দুর্বল নেটওয়ার্ক ও নিম্নমানের সার্ভিস বাংলালায়নের প্রতারণায় দুর্ভোগে গ্রাহকরা সৈয়দ মুন্না
ঢাকা :: ওয়াইম্যাক্স ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বাংলালায়নের বিরুদ্ধে গ্রাহক প্রতারণার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রথমদিকে গ্রাহকদের ভাল সার্ভিস দিলেও গ্রাহক সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে সার্ভিসের মান কমতে থাকে বলে অভিযোগ এর ব্যবহারকারীদের। দুর্বল নেটওয়ার্ক, দক্ষ লোকবলের অভাব, যান্ত্রিক ক্রটির কারণে প্রায়ই দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের। প্রায়ই নেটওয়ার্ক সমস্যায় ঘন্টার পর ঘন্টা বন্ধ থাকছে তাদের ইন্টারনেট সেবা।
নেটওয়ার্ক সমস্যা, প্যাকেজের গতি কমিয়ে দেয়াসহ নানা কারণে বাংলালায়নের সংযোগ কেনার পর গ্রাহক পড়েন চরম বিড়ম্বনায়। কাস্টমার কেয়ার নম্বরে ফোন করে ঘণ্টার ঘণ্টা পর সমস্যা সমাধানের তাগাদা দেওয়ার পরও সমস্যা সমাধান না হওয়ার বিড়ম্বনা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দেয়। এমনকি তাদের নেটওয়ার্কে সমস্যা থাকলে তখন তাদের কাস্টমার কেয়ারের যোগাযোগ নম্বরও বন্ধ করে রাখা হয়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন অসহায় গ্রাহকরা।
গ্রাহকদের অসহায়ত্ব
বাংলালায়নের প্রতারণার ব্যাপারে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, বাংলালায়ন মূলত তাদের ইন্টারনেট সার্ভিসের পরিবর্তে গ্রাহকদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে ব্যবসা করছে। দেশে ইন্টারনেট সার্ভিসের নিম্নমান ও সমস্যার কারণে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা বাংলালায়নের তারহীন সার্ভিসের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। আর এই আকৃষ্টতাকে পুঁজি করে প্রতিশ্রুত সার্ভিস না দিয়েই ব্যবসা করে যাচ্ছে বাংলালায়ন।
যে সকল গ্রাহক বা প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেট সার্ভিসের জন্য শুধুমাত্র বাংলালায়নের ওপর নির্ভর করছেন তারাই মুলত সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। কারন প্রায় প্রতিদিনই নেটওয়ার্ক সমস্যার কারনে ঘন্টার পর ঘন্টা বন্ধ থাকছে বাংলালায়নের সার্ভিস। আর সে সময় ইন্টারনেট থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকতে হচ্ছে তাদের। অনেক গ্রাহকই এখন বাধ্য হয়ে আরেকটি ব্যাকআপ ইন্টারনেট সংযোগ রাখছেন তাদের কাছে। অনেকে বাংলালায়ন পরিবর্তন করে অন্য ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারের কাছে ফিরে যাচ্ছেন।
বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রতারণা
নেটওয়ার্ক সমস্যার কারনে মুখ ফিরিয়ে নেয়া গ্রাহকদের ফিরিয়ে আনতে বাংলালায়ন ‘সব মাফ’ নামে একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। যেখানে বলা হচ্ছে, বন্ধ থাকা পোষ্টপেইড সংযোগ চালু করলেই আগের সব বিলের সাথে ২য় ও ৩য় মাসের বিলের উপর ২০% ও ৩০% ছাড় দেয়া হবে। এ চটকদার বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে অনেক পুরাতন গ্রাহকই ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু এদের মাঝে বহুজনকেই ২য় ও ৩য় মাসের বিলের উপর ২০% ও ৩০% ছাড় দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। বরং কাষ্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করা হলে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।
ইয়াছির আদনান নামে বাংলালায়নের এক গ্রাহক জানান, তিনি বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে বাংলালায়নে ফিরে এসেছিলেন। ফিরে আসলে তাকে ২য় ও ৩য় মাসের বিলে ছাড় দেয়া হবে বলেও জানানো হয়েছিল। কিন্তু ২য় মাসেও কোন ছাড় না দেয়ায়ে তিনি বাংলালায়নের কাষ্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করলে জানানো হয় তার জন্য এ অফার প্রজোয্য নয়।
নিম্নমানের সার্ভিস
বাংলালায়নের নিম্নমানের নেটওয়ার্কের কারণে কিছু কিছু এলাকায় বাংলালায়নের সংযোগ কিছুক্ষণ পরপরই সয়ংক্রিয়ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এসব এলাকার গ্রাহকরা বাংলালায়ন কাষ্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করলে তাদের মডেম আনইন্সটল করে পুণরায় ইন্সটল করতে বলা হয়। মুলত মডেম নতুন করে ইন্সটল করার সাথে এ সমস্যার কোন সম্পর্ক নেই। সবশেষে স্থানীয় ডিস্ট্রিবিউটরদের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেয়া হয়। আর স্থানীয় ডিস্ট্রিবিউটরদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারাও এ ব্যাপারে কোন সমাধান দিতে পারেননা এবং তারা পুনরায় কাষ্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করেন।
মনিরুল ইসলাম নামে বাংলালায়নের অপর এক গ্রাহক বলেন, মগবাজারে তাদের বাসায় কিছুক্ষণ পরপরই বাংলালায়নের সংযোগ কেটে যায়। বেশ কয়েকবার এনিয়ে কাষ্টমার কেয়ারে অভিযোগ জানানো হয়েছিল কিন্তু কোন সমাধান হয়নি। তাদের কথামত মডেম পুণরায় ইন্সটল করা হয়েছে। অতিরিক্ত তার কিনে এসে মডেম জানালার পাশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কিন্তু কোন কিছুতেই এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাচ্ছেনা।
এছাড়া কিছুদিন পরপরই কোন পূর্বঘোষণা ছাড়াই দু’তিন ঘন্টার জন্য বন্ধ হয়ে যায় বাংলালায়নের ইন্টারনেট সার্ভিস। মাঝে মাঝে তা পাঁচ ঘন্টায় গিয়েও ঠেকে। সার্ভিস বন্ধ থাকার এসময় তাদের কাষ্টমার কেয়ার সেন্টারে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তা হয় বন্ধ অথবা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যস্ত পাওয়া যায়। আর সার্ভিস বন্ধ হওয়ার এক বা দু’ঘন্টা পর তারা গ্রাহকদের মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে তাদের নেটওয়ার্কে সমস্যা থাকার কথা জানায়। তবে সে ক্ষুদে বার্তাও এমন কৌশলে পাঠানো হয় যে তাদের না অন্য কোন নেটওয়ার্কে সমস্যা যাতে তা গাহকরা সহজে বুঝতে না পারে। বার্তায় বাংলালাংয়ন কমিউনিকেশন লিমিটিডের বদলে শুধু বিসিএল নেটওয়ার্ক, যা সরকারি প্রতিষ্ঠান বিটিসিএল নামের সঙ্গে মিলে যায়। অথচ এখানে শুধু বিসিএল এর পরিবর্তে বাংলালায়ন বললেই গ্রাহকের ব্যাপারটি বুঝতে সুবিধে হতো।
সিরাজুল ইসলাম নামে এক গ্রাহক ক্ষুদ্ধকন্ঠে জানান, ‘বাংলালায়নের নেটওয়ার্কে সমস্যা হলে তাদের কাষ্টমার কেয়ারের যোগাযোগ নম্বরও ব্যস্ত করে রাখা হয়। গতকালও (১৮ জুন) একই ঘটনা ঘটেছিল। এদিন বিকাল ৫টা থেকে টানা আট ঘন্টার মত তাদের ইন্টারনেট সেবা বন্ধ ছিল। আর তাদের কাষ্টমার কেয়ারের যোগাযোগ নম্বরও বন্ধ করে রাখা ছিল। রাত ২টা পর্যন্ত চেষ্টার পরও তাদের কাষ্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করা যায়নি। তাদের সমস্যা হতেই পারে কিন্তু তাই বলে কাষ্টমার কেয়ার বন্ধ রেখে এভাবে গাহক হয়রানি করার মানে কি?’
মাসুক কামাল নামে বরিশালের এক সংবাদকর্মী জানান, বরিশাল সিটি নির্বাচনের আগের দিন (১৪ জুন) রাত থেকে পরের দিন দুপুর তিনটা পর্যন্ত বরিশালে বন্ধ ছিল বাংলালায়ন নেটওয়ার্ক। এ ব্যাপারে তাদের কাষ্টমার কেয়ার নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও সবসময় নম্বরটি ব্যস্ত পাওয়া গেছে। সাধারণত বাংলালায়নে ফোন করা হলে একটি সয়ংক্রিয় কন্ঠস্বর ফোনদাতাকে স্বাগত জানিয়ে অপেক্ষা করতে বলে। কিন্তু তাদের নেটওয়ার্কে কোন সমস্য হলে তারা সয়ংক্রিয় সিস্টেমটি বন্ধ করে পুরো লাইনটি ব্যস্ত করে রাখে।
ফেয়ার ইউজেস পলিসির নামে প্রতারণা
ফেয়ার ইউজেস পলিসির কথা দোহাই দিয়েও গ্রাহক হয়রানি করছে বাংলালায়ন। বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে দেখানো হয় যে বাংলালায়ন গ্রাহকেরা ইউটিউবে উচ্চগতিতে ভিডিও দেখতে পারবেন, বড় ফাইল মিনিটের মধ্যেই ডাউনলোড হয়ে যাবে। কিন্তু সবই প্রতারণা। রাত দশটার পর বাংলালায়ন গ্রাহকেরা ইউটিউবে ভিডিও দেখতে গেলে অথবা বড় কোন ফাইল ডাউনলোড করতে গেলে তাদের প্যাকেজের গতি এক-চতুর্থাংশে নামিয়ে আনা হয়, অর্থাৎ কোন গ্রাহক যদি ৫১২ কেবিপিএস প্যাকেজ ব্যবহার করেন তাহলে ইউটিউবে ভিডিও দেখা অথবা বড় ফাইল ডাউনলোড করার শাস্তি হিসাবে স্পিড ১২৮ কেবিপিএস করে দেয়া হয়। কিন্তু বিলের ক্ষেত্রে কোন প্রকার ছাড় দেওয়া হয় না।
কিন্তু বাংলালায়নের ওয়েবসাইটে দেয়া ‘ফেয়ার ইউজেস পলিসি’ অনুযায়ী কোন গ্রাহকের প্যাকেজ অনুযায়ী তার গতি অর্ধেক কমানোর কথা বলা হলেও গ্রাহকদের প্যাকেজের গতি এক-চতুর্থাংশে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ ব্যাপারে সাবাব আল ফারাবি নামে এক গ্রাহক জানান, তার ৫১২ কেবি কিং প্যাকেজ রয়েছে। তাকে প্রায়ই রাতে ফেয়ার ইউজেস পলিসির কথা বলে গতি কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। তবে নিয়ম অনুযায়ী তার গতি ২৫৬ কেবি করার কথা থাকলেও করা হচ্ছে ১৫০ কেবি। এ ব্যাপারে বাংলালায়নের কাষ্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করা হলেও পরিষ্কার কোন উত্তর মেলেনা বলে জানান তিনি।
নিম্নমানের মডেম ও বিক্রয়োত্তর সেবা
বাংলালায়নের ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হলে গ্রাহকদের একটি মডেম কিনতে হয়। নিম্নমানের এ মডেমগুলো চীন থেকে আমদানিকৃত। সংযোগ কেনার সময় ৬ মাসের ওয়ারেন্টি দেয়া হলেও পরবর্তীতে তা খুবই পরিকল্পিতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। বাংলালায়নের মডেম কেনার ছয় মাসের মধ্যে নষ্ট হয়ে গেলেও সেটি পরিবর্তন করা হয় না বরং বিভিন্ন অযুহাতে নতুন করে মডেম কিনে বাংলালায়ন সংযোগ চালু করতে বলা হয়।
এছাড়া কোন গ্রাহক তার মডেম ভেঙ্গে গেলে অথবা হারিয়ে যাওয়ার সমস্যা নিয়ে বাংলালায়ন ডিস্ট্রিবিউটরের কাছে গেলে তাকে নতুন মডেমের সাথে আরেকটি নতুন সংযোগ কিনতে উৎসাহিত করা হয়। আর নতুন মডেমের সাথে নতুন সংযোগ নিলে পুরাতন সংযোগে চলমান মাসের বিল পরিশোধ করা থাকলেও গ্রাহকদের সে বিল পুণরায় দিতে হচ্ছে। এভাবে বাংলালায়ন গ্রাহকদের কাছ থেকে একই মাসের বিল দু’বার নিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
এবিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডিস্ট্রিবিউটর জানান, পুরাতন সংযোগে নতুন মডেম দেয়া মানে ম্যাক পরিবর্তন করা। বাংলালায়নের নিজস্ব ইঞ্জিনিয়ার (প্রকৌশলী) বাদে অন্য কারো ম্যাক পরিবর্তন করার অনুমতি নেই। আর আমাদের এখানে একজন প্রকৌশলী থাকার কথা থাকলেও চার-পাঁচজন ডিস্ট্রিবিউটরের জন্য থাকে মাত্র একজন প্রকৌশলী। আর প্রকৌশলী সর্বক্ষণ না থাকায় আমরাও ম্যাক পরিবর্তন করতে পারিনা। তাই আমরা নতুন মডেম নিতে আসলে তার সাথে নতুন সংযোগ নিতে উৎসাহিত করি। তবে কোন গ্রাহককে এ ব্যাপারে বাধ্য করা হয়না বলে দাবি করেন তিনি।
|