একবেলা স্কুল, একবেলা রিকশা চালিয়ে অদম্য জাকির জিপিএ ৫ পেয়েছে
 পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার রিকসাচালক জাকির হোসেন দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছে। আনন্দিত জাকির শনিবার বিকেলে তার মা’কে নিয়ে রিকসা চালিয়ে ভান্ডারিয়া শহরে ঘুরে বেড়ান (ছবিঃ আমাদের বরিশাল ডটকম)
পিরোজপুর, ১৪ মে (এস.এম. নুরে আলম সিদ্দিকী/আমাদের বরিশাল ডটকম): একবেলা রিকশার চাকার প্যাডেল ঘুরিয়ে অন্নের সংস্থান আর একবেলা লেখা পড়া করে এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায় বিস্ময় বালক জাকির হোসেন। “গরীবের কেউ নাই। তাই গরীবের বাঁচার অধিকার নাই। এহন আমার এ ভুল ভাইঙ্গা গেছে। আমার রিকশা চালক পোলা জাকির আইজ ভাল পাস দিছে। মানুষ আমারে জিপিএ ৫ পাওয়া পোলার মা কইয়া ডাকে। আমার এই সুখের জন্য আল্লাহ’র কাছে হাজার শুকুর।” এসএসসি পরীক্ষায় রিকশা চালক ছেলের ভাল ফলাফলে আনন্দিত মা মাকসুদা বেগম এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানান। পরীক্ষার ফলাফলে আনন্দিত জাকির গতকাল শুক্রবার বিকেলে নিজের রিকশায় মা মাকসুদা বেগমকে আরোহী করে উপজেলা শহরের অলি গলি ঘুরে বেড়ান।
জানাগেছে, জাকিরের বয়স যখন আট মাস তখন দিনমজুর বাবা ইউনুস মিয়া কাজের সন্ধানে খুলনা গিয়ে আর বাড়ি ফিরে আসেননি। আজ পর্যন্ত সে নিখোঁজ রয়েছেন। মাসুদা বেগম সেই থেকে গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে তিন ছেলেকে বড় করে তুলেছেন। জাকির তার ছোট ছেলে। তাঁর অন্য দুই ভাই শ্রমিক। জাকির হোসেন মাসিক ৬০০ টাকায় রিকশা ভাড়া নিয়ে ভান্ডারিয়া শহরে একবেলা রিকশা চালায়। আর অন্যবেলা উপজেলার নদমূলা ইউনিয়নের শিয়ালকাঠী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে লেখা পড়া করতো। ঠিকমত স্কুলে যেতে পারেনি সে। মেধাবী বলে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে বিদ্যালয়ের গড় হাজিরার জন্য কখনও কঠোর হননি। বাণিজ্য বিভাগের ছাত্র জাকিরের পড়াশুনার খরচ চলেছে রিকশা চালানোর আয়ে। কখনও মানুষের সহায়তা নিয়ে। এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের অতগুলো টাকা ছিলনা বলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিজেই সে টাকা দেন। এমন অবস্থায় ভান্ডারিয়া শহরের একটি বাসায় থেকে পরীক্ষা দিয়েছে। এমনকি পরীক্ষা চলাকালীন বন্ধ দিনগুলোতেও তাকে রিকশা চালাতে হয়েছে। অর্ধাহার আর অনাহারী জীবনে আশার আলো ছড়িয়েছে জাকির। রিকশার চাকায় বাঁধা পড়া জাকির ও তার হত দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা এখন নতুন জীবনের স্বপ্ন বুনছেন। রিকশার চাকায় আর যেন বাঁধা পড়ে থাকতে না হয় অদম্য মেধাবী জাকিরকে।
জাকিরের সহপাঠি ও বন্ধু মুবিন হোসেন বলেন, ও রিকশা চালিয়ে জীবিকা ও পড়াশুনা চালায় এতে কখনও ভর্ৎসনা করিনি। বরং ওকে পড়াশুনায় উৎসাহ দিয়েছি। ওর ভাল ফলাফলে আমাদের স্কুলের সবাই আনন্দিত।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কিরন চন্দ্র বসু বলেন, জাকির আমার স্কুলে ৭ম শ্রেণীতে এসে ভর্তি হয়। সে রিকশা চালক এ কথা প্রথমে আমি জানতাম না। যখন সে নবম শ্রেণীর ছাত্র তখন একদিন বিকেলে ভাণ্ডারিয়া শহরে রিকশা চালাতে দেখে আমি হতবাক হই, ব্যথিত হই। পরদিন স্কুলে এসে স্কুলের টিউশন ফিসহ সকল ধরনের ফি মওকুফ করে দেই। তাকে সাহস দিয়ে পড়তে বলি। আজ সে আমার স্কুলের সুনাম কুড়িয়েছে। সে আমার কাছে এক বিস্ময় বালক।
পরীক্ষার ফলাফলে আনন্দিত জাকির হোসেন বলেন, দারিদ্রের সঙ্গে লড়েছি। নিত্য অভাব আমাকে তাড়িত করেছে। তবু সাহস হারাইনি। আমি জানি আমাকে আরো দীর্ঘ মেয়াদী লড়াইয়ে নামতে হবে। আমি চার্টার্ড এ্যকাউন্ট্যান্ট হয়ে সে লড়াইয়ে জিততে চাই।
–
(আমাদের বরিশাল ডটকম/পিরোজপুর/নুআ/তাপা)
সম্পাদনা: সেন্ট্রাল ডেস্ক |