Current Bangladesh Time
রবিবার জুন ২৫, ২০১৭ ৬:১৫ পূর্বাহ্ন
Barisal News
Latest News
প্রচ্ছদ » পর্যটন, ভোলা, মনপুরা » আটশ বছরের পুরানো দ্বীপে ঘুমায় সম্ভাবনা
২২ জানুয়ারী ২০১৪ বুধবার ১১:২২:৪৮ পূর্বাহ্ন
Print this E-mail this

আজও অবহেলিত মনপুরা

আটশ বছরের পুরানো দ্বীপে ঘুমায় সম্ভাবনা
অচিন্ত্য মজুমদার, মনপুরা থেকে ফিরে


monpura-photo-bhola মনপুরা দ্বীপ ভোলা

দ্বীপ জেলা ভোলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ছোট্ট এক দ্বীপ মনপুরা। ভোলা সদর থেকে ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বঙ্গোপাসাগরের কোল ঘেঁষে মেঘনার বুকে জেগে ওঠা আটশ বছরের পুরানো এ দ্বীপটি প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি। পর্যটনের অপার সম্ভাবনা থাকলেও মনপুরা আজও অবহেলিত।

প্রাণী ও উদ্ভিদ সম্পদের বৈচিত্রে ভরপুর এ দ্বীপে না আসলে বোঝাই যাবে না এ দ্বীপ উপেজলায় কি মায়া লুকিয়ে আছে। পর্যটক বা ভ্রমণ পিপাসু মানুষকে মুগ্ধতার বন্ধনে আটকে দেয়ার বহু জাদু ছড়ানো আছে এ দ্বীপে। এখানে ভোরের সূর্য ধীরে ধীরে পৃথিবীতে তার আগমনী বার্তা ঘোষণা করে। আবার বিকেলের শেষে এক পা-দুপা করে সে আকাশের সিঁড়ি বেয়ে লাল আভা ছড়াতে ছড়াতে পশ্চিমাকাশে মুখ লুকোয়। রাতে নতুন শাড়িতে ঘোমটা জড়ানো বধুর মত সলাজ নিস্তব্ধতা ছেয়ে যায় পুরো দ্বীপ।

জমির শাহ পূর্ণ সাধকের স্মৃতি বিজড়িত এই মনপুরা দ্বীপের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। সাতশ বছর আগে পর্তুগিজ জলদস্যুদের আস্তানা ছিল মনপুরায়। তাই আজও এখানে দেখতে পাওয়া যায় পর্তুগিজদের নিয়ে আসা কেশওয়ালা লোমশ কুকুর।

monpura-forest ম্যানগ্রোভ বন মনপুরা দ্বীপ ভোলা

মনপুরা ২নং হাজির হাট ইউনিয়নের জংলার খাল এলাকার কেওড়া বন

মনপুরার প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে হাজার হাজার একরের ম্যানগ্রোভ বন। যেখানে জীবিত গাছের সংখ্যা এক কোটিরও বেশি। মাইলের পর মাইল বৃক্ষরাজির বিশাল ক্যানভাস মনপুরাকে সাজিয়েছে সবুজের সমারোহে।

মনপুরার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল – চর তাজাম্মুল, চরজামশেদ, চরপাতিলা, চর পিয়াল, চরনিজাম, লালচর, বালুয়ারচর, চর গোয়ালিয়া, সাকুচিয়াসহ ছোট-বড় ১০-১২টি চরে বন বিভাগের প্রচেষ্টায় চলছে নীরব সবুজ বিপ্লব। চোখ ধাঁধানো রূপ নিয়েই যেন এসব চরের জন্ম। চরগুলো কিশোরীর গলার মুক্তোর মালার মতো মনপুরাকে ঘিরে আছে। শীত মৌসুমে হাজার হাজার অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকে সমগ্র চরাঞ্চল। চরাঞ্চলের অতিথি পাখির উড়ে বেড়ানো, হরিনের পালের ছোটাছুটি, সুবিশাল নদীর বুক চিরে ছুটে চলা জেলে নৌকা, ঘুরে বেড়ানো মহিষের পাল আর আকাশ ছোঁয়া কেওড়া বাগান কঠিন হৃদয়ের মানুষের মনও ছুঁয়ে যায়। চারদিকে নদীবেষ্টিত মনপুরায় নৌকা কিংবা সাম্পানের ছপছপ দাঁড় টানার শব্দ আর দেশি-বিদেশি জাহাজের হুঁইসেলের মিলে মিশে একাকার হলে মনে হয় কোনো দক্ষ সানাইবাদক আর তবলচির মন ভোলানো যুদ্ধ চলছে।

monpura-deer-horin হরিণ মনপুরা দ্বীপ ভোলা

মনপুরা ৩ নং সাকুচিয়া ইউনিয়নের আবাসন প্রকল্পের উঁচু পুকুর পাড়ে হরিণের পাল

মনপুরায় যে শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্যই দেখা যাবে তা নয়। গতানুগতিক সব খাবার ছাড়াও তিনটি স্পেশাল আইটেম আছে মনপুরার। এগুলো হচ্ছে – খাসি পাঙ্গাস, মহিষের দুধের কাঁচা দই ও শীতের হাঁস। নদী থেকে ধরে আনা টাটকা খাসি পাঙ্গাস আর চরাঞ্চলে ঘুরে বেড়নো মহিষের পাল (বাতান) থেকে সংগৃহিত কাঁচা দুধ বা দইয়ের স্বাদই আলাদা। তাছাড়া মেঘনার টাটকা ইলিশের স্বাদও ভোলা যায় না কখনো।

মনপুরার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গায় গড়ে উঠেছে মনপুরা ফিশারিজ লিমিটেড। ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২১০ একর জমিতে গড়ে ওঠা ওই খামারবাড়িতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় গড়ে উঠতে পারে পর্যটন কেন্দ্র। এ খামার বাড়িতে রয়েছে বিশাল চার-পাঁচটি পুকুর ও বাগান। সেখানে নারিকেল গাছের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। দৃষ্টিনন্দন এ খামার বাড়িটি হতে পারে পর্যটকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ।

অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাই মনপুরার প্রধান সমস্যা। মনপুরার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ উন্নত হলেও বাণিজ্যিক যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই করুণ। যখন তখন যে কেউ ইচ্ছে করলেই মনপুরা যেতে-আসতে পারেন না। ঢাকা থেকে সরাসরি লঞ্চে মনপুরায় যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে হাতিয়াগামী লঞ্চ মনপুরায় রামনেওয়াজ ঘাটে প্রায় এক ঘণ্টা যাত্রাবিরতি করে। মনপুরার মানুষও ওই লঞ্চেই ঢাকায় যাতায়াত করেন। আবার ঢাকা থেকে ফেরেন ওই একই লঞ্চে।

monpura-birds-otithi-pakhi

মনপুরার কলাতলির চরে অতিথি পাখি

এছাড়া ঢাকা কিংবা বরিশাল থেকে ভোলা হয়ে তজুমদ্দিন ঘাটের সি-ট্রাকে মনপুরায় যাওয়া যায়। সি-ট্রাকটি তজুমদ্দিন থেকে ছাড়ে প্রতিদিন বিকাল ৩টায় আর মনপুরা থেকে ছাড়ে সকাল ১০টায়। অপরদিকে চরফ্যাশনের বেতুয়াঘাট থেকে মনপুরার জনতা বাজার রুটে দৈনিক দুটি লঞ্চ চলাচল করে। ওই রুট দিয়েও প্রতিদিন শত শত মানুষ মনপুরায় আসা-যাওয়া করছেন। এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এ নদীপথটি ডেঞ্জার পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় এই রুটে তখন লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকে।

মনপুরায় ভালো মানের কোনো পর্যটন হোটেল না থাকায় পর্যকটকরা এখানে আসতে খুব একটা আগ্রহী হন না। তবে মনপুরা প্রেসক্লাব প্রাথমিকভাবে মাঝারি মানের একটি হোটেলের ব্যবস্থা করেছে।

মনপুরা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ্ব নজির আহমেদ মিয়া আমাদের বরিশাল ডটকম’কে বলেন, ‘মনপুরাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে প্রথমেই যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যেক্তারাও যদি গুরুত্বের সাথে অবহেলিত এ সম্ভাবনার উপর দৃষ্টি রাখতেন, তবে এখানে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব।’

একই সুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আবদুল্যাহ আল বাকীর কন্ঠে। আমাদের বরিশাল ডটকম’কে তিনি বলেন, ‘ভোলা জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও প্রকৃতির বৈচিত্রময় নানা আয়োজন ছড়িয়ে আছে এ মনপুরা দ্বীপে। অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা, ভাল মানের হোটেল, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিসহ আনুসাঙ্গিক বিভিন্ন সুবিধা বাড়াতে পারলে মনপুরা দেশের অন্যতম পর্যটন স্পট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।’

monpura-mangrove-forest-sikor ম্যানগ্রোভ গাছের শিকড় মনপুরা দ্বীপ ভোলা

মনপুরা আলম বাজার সংলগ্ন শ্বাসমূলীয় (ম্যানগ্রোভ) বন

সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে তজুমদ্দিন-মনপুরা এবং চরফ্যাশন-মনপুরা রুটে স্পিডবোট সার্ভিস চালু করলে পর্যটকরা কম সময়ে মনপুরায় যেতে পারবেন। তাছাড়া মনপুরায় ভালো মানের হোটেল-মোটেল গড়ে উঠলে এ দ্বীপে পর্যটকদের আগমন বাড়বে। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করলে মনপুরা হতে পারে দেশের অন্যতম পর্যটন স্পট। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

আরো জেনে রাখুন
ভোলা জেলার ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, তেরশ শতাব্দীতে এ দ্বীপের উৎপত্তি হয়। তবে মানুষের বসবাস শুরু হয় ষোড়শ শতাব্দীতে। দ্বীপটি বাকলা চন্দদ্বীপের (বরিশালের পূর্ব নাম) জমিদারি প্রথার অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে সময় কয়েকজন ইউরোপীয় পরিব্রাজক ডারথেমা লি ব্রাংক, সিজার ফ্রেডরিক ও মউনরিক এই দ্বীপ ভ্রমণে আসেন। এ সময় মি. মউনরিক তৎকালীন দক্ষিণ শাহবাজপুর ও চর মনপুরাকে উদ্ভিদ বৈচিত্র্য পরিপূর্ণ দ্বীপ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

১৫১৭ সালে এই পরিব্রাজকরা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য মনপুরাকে নির্বাচিত করে বসতি স্থাপন শুরু করেন। তখন এ দ্বীপটির অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদী জলাশয়ের মাছ, পশুসম্পদ, মহিষের দুধ, পনির এবং দই যে কোনো আগন্তুকের মন ভরিয়ে দিত বলে এই দ্বীপের নামকরণ করা হয় মনপুরা। তবে মনপুরার নামকরণ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।

ঐতিহাসিক বেভারিজ মনপুরার নামকরণ নিয়ে লিখেছেন, মনগাজী নামের এক ব্যক্তি সেই সময়ের জমিদারি থেকে মনপুরা চর লিজ নেন অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে। পরবর্তী সময়ে তার নামনুসারে এই দ্বীপটির নামকরণ করা হয় মনপুরা।

স্থানীয় লোককাহিনী মতে, মনগাজী নামের এখানকার একজন মাঝি বাঘের আক্রমেণ প্রাণ হারালে এ চরের নাম হয়ে যায় মনপুরা। এই দ্বীপটি এক সময় হাতিয়া-সন্দ্বীপের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং মোঘল শাসনামলে এখানে সন্দ্বীপের লোকেরা বসতি স্থাপন শুরু করে।

১৮৩৩ সালে মনপুরাকে ভোলার অধীনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দেয়া হয়। এর একশ বছর পর ১৯৮৩ সালে মনপুরা উপজেলায় উন্নীত হয়।

সম্পাদনা: সেন্ট্রাল ডেস্ক

শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগ
আনসার, লাইফবয়া ছাড়াই রাজধানী ত্যাগ লঞ্চের
বরিশাল নৌ বন্দরে লঞ্চের ধাক্কা, মাস্টার আটক
মজুচৌধুরীরহাট ঘাটে থমকে দক্ষিণমুখী ঈদ যাত্রা
ছুটিতে চিকিৎসকরা, হাসপাতাল ছাড়ছেন রোগীরা
বরিশাল-পটুয়াখালীর হাজারো পরিবারে ঈদ রোববার
Recent: Mayor Hiron Barisal
Recent: Barisal B M College
Recent: Tender Terror
Kuakata News

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
আমাদের বরিশাল ২০০৬-২০১৪

প্রকাশক: মোয়াজ্জেম হোসেন চুন্নু, সম্পাদক: রাহাত খান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: মোঃ জিয়াউল হক
৪৬১ আগরপুর রোড (নীচ তলা), বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, ই-মেইল: hello@amaderbarisal.com