খোলা আকাশের নিচে হাজারো পরিবার মহাসেনের আঘাতে লণ্ডভণ্ড ভোলার উপকূল অচিন্ত্য মজুমদার
ভোলা :: ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের আঘাতে ভোলার চরফ্যাসন ও মনপুরা উপজেলার দুই সহস্রাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। মহাসেন চলে গেলেও রেখে গেছে ধ্বংসযঞ্জের ক্ষতচিহৃ। ঘূর্ণিঝড়ে কাঁচা ঘরবাড়ি, রাস্তা ঘাট বিধ্বস্ত ও অসংখ্য গাছপালা, পানের বরজ ও উঠতি রবি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়েছে। এ সময় ঘর ও গাছ চাপা পড়ে মারা গেছে এক শিশুসহ ৪ জন।
নিহতরা হলেন- লালমোহন উপজেলার ধলিগৌরনগর এলাকার আবুল কাশেম (৪৫), চরফ্যাসন উপজেলার ঢালচরের রফিজুল ইসলাম (৬৫), চর-কুকড়িমুকড়ি ইউনিয়নের চরপাতিলা গ্রামের নিপা (১০) ও চরমাদ্রাজ ইউনিয়নের পারভেজ (৬)।
ঝড়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৮শ কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার কথা বললেও বেসরকারী হিসেবে এর সংখ্যা দুই সহস্রাধিক। তবে যাতায়াতে প্রতিবন্ধকতা ও মুঠোফোন নেটওর্য়াকের বিড়ম্বনার কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান নিরুপন করতে সমস্যা হচ্ছে।
ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসক ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শন করে নগত টাকা ও চালা বরাদ্দ দিয়েছে। বর্তমানে বিধ্বস্ত এলাকায় রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন বেসরকারি সেচ্চাসেবী সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। অপরদিকে, ভিটাবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে রয়েছে কয়েক হাজার পরিবার। সেখানে দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।
চরফ্যাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রন কক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ঘন্টাব্যাপী ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে উপজেলার চরমানিকা ইউনিয়নের চরফারুকী, চরলক্ষী, মুজিবনগর ইউনিয়নের চরমোতাহার, চরলিউলিন। এছাড়া জাহানপুর, নীলকমল, হাজারিগঞ্জ, কুকরী-মুকরী ইউনিয়নের, চরপাতিলা, বাবুগঞ্জ, আমিনপুর, হাজীপুর, নবীনগর, মুসলিমপাড়া, নুরাবাদ ইউনিয়নের মেঘভাষান, চরমাদ্রাজ ইউনিয়নের চরনিউটন, বেড়ীভাঙ্গা ও ঢালচর ইউনিয়নের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নিহত হয়েছে ৩জন। আহত হয়েছে দেড়শতাধিক। এসময় ২৫টি মসজিদ, ২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় ২ হাজার কাচাঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এছাড়া ছোট-বড় অসংখ্য গাছ-পালা ভেঙ্গে ও উপড়ে পড়েছে। এছাড়া চরমোতাহার, চরমানিকা, চরফারুকী ও চরলক্ষ্মীর একরে একরে ফসলী জমির ক্ষতি সাধন হয়েছে।
মনপুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রন কক্ষ সূত্রে জানা গেছে, মহাসেনের আঘাতে উপজেলার সোনালী ব্যাংক ও সুশীলন এন.জিও কার্যালয়সহ প্রায় ৩ শতাধিক কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত হয়। মনপুরা থেকে বিচ্ছিন্ন বেড়ীবাঁধহীন চরনিজাম ও কলাতলীর চরে ক্ষতির পরিমান সবচেয়ে বেশি হয়েছে। সেখানে কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ক্ষয়ক্ষতির নিরুপনের জন্য চারটি ইউনিয়নে ৪ টি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে উপজেলা অফিস সূত্রে জানা যায়।
ঘূর্ণিঝড় মহাসেন তান্ডবে বোরহানউদ্দিন উপজেলার মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীর পাড়, বেড়ি বাঁধ এলাকাসহ বড়মানিকা, পক্ষিয়া, সাচড়া, কুতুবা, কাচিয়া, হাসান নগর ও টবগী ইউনিয়নে ৬ শত ঘর সম্পূর্ণ বিধস্ত হয়েছে। এছাড়া ঘর ও গাছ চাপায় পড়ে ২৫ জন আহত হয়েছে। প্রবল বাতাসে উপজেলায় কয়েক শত গাছপালা উপচে পড়ে এবং বোরো ধান, পানের বরজসহ লক্ষ লক্ষ টাকার ফসলাদির ক্ষতি সাধন হয়েছে। শুধুমাত্র কাচিয়া ইউনিয়নে প্রায় ১ হাজার পানের বরজ মাটির সাথে মিশে গিয়ে প্রায় ২০ লক্ষাধীক টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। কাচিয়া শাহবাজ পুর গ্যাস ফিল্ড এলাকা প্রবল বৃষ্টি ও বাতাসের তোড়ে ৫০টি হেচারি বাধঁ ভেঙ্গে প্রায় ১০ লক্ষ টাকার মাছের পোনা পানির সাথে অন্যত্র চলে যায়।
উপজেলার সাচড়া ইউপি চেয়ারম্যান মহিবুল্লাহ মৃধা জানান, কৃষকের বোরো ধান, পানের বর, গাছপালাসহ তার ইউনিয়নে প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা ক্ষতি সাধন হয়েছে। তবে উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার পরিবার ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলে জানান উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন।
লালমোহন উপজেলার ধলীগৌরনগর বাত্তির খাল ও লর্ড হার্ডিঞ্জ এলাকায় তিন শতাধিক ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। ওই সব এলাকায় সাতটি নৌকাসহ ২৪ জেলে নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম।
ভোলার জেলা প্রশাসক খোন্দাকার মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় মহাসেনে জেলার ক্ষয় ক্ষতির পরিমান নিরুপন জন্য ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি ইউনিয়নগুলোতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে জেলার মনপুরা ও চরফ্যাসন এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসন ওই দুটি উপজেলার ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৯০ মেট্রিক টন খাদ্য শস্য ও নগদ সাড়ে চার লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছে। তিনি আরো জানান, অনান্য উপজেলাগুলো থেকে ক্ষয়ক্ষতি তালিকা পাঠানো হলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বরাদ্দ দেয়া হবে।
সম্পাদনা: সেন্ট্রাল ডেস্ক |