আর কত মৃত্যু, আর কত ধর্মঘট? তানভীর হাসান আকিব
বছর দশেক আগের কথা। আলসারে আক্রান্ত মাকে চিকৎসার জন্য নিয়ে গিয়েছি শেবাচিম হাসপাতালে। দীর্ঘদিন ধরে রোগে ভোগায় মায়ের অবস্থা এখন গুরুতর। কি করবো বুঝতে না পেরে দিশেহারা অবস্থা আমার। তবু নিজেকে যতটা সংযত রাখা যায়। মাকে হাসপাতালের বারান্দায় বসিয়ে দৌঁড়ে গেলাম টিকিট আনতে। ফিরে এসে দেখি বিশাল লম্বা লাইন। কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে কে জানে।
এদিকে আলসারের যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে মা। মায়ের কষ্ট দেখে চক্ষু সয়না। কিন্তু দীর্ঘ সময় পরও লাইন কমেনি একটুও। পরে জানতে পারলাম আসলে ডাক্তারই তখন পর্যন্ত আসেনি। স্বনামধণ্য চিকিৎসক। ব্যাপক তার চাহিদা। প্রাইভেট ক্লিনিকে হাতযশ করতে করতেই তার বেলা শেষ হয়। কখন আসবেন কেউ জানে না। কিন্তু মায়ের যা অবস্থা তাতে আজ ডাক্তার দেখাতে হবেই। না হলে রাতে হয়তো অবস্থা আরো হয়ে পড়বে।
সকাল ৯টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষার পর চেম্বারে আসলেন কাঙ্খিত মহান চিকিৎসক। তার আসার পরপরই চারদিকে রব রব পরে গেলো। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রোগীরা আবার লাইনে এসে দাঁড়ালেন। মায়ের অবস্থা খারাপ থাকায় আমিই তার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু আমাদের সবাইকে হতাশ করে দিয়ে ডাক্তারের কম্পাউন্ডার এসে জানালেন মহামান্য ডাক্তার আজ আর রোগী দেখতে পারবেন না। তাকে এখনি সরকারি কাজে ঢাকা যেতে হবে।
যথেষ্ট টাকা ছিলনা, তাই প্রাইভেট ক্লিনিকে মাকে ডাক্তার দেখানোর সামর্থ্য হয়নি। সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার ছিলনা। বয়স কমের কারনে পারিনি প্রতিবাদী হয়ে উঠতে। তাই শুধু যন্ত্রণায় কাতর মায়ের সারা রাত শুধু গোঙ্গানি দেখেছি আর কেঁদেছি।
প্রতিবাদ করার শক্তি এখন হয়েছে। চিকিৎসা করানোর যথেষ্ট সামর্থ্যও এখন আছে। শুধু মা ই নেই। আর আজ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি সরকারি হাসপাতালে দরিদ্র রোগী দেখার জন্য ডাক্তারদের যথেষ্ট সময়। যার স্বজন বিচ্ছেদ ঘটেছে সেই জানে বিচ্ছেদের কি কষ্ট। ডাক্তারদেরও স্বজন বিচ্ছেদ ঘটে। কিন্তু তারা তো সাধারণ মানুষ নন, তারা অসাধারণ ডাক্তার। আর এ জন্যই সাধারণ রোগী দেখলে ভুলে যান চিকিৎসাসেবার মূলমন্ত্র হিপোক্রেট।
সময়, অর্থ, নানান টেনশনে রোগীর প্রতি তাদের কতটা খেয়াল থাকে তারাই জানেন। কিন্তু তারপরও সর্বোচ্চ চিকিৎসা থাকলেওতো রোগী মারা যায় অনেক সময়। কিন্তু রোগীর মৃত্যুর পর তার স্বজনরা শোকাহত হয়ে বিমূখ আচরণ করে। এবিষয়টিওতো জানা থাকে ডাক্তারদের। কিন্তু তারপরও তারাই তেড়ে আসে স্বজনদের উপর। স্বজনকে হারিয়েও চিকিৎসকের হাতে লাঞ্ছিত হতে হয় শোকাহত স্বজনকে। আর এরপর হতে হয় মামলার আসামীও। এরপর হয়তো গ্রেফতার ও তথাকথিত স্বাস্তিও পেতে হবে তাকে।
হাসপাতালে এসে আর কত রোগীর এভাবে মৃত্যু ঘটবে? আর কত স্বজনকে লাঞ্ছিত, মামলার আসামী ও স্বাস্তি পেতে হবে? আর সম্মানিত চিকিৎসকরা আর কত তাদের আত্মসম্মান রক্ষায় ধর্মঘট করবে? তারা কি জানেন তাদের ধর্মঘটের সময় যে ক’জন রোগীর মৃত্যু ঘটেছে তাদের অনেকেরই হয়তো এখনই মৃত্যুর নির্ধারিত সময় ছিলেনা। যেগুলো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, একেকটি মার্ডার।
–
তানভীর হাসান আকিব
কলমের কন্ঠ
|