Current Bangladesh Time
শনিবার নভেম্বর ১৮, ২০১৭ ৭:০৬ পূর্বাহ্ন
Barisal News
Latest News
প্রচ্ছদ » পাঠকের লেখা » কীর্তনখোলা – এক স্মৃতি ভারাক্রান্ত গানের গল্প
২০ সেপ্টেম্বর ২০১৩ শুক্রবার ৪:৩৮:০৩ অপরাহ্ন
Print this E-mail this

কীর্তনখোলা – এক স্মৃতি ভারাক্রান্ত গানের গল্প
আল-আমিন বাবু


আমার শিশু বেলার কিছু মধুর আর দুঃখের স্মৃতি নিয়ে লেখা এই গানটি। বরিশাল শহরের গা ঘেষে যে নদীটি বয়ে গেছে – তার নাম কীর্তনখোলা। আমি সেই কীর্তনখোলার ছেলে। কীর্তনখোলার পশ্চিম দিকে বরিশাল শহর আর পূর্বে কাউয়ার চর। সেই কাউয়ার চরে ছিল আদম আলী হাজী মিয়ার ইটের ভাটা বা ইট খোলা। আমরা বন্ধুরা স্কুল পালিয়ে সেই ইটের ভাটায় চড়ুইভাতি খেতে যেতাম। আদম আলী হাজী বরিশালের একজন খুব ধার্মিক মুসলিম এবং জনদরদী মানুষ ছিলেন, আজকালকার মৌলবাদী হুজুরদের মত না।

আমরা থাকতাম বগুড়া রোড পেশকার বাড়িতে। একাত্তরে যুদ্ধের সময় আমরা শিশুরা ছাড়া একটা কোনো বালকও ছিলোনা আমাদের এলাকাতে। ওরা সবাই যুদ্ধে গিয়েছিল, শুধু আমাদের দাদা-নানা অর্থাৎ বুড়ো, শিশু আর মহিলা ছাড়া সবাই যুদ্ধে, আমরা এলাকার সবগুলো পরিবার মিলে এখানে সেখানে লুকিয়ে থাকছি আজ এ-গ্রামে কাল ও-গ্রামে, সে এক অদ্ভুত ভৌতিক সময়।

এরমাঝেও একটা মজার বিষয় ছিল, তাহলো আমরা সবাই একসাথে থাকছি। কোনো ভেদাভেদ নাই, উচু আর নিচু তলার মানুষদের মধ্যে। আমরা তখন সবাই এক, আমাদের একটাই পরিচয় – আমরা বাঙালি। আমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছি পাকিস্তানী মিলিটারি আর তাদের দোসর রাজাকার, আলবদরদের হাত থেকে।

এভাবে নয়মাস, একদম বন্ধ করা উত্তেজনাপূর্ণ সময়ের মধ্যেও একে অপরের প্রতি কি ভালবাসা! আমরা গোটা এলাকাটাই একটা পরিবার ছিলাম সেসময়।

al-amin-babu আল-আমিন বাবুবঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চ এর ভাষণের পর থেকেই আমাদের এলাকার সদর গার্লস স্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং শুরু হয়েছিল। সে ট্রেনিং এ আমরা শিশুরাই শুধু বাদ পড়েছিলাম, তাতে কি আমরাও বা কম যাই কিসে? আমরা নারকেল গাছের ডাল, কাঠ দিয়ে, অস্ত্র বানিয়ে নিলাম, আমরাও যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা শুরু করে দিলাম, এলাকার সবাই মিলে বিভিন্ন আকারের ট্রেঞ্চ বানালো আর ওগুলো হয়ে উঠলো আমাদের উপযুক্ত যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার জায়গা। আমাদের বাড়ির রান্নাঘরের পিছনে করা হলো ‘ডাব্লিউ’ আকারের এর একটা ট্রেঞ্চ, বেশ অনেক জায়গা নিয়ে। আমরা ওটার মধ্যে পাটি বিছিয়ে, এমনকি ঘরে থেকে বালিশ কাথা নিয়ে গেলাম। এলাকার প্রায় সব শিশুদের উৎকৃষ্ট খেলার জায়গা ছিল ওই ট্রেঞ্চটি।

এরপর শুরু হলো সত্যিকারের যুদ্ধ, আর আমাদের পালানো। আমাকে শিখিয়ে দেয়া হলো- কেউ যদি ভাইয়া বা আব্বার কথা জিজ্ঞেস করে যেন বলি তারা মসজিদে গেছেন। আমি যেন “জয় বাংলা” শব্দটা না বলি। পাকিস্তানি মিলিটারিদের সামনে “জয় বাংলা” বললে ওরা মেরে ফেলবে – এরকম আরো কত কি। পাকিস্তানি মিলিটারিদের কাছে “জয় বাংলা” শব্দটি ছিল একটা আতংকের মত তাই ওটা বলা যেত না কিন্তু এই স্বাধীন দেশে এটা এখন কার জন্য আতংক? আজ “জয় বাংলা” শব্দটা কেন হারিয়ে যাচ্ছে?

তারপর দেশ স্বাধীন হলো। ভাইয়ারা বিজয়ীর বেশে ফেরত আসল। তবে সেন্টু ভাই আসল না, সাথের অনেকেই আর ফেরেনি। আম্মা ভাইয়াকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকলো। ভাইয়া আম্মাকে রেখে সেন্টু ভাইয়ের আম্মাকে জড়িয়ে ধরল, কত স্মৃতি!!

এরপর বাহাত্তরে আমরা ঢাকায় চলে এলাম, তবুও প্রতি বছরই দুই থেকে তিনবার বরিশালে যেতাম। এভাবে অনেক বছর কেটে গেল, কিন্তু সেবার একটু ভিন্ন রকম ঘটনা ঘটল।

al-amin-babu-chime-barisal আল-আমিন বাবু চাইমবরিশালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ব্যাডমিন্টন চাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হবে, আর আমার ভাবি সেখানে খেলবেন। ঢাকা থেকে আমরা গেলাম, আমার সাথে আমার এক বন্ধু রতন আর আমার গিটার। ভাবি চাম্পিয়ন হলেন। স্টিমারে করে ঢাকায় ফিরছিলাম। স্টিমার চলার সময় স্টিমার আর ফ্লাটের মাঝে পানিতে একটা ঘুর্ণির সৃষ্টি হয়, আবার কিছুক্ষণ পরে পানিটা স্থির হয়ে একদম থিতু হয়ে যায়।

যখন ঘাট ছাড়ল তখন ওখানে চোখ পড়ল, হটাৎ বুকের মধ্যে কেমন হাহাকারের মত হল। সবকিছু খালি খালি লাগছে, মনে হচ্ছিলো আমি যেন কি হারিয়ে ফেলছি। যেন আমার নাড়ির সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।

রতন আর আমি গিটারটা নিয়ে নিচের ডেকে চলে গেলাম। আমার হাত D মেজর কর্ড এর উপর বসে গেল, আর আমি এ গানটা করে ফেললাম। এ যেন আমার নয়, এটা প্রকৃতির সৃষ্টি।

স্টিমার থেকে নেমে সোজা বনগ্রামে টুলুর বাড়িতে। ওকে গানটা শুনালাম। ও বললো, ‘হেভি হইছে’। টমও শুনলো, এরপর রেকর্ড হলো।

গানের নাম দিলাম ‘স্মৃতিচারণ’। চাইম’র প্রথম অ্যালবামে গানটা প্রকাশ করা হল। গান কেমন হয়েছে তা চাইম’র স্রোতারাই ভালো বলতে পারবেন, আমি শুধু আনন্দিত, গর্বিত এই ভেবে যে, আমি যে কীর্তনখোলার ছেলে – তা এই গানের মাধ্যমে জানিয়ে দিলাম।
——- ——- ——- ——- ——- ——- ——- ——-
বরিশালের সন্তান আল-আমিন বাবু ৮০’র দশকের জনপ্রিয় ব্যাণ্ডদল চাইম’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যণ্ড অ্যাসোসিয়েশন (বিএএমবিএ)’র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও ইয়োথ ফর পিস এণ্ড ডেমোক্রেসি (ওয়াইপিডি)’র একজন পরামর্শক। এছাড়া সম্প্রতি শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চেরও একজন সংগঠক তিনি।


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগ
বরিশালে শেখ হাসিনা সেনানিবাস স্থাপন প্রকল্প অনুমোদন
লক্ষ্মীপাশা-দুমকী মহাসড়কে নির্মীত হচ্ছে গোমা সেতু
বিএম কলেজে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপে মারামারি
১৪ নভেম্বরকে ‘বিচারক হত্যা’ দিবস ঘোষণার দাবি
সিডরে নিখোঁজ ৯ জনের পরিবারে এখনো মাতম
Recent: Mayor Hiron Barisal
Recent: Barisal B M College
Recent: Tender Terror
Kuakata News

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
আমাদের বরিশাল ২০০৬-২০১৪

প্রকাশক: মোয়াজ্জেম হোসেন চুন্নু, সম্পাদক: রাহাত খান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: মোঃ জিয়াউল হক
৪৬১ আগরপুর রোড (নীচ তলা), বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, ই-মেইল: [email protected]