত অবিস্মরণীয় ভুমিকা রাখতে পারে।পহেলা মার্চ থেকে টানা সপ্তাহব্যাপী রাজনীতির অন্দরমহলে ঘটে যাওয়া সেসবের ঘটনার বর্ণনা দেয়ার চেষ্টা করছি।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে আসা এ ঘোষণাকে জাতীয় পরিষদের সংখ্যা গরিষ্ঠ্যদলের নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাগত জানালেও সংখ্যালঘু দলের নেতা পিপলস পার্টি প্রধান জুলফিকার আলি ভুট্টো বেঁকে বসেন। তিনি পেশোয়ারে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, “মুজিব ৬ দফার পক্ষে আপোষ না করলে তার দল অধিবেশনে যোগদান করবে না।”১৮ ফেব্রুয়ারি বললেন, “ঢাকা পশ্চিম পাকিস্তানি সদস্যদের জন্য কসাইখানা হবে।”প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহবান জানান অধিবেশন স্থগিত করতে।এসময় প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর সঙ্গে শলা পরামর্শ করতে  গোপনে সিন্ধু প্রদেশের লারকানায় পাখী শিকারে গেছেন মর্মে খবর রটে যায়।

অধিবেশনের দুদিন আগে পহেলা মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক ভাষণে অধিবেশন  বাতিল ঘোষণা করেন। ওই মূহুর্তে বঙ্গবন্ধু হোটেল পূর্বাণীতে শাসনতন্ত্রের খসড়া তৈরিতে সহকর্মীদের সঙ্গে সকাল নয়টা থেকে বৈঠক করছিলেন। সেই নীতি নির্ধারণী বৈঠকে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম,তাজউদ্দীন আহমদ,ক্যাপ্টেন এম.মনসুর আলী, এএইচ এম কামরুজ্জামান,খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও ডঃ কামাল হোসেন।পহেলা মার্চ  দুপুর বারোটার দিকে তাঁরা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিলের খবরটি পান।

প্রেসিডেন্টের এ ঘোষণার বিরুদ্ধে হাজার হাজার ছাত্রজনতা রাস্তায় নেমে পড়েন। বঙ্গবন্ধু হোটেল পূর্বাণীর সামনে ছাত্রজনতার সম্মুখে হাজির হয়ে বলেন,অধিবেশন বাতিল করার ঘোষণা গভীর ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতি।বাঙালিরা এই ষড়যন্ত্রকে জীবন দিয়ে হলেও প্রতিহত করবে। ২ মার্চ ঢাকায়,৩ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল এবং ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভা করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে ছাত্র-জনতাকে আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান।

৩ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এডমিরাল আহসানকে পদচ্যুত করে তার স্থলে জেনারেল ইয়াকুব খানকে ভারপ্রাপ্ত গভর্নর করেন। ৪ মার্চ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত এক নাগাড়ে দেশব্যাপী স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়।

৪ মার্চ ইয়াহিয়া খান জেনারেল টিক্কা খানকে গভর্নর করেন। ৫ মার্চ টিক্কা খান ঢাকায় পৌঁছেন। ৬ মার্চ শপথ নেয়ার কথা থাকলেও জনরোষের মুখে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বি এ সিদ্দিক তাকে শপথ পড়াতে অস্বীকৃতি জানান।

৬ মার্চ বিকেল পাঁচটায় প্রেসিডেন্ট জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন এমন বার্তা ঘোষণা করা হয় ৫ মার্চ। স্বভাবতই গোটা দেশবাসীর দৃষ্টি তখন ভাষণের দিকে। বঙ্গবন্ধু ওদিন তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। এটা ৫ মার্চের কথা। হঠাৎ ঢাকাস্থ পূর্বাঞ্চলীয়  সামরিক প্রশাসক জেনারেল ইয়াকুবের ফোন আসে। বঙ্গবন্ধুর জামাতা ডঃ এম এ ওয়াজেদ মিয়া ফোন রিসিভ করলে ওপাশ থেকে বলা হয় শেখ সাহেবের সঙ্গে মাননীয় প্রেসিডেন্ট কথা বলবেন। বঙ্গবন্ধু “কিছু শুনতে পাচ্ছি না,কিছু শুনতে পাচ্ছি না”বলে প্রেসিডেন্টকে বলেন।

একটু পরে জেনারেল রাও ফরমান আলীর ফোন। বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্টের কন্ঠ শুনে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে পরিস্থিতি অবহিত পূর্বক তদন্ত কমিশন গঠন ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠানের কথা বলেন।

৬ মার্চ বিকেলে প্রেসিডেন্টের ভাষণ শোনার জন্য বঙ্গবন্ধু একটি ট্রানজিস্টার নিয়ে তাঁর শয়নকক্ষে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দেন। জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনাকে বলেন ভাষণটি টেপ করে রাখার জন্য। প্রেসিডেন্ট বলেন, আওয়ামী লীগের একগুয়েমির জন্য ৩ মার্চের অধিবেশন বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন। ১০ মার্চ ঢাকায় গোলটেবিল সম্মেলন ডেকে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের প্রশ্নে সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা অনুষ্ঠানের কথাও বলেন তিনি। ইয়াহিয়া ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবানের কথাও ঘোষণা করেন।

বঙ্গবন্ধু ভাষণ শেষ হওয়ার পর দরজা খুলে ব্যক্তিগত সহকারি মোহাম্মদ হানিফকে শীর্ষ ছয় নেতাকে ডেকে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ঘন্টাব্যাপী আলোচনা শেষে কতিপয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এর পর পরই বঙ্গবন্ধুর মুখোমুখি হন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ভাষণের জবাব দিতে ইংরেজিতে একটি ইশতেহার তৈরি করেন তাজউদ্দীন আহমদ ও ডঃ কামাল হোসেন।যাতে বলা হয় “শহীদের রক্তে রঞ্জিত রাস্তার রক্ত এখনো শুকোয়নি।পবিত্র রক্তের ওপর পা রেখে ১০ মার্চ গোল টেবিল বৈঠকে আওয়ামী লীগ যোগদান করতে পারেনা।” 

৭ মার্চ সকালে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে লোকে লোকারণ্য। বঙ্গবন্ধু প্রথমেই  সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইচএম কামরুজ্জামান, মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক ও ডঃ কামালের সঙ্গে লাইব্রেরি রুমে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এরপর বৈঠকে মিলিত হন যুব-ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে। এরা হলেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, আসম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন।

দুপুরে এসব বৈঠকে বঙ্গবন্ধুকে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার পক্ষে মত দেন। বঙ্গবন্ধু এরপর সমবেত সকলের উদ্দেশ্যে শুধু বলেন, আমরা ঐকমত্যে পৌঁছেছি। ছাত্রজনতার দাবি অনুযায়ী চার দফা দাবির প্রতি সমর্থনের কথাও বলেন বঙ্গবন্ধু। দুপুরে আহারের জন্য নেতারা নিজ নিজ বাড়িতে চলে যান। বঙ্গবন্ধু আহার শেষে বিছানায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এমন সময় ডঃ কামাল প্রস্তাবিত ঘোষণাপত্রের খসড়াটি বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেন। একান্ত সহকারি মোহাম্মদ হানিফকে টাইপ করতে দিয়ে ডঃ কামাল তাঁর বাসায় চলে যান। বিকেল  তিনটায় আসেন খন্দকার মোশতাক। পরক্ষণেই ডঃ কামাল। বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে যাওয়ার আগে চারদফা ঘোষণাপত্রটি জনসভাস্থলে বিতরণ করার নির্দেশ দেন ছাত্র নেতাদের। দফাগুলো হলো এক, সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া, দুই যাদেরকে হত্যা করা হয় তা তদন্ত করতে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কমিশন গঠন, তিন, সামরিক আইন প্রত্যাহার ও চার, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার কাছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা হস্তান্তর করা।এরপর বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দান অভিমুখে একটা ট্রাকে করে রওয়ানা হন।

ওই ট্রাকে ছিলেন গাজী গোলাম মোস্তফা, শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, নূরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুল কুদ্দুস মাখন প্রমুখ। পেছনের ট্রাকে ছিলেন আসম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ, মোস্তফা মোহসীন মন্টু, কামরুল আলম খান খসরু ও মহিউদ্দিন আহমেদ।

বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছার আগেই সেখানে হাজির হয়ে যান বঙ্গবন্ধুর জামাতা এম এ ওয়াজেদ মিয়া, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা, শেখ জেলি (শেখ হাসিনার খালাতো বোন) ও এটিএম সৈয়দ হোসেনের বড় মেয়ে শেলি।সেদিনের রেসকোর্স ময়দানে নৌকা আকৃতির সভামঞ্চটি স্থাপন করা হয়েছিল বর্তমান শিশুপার্কের দক্ষিণ -পূর্ব অংশে।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্প্রচারিত হবে রেডিও বারবার এমন ঘোষণা হচ্ছিল। শেখ হাসিনা এ কারণে একটি রেডিও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যে রেডিও নিস্তব্ধ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর সেই জ্বালাময়ী ভাষণে “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম.. উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লাখো লাখো জনতার জনসমুদ্র থেকে জয় বাংলা শ্লোগান ভেসে আসে। বঙ্গবন্ধুও প্রত্যুত্তরে জয়বাংলা বললে এর ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে আকাশ বাতাসকে অনুরণিত করে তোলে। 

বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দান থেকে বাড়িতে ফেরেন। রাত আটটার দিকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন জনপ্রিয় বাংলা সংবাদ পাঠক ইকবাল বাহার চৌধুরীর নেতৃত্বে পাকিস্তান রেডিও ঢাকাস্থ কেন্দ্রের কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা। তারা জানান, সেনাবাহিনীর হাইকমান্ডের নির্দেশে তারা ভাষণ সম্প্রচার করতে পারেনি। এখন ভাষণ সম্প্রচারের অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট করার কথা বলেন তারা। ফলে সকল অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়।

৮ মার্চ সকাল আটটায় হঠাৎ পাকিস্তান রেডিও ঘোষণা করে যে, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ নয়টায় প্রচার করা হবে। বঙ্গবন্ধু রাতে সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, ছেলে-মেয়ে শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রেহানা, শেখ রাসেলের উপস্থিতিতে বলেন, ” আমার যা বলার তা প্রকাশ্যে বলে ফেলেছি -সরকার এখন আমাকে যেকোনো মূহুর্তে হয় গ্রেফতার নয়তো হত্যা করবে। আজ থেকে প্রতিদিন আমার সঙ্গে খাবে। ২৪ মার্চ পর্যন্ত সবাই এক সঙ্গে খেয়েছেন। কিন্তু ২৫ মার্চ ব্যতিক্রম ঘটে। বঙ্গবন্ধু রাত ১১টা পর্যন্ত বাড়ির নীচতলায় আওয়ামী লীগ,ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত সময় পার করেন।

৭ মার্চের ভাষণের পর থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। কার্যত বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের শাসনভার গ্রহণ করেন। ৯ মার্চ পল্টন ময়দানে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, “প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে বলি, অনেক হয়েছে আর নয়। তিক্ততা বাড়াইয়া আর লাভ নাই। লা কুম দ্বিনুকুম ওয়ালইয়া দ্বিন(তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার) – এর নিয়মে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা স্বীকার করিয়া লও। মুজিবের নির্দেশমত আগামী ২৫ তারিখের মধ্যে কোন কিছু করা না হইলে আমি শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত হাত মিলাইয়া ১৯৫২ সালের ন্যায় তুমুল আন্দোলন শুরু করিব। খামাকা কেহ মুজিবকে অবিশ্বাস করিবেন না, মুজিবকে আমি ভালো করিয়া চিনি।”

১৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকায় আসেন। ১৬ ও ১৭ মার্চ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাউসে (বর্তমান সুগন্ধা)  ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক হলো। ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ছাত্রজনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে। কারফিউ জারি করা হয়। ২০ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ও ইয়াহিয়ার পরামর্শ দাতাদের মধ্যে পৃথক বৈঠক হয়। ইতিমধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের ৩৫ জন জাতীয় পরিষদ সদস্য অধিবেশনে যোগদান করতে ঢাকায় এসে পৌঁছেন। বঙ্গবন্ধু বাড়ি আক্রমণের আশঙ্কা করে ডঃ ওয়াজেদকে বাসা নিতে বলেন। সাত মসজিদ রোডের ওপর ধানমন্ডির (পুরাতন) ১৫ নম্বর রোডস্থ (নতুন ৮/এ-১৭৭ নম্বর) নীচতলাটি মাসিক ৯ শত টাকায় ভাড়া নেয়া হয়।

২১ মার্চ জুলফিকার আলি ভুট্টো ঢাকায় এসে হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে ওঠেন। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে তিনি গোপন শলাপরামর্শ করেন। ২২ মার্চ বঙ্গবন্ধু বলেন, ” লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। এদিন মুজিব-ভুট্টো বৈঠক হয়। একই দিন ইয়াহিয়া-মুজিব-ভুট্টো বৈঠক হলে আবারও সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। বলা হয় ২৫ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বিস্তৃত আলোচনার জন্য বাতিল করা হলো।

বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ থেকে অবরোধ আন্দোলন শুরু করার জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানান। ২৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের জনসভায় “আমার সোনার বাংলা” গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে বাজিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। নূরে আলম সিদ্দিকী, আসম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন ছিলেন ছাত্রলীগের প্রধান নেতা। গাঢ় সবুজ কাপড়ের মাঝখানে লাল গোলাকার বলয়ের ভেতর সোনালী রং-এ অঙ্কিত বাংলাদেশের মানচিত্রসহ তৈরি করা পতাকাটি বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেন তাঁর বাড়িতে এসে। সামরিক কায়দায় একটি বিশেষ দল বঙ্গবন্ধুকে অভিবাদন জানায়। ওদিন সচিবালয়,হাইকোর্ট ভবনসহ সর্বত্র বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।

উল্লেখ্য, ছাত্রলীগের পক্ষে ২ মার্চ ডাকসুর ভিপি আসম আব্দুর রব প্রথম পতাকাটি উত্তোলন করেন। ৩ মার্চ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ. স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা করেন। ২৫ মার্চ সকালে বঙ্গবন্ধু নিজ বাড়িতে  নেতাদের সঙ্গে কাটান। সবার চোখে মুখে উদ্বেগ উৎকন্ঠা। সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে চলে যেতে বলেন। বিকেল তিনটায় শেখ মনি বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষে ছিলেন। রাত আটটার আবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান। রাত ১১ টার  দিকে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে সিরাজুল আলম খান, আ স ম আব্দুর রব ও শাজাহান সিরাজের সঙ্গে কথা বলেন। লন্ডন আওয়ামী লীগ নেতা জাকারিয়া চৌধুরীর ভাই পরিচয় দিয়ে ঝন্টু নামের এক ব্যক্তি মহিউদ্দিন আহমেদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর মুখোমুখি হন। সে জানায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে। আপনাকে হত্যা করার জন্য তারা আসছে। বঙ্গবন্ধু শেখ হাসিনাকে বলে তোমরা চলে যাও।আমার অন্যত্র  চলে যাওয়ার উপায় নেই। তারা মারতে চাইলে আমাকে এ বাড়িতেই মরতে হবে । কামাল চলে গেছে। জামাল ওর মাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। মুখে একথা শুনে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। একদিকে গণহত্যার তান্ডবলীলা, আরেকদিকে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের ইতিহাস। গ্রেফতারের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক বার্তা আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
শের-ই বাংলা মেডিকেলের নতুন পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম
রমজানের চাঁদ দেখা গেছে, কাল রোজা
বরিশালে ডায়রিয়ার প্রকোপ
করোনা: জেলায় নতুন শনাক্তের বেশিরভাগই বরিশাল নগরের
গত ২৪ ঘণ্টায় বরিশালে আরও ৫১ জনের করোনা শনাক্ত ও মৃত্যু ৯ জনের
Recent: Mayor Hiron Barisal
Recent: Barisal B M College
Recent: Tender Terror
Kuakata News

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
আমাদের বরিশাল ২০০৬-২০২০

প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক: মোয়াজ্জেম হোসেন চুন্নু, সম্পাদক: রাহাত খান
৪৬১ আগরপুর রোড (নীচ তলা), বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, ই-মেইল: hello@amaderbarisal.com