লালমোহনে নদীভাঙন রোধে ১০২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন জসিম জনি
লালমোহন :: দ্বীপ জেলা ভোলার লালমোহন ও তজুমদ্দিন উপজেলাকে মেঘনার ভয়াবহ ভাঙ্গন থেকে রক্ষার জন্য অবশেষে ১০২ কোটি টাকা বরাদ্ধ দিয়েছে সরকার। ১৮ জুন মঙ্গলবার একনেকের বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। ভোলার লালমোহন উপজেলা মেঘনার কড়াল গ্রাসে প্রতি বছরই বিলিন হয়ে যাচ্ছে। মেঘনার গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে একরের পর একর ফসলী জমি। একই সাথে কপাল ভাঙ্গছে খেটে খাওয়া মানুষের।
প্রতিবছর গৃহহীন হয়ে পড়ছে শত শত পরিবার। নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারা এসব মানুষ উদ্ভাস্তু হয়ে বেড়ি বাঁধে বসবাস করছে। তাও নদীতে ভাঙ্গনে বছর বছর গৃহ পাল্টাতে হচ্ছে তাদের। নদীর পাড়ে বসবাস করা এরকম সহস্রাধিক পরিবার ঝড় জলোচ্ছ্বাসের সাথে লড়াই করে বেঁচে আছে। অথচ ভাঙ্গন রোধে এ পর্যন্ত কোন স্থায়ী পদক্ষেপ নিতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। ভাঙ্গন স্থায়ীভাবে রোধ করার লক্ষ্যে ১২০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর অবশেষে ১০২ কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নদীতে জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ও ব্লক পেলে ভাঙ্গন ঠেকানোর জন্য এ প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোধন হয়।
সরেজমিনে জানা যায়, লালমোহন ধলীগৌরনগরের কালামবুল্যাহ ও কুণ্ডেরহাওলা অংশের প্রাই দুই কিলোমিটার বেড়ি বাঁধের বড় অংশ হুমকির মুখে। এই অংশের মূল বেড়ি বাঁধ ভেঙ্গে গেছে কয়েক বছর আগেই। বিকল্প রিং বাঁধ দিয়ে লালমোহনকে রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এই রিং বাঁধ প্রতি বছরই মেঘনার কড়াল গ্রাস আর বৈরি আবহাওয়ার কারণে ছুটে যাচ্ছে। গত ১৬ মে ঘূর্ণিঝড় মহাসেন এর তাণ্ডব ও পরবর্তীতে অব্যাহত বৃষ্টিপাতের কারণে এই রিংবাঁধের ৮০০ মিটার অংশই নদী গর্ভে চলে গেছে। এতে মেঘনার পানি হু হু করে অভ্যান্তরে প্রবেশ করে লোকালয় প্লাবিত হয়ে গেছে।
ধলীগৌরনগর ও লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের অন্তত ১০টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। পানির নিচে তলিয়ে যায় রাস্তা ঘাটসহ, রবিশষ্য, পুকুর ও ঘেরের মাছ। বর্ষা মৌসুম এলেই রাক্ষুসে মেঘনার তীব্র ভাঙ্গন ভয়াল রূপ ধারন করে। মেঘনার অব্যাহত ভাঙ্গনের ফলে যেমন ছোট হয়ে আসছে উপজেলার মানচিত্র, অন্যদিকে গৃহহীন হয়ে পড়ছে নদীর কুলে বসবাসরত সাধারন মানুষগুলো।
লালমোহন উপজেলার ধলীগৌরগর ইউনিয়নের মঙ্গলসিকদার নুরুল্লা থেকে জনতা বাজার এবং জনতা বাজার থেকে পাটোয়ারীর হাট ও লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের চাঁদপুর হাজী আঃ জলিলের বাড়ি সংলগ্ন, ফাতেমাবাদ ডাঃ সালাউদ্দিন বাড়ি সংলগ্ন এবং গাইট্ট্যার খাল সংলগ্ন বেড়ি বাঁধ অত্যান্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানান লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মিয়া। প্রায় ১০ স্থানে করাল গ্রাসী মেঘনার ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারন করেছে। দিনে দিনে রাক্ষুসে মেঘনার ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে মানুষের বসত বাড়ি, ফসলি জমি, সুপারির বাগান, মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
মেঘনা পাড়ে বসবাসরত হাসিনা বেগম (৫০) কান্নজড়িত কন্ঠে জানান, এ পর্যন্ত ৪ বার নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে সবকিছু হারিয়ে এখন নিঃস্ব হয়ে বসবাস করছি মেঘনা পাড়ে। যে ভাবে নদীর ভাঙ্গন চলছে তাতে কিছু দিনের মধ্যে এখান থেকেও সরে যেতে হবে। কালামুল্যাহ গ্রামের মোল্লা বাড়ির পঞ্চাশোর্ধ জাহানারা বেগম ক্ষোভের সাথে জানান, ৩ বার নদী ভাঙ্গনের শিকার হবার পর এই এলাকায় এসে ঘর তুলে বসবাস করছি। এখানে এসেও নিরাপদ নেই। গত কয়েকদিন আগে বেড়ি ভেঙ্গে পানিতে টইটুম্বর হয়ে গেছে বাড়ি। রান্না ঘর, শোবার ঘর সবখানে পানি উঠেছে। একই বাড়ির আকতার মাঝি (৩৫) বলেন, পানির কারণে ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে খুবই চিন্তিত অবস্থায় দিন কাটাতে হয় আমাদের ।
লালমোহন পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোঃ আলাউদ্দিন আমাদের বরিশাল ডটকমকে জানান, লালমোহনকে রক্ষা করার জন্য ১২০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। দীর্ঘদিন পর তা অনুমোদন হয়েছে। এ অর্থ দিয়ে লালমোহন উপজেলার ধলিগৌর নগর ইউনিয়ন থেকে তজুমদ্দিন উপজেলার চাঁচড়া পর্যন্ত সাড়ে ৪ কিলোমিটার অতিঝুঁকিপূর্ণ মেঘনার পাড়ে ব্লক স্থাপন করা হবে। তারা খুব শিগগিরই কাজ শুরু করবেন বলে জানান।
এদিকে মেঘনাকে ভাঙ্গন থেকে রক্ষা করার জন্য অর্থ বরাদ্ধ হওয়ার খবর এলাকায় পৌঁছলে শত শত মানুষ আনন্দ মিছিল বের করে। লালমোহন ও তজুমদ্দিন উপজেলার মেঘনার তীরবর্তী এলাকায় বইছে আনন্দের জোয়ার।
সম্পাদনা: সেন্ট্রাল ডেস্ক |