
বরিশালের ঐতিহ্যবাহী বিআই হোস্টেলের দৈন্যদশা
সাঈদ পান্থ আমাদেরবরিশাল.কম ২ April ২০১৫ Thursday ৭:২৫:৪৪ PM

অর্থ সংকট ও ট্রাস্টি বোর্ডের উদাসীনতায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে ১২০ বছরের পুরোনো বরিশালের বেল ইসলামিয়া (বিআই) হোস্টেল। অথচ প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে কয়েক কোটি টাকার স্থাবর সম্পত্তি। তবু সর্বত্রই অর্থ-সংকট ও দৈন্যদশার ছাপ। রংহীন দেয়াল থেকে খসে পড়ছে পলেস্তরা।
এদিকে হোস্টেলের জমিতে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক ভবনের ব্যবসায়ী ও ভাড়াটিয়াদের সিন্ডিকেটের কারণে প্রতি মাসে প্রায় দুই লাখ টাকার ভাড়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। বেহাত হয়ে যাচ্ছে সম্পত্তি।
অপরদিকে ছাত্রদের আবাসন সুবিধা বৃদ্ধির জন্য কোন পদক্ষেপ নেয়নি কেউ শতবর্ষেও। ভাড়াটিয়ারা হোস্টেলের জমিতে স্থায়ী দখলদারিত্ব গেড়ে বসেও থেমে নেই উল্টো খবরদারি করছেন ট্রাস্টি বোর্ডের বিরুদ্ধে।
ট্রাষ্ট্রি র্বোডের সভাপতি জেলা প্রশাসক মোঃ শহীদুল আলম জানিয়েছেন, হোস্টেলের অর্থ-সংকট কাটাতে সম্প্রতি দোকান ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
পেছনে ফিরে তাকালে জানা যায়, ১৮৯৫ সালে বরিশালের গীর্জা মহল্লায় তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার ম্যাজিস্ট্রেট নিকোলাস বিটসেন বেল ও খান বাহাদুর মৌলভী হেমায়েত উদ্দিনের প্রচেষ্টায় মুসলিম ছাত্রদের থাকার জন্য এই হোস্টেলটি নির্মাণ করা হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিকোলাস বিটসেন বেল’র নাম অনুসারে ‘বেল ইসলামিয়া হোস্টেল’ নামকরণ করে ট্রাস্টিজ বোর্ড গঠনের মাধ্যমে হোস্টেলটি পরিচালনা শুরু হয় ১৯০৫ সালে।
বৃটিশ আমলে মুসলমান ঘরের সন্তানরা যখন স্কুলে যাওয়ার চিন্তা করতো না তখন কঠোর অনুশাসনের কারণে তৎকালীন ভোলা, বাউফল, পটুয়াখালী ও বরগুনার বিত্তবান পরিবারের সন্তানদের এখানে রেখে পড়াশোনা করানো হতো। এ হোস্টেলের আবাসিক ছাত্রদের অনেকেই পরে দেশের খ্যাতিমান আমলা/মন্ত্রী হয়েছেন। মাত্র আট কাঠা জমি দিয়ে এই হোস্টেলের যাত্রা শুরু হলেও কালক্রমে এর জমির পরিমাণ প্রায় চার একর পর্যন্ত পৌঁছে।
বর্তমানে এই হোস্টেলের জমিতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আছমত আলী খান ইন্সটিটিউশন (একে স্কুল), একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বরিশালের কেন্দ্রীয় হেমায়েত উদ্দিন ঈদগাহ্ ময়দান।
এখন বেল ইসলামিয়া হোস্টেল কর্তৃপক্ষের অধীনে রয়েছে মাত্র ৯৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ জমি।
১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠানের আয় বাড়াতে হোস্টেলের জমিতে ২৭টি স্টল নির্মাণ করা হয়। ইসলামিয়া মার্কেট নামে এই মার্কেট থেকে প্রতি মাসে মাত্র ৩৮ হাজার ৯০৫ টাকা ভাড়া পায় কর্তৃপক্ষ। যার মাধ্যমে শুধু ব্যবসায়ীদের স্বার্থই সুরক্ষিত হচ্ছে। পরে ভাড়া বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেয়া হলেও বর্ধিত ভাড়া দিচ্ছে না ব্যবসায়ীরা। অথচ বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী প্রতিটি স্টলের গড় ভাড়া ৫ হাজার টাকা হলে প্রতিমাসে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ভাড়া আদায় হওয়ার কথা।
২০০৫ সাল থেকে দোতালা ও তিনতলা ভাড়া নিয়ে মেডিনোভা কর্তৃপক্ষ ভাড়া দিচ্ছেন মাসিক মাত্র ২৭ হাজার টাকা করে।
এই অবস্থায় চুক্তি বাতিলসহ নতুন চুক্তির দাবি ও প্রতিষ্ঠানটিকে স্ব-মহিমায় ফিরিয়ে আনার দাবিতে বরিশাল জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছে সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদ।
সমন্বয় পরিষদ নেতারা জানান, জরাজীর্ণ হোস্টেলটির ১৭টি কক্ষে মাত্র ২৭ জন ছাত্র বসবাস করছে। কিন্তু এর চেয়ে প্রতিষ্ঠানটির হেরিটেজ মূল্য অনেক বেশি। প্রতিষ্ঠানের হেরিটেজ মূল্য অক্ষুন্ন রাখতে সংস্কার অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এই কারণে ট্রাস্টিবোর্ড পুনর্গঠনেরও দাবি জানান তারা। মঙ্গলবার(২৪ মার্চ) জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি শান্তি দাস, সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কাজল ঘোষ প্রমুখ।
বেল ইসলামিয়া হোষ্টেলের সুপারিনটেন্ড মোঃ সামসুল আলম আমাদের বরিশাল ডটকম’কে বলেন, ‘৯১ সালে ইসলামিয়া মার্কেট নির্মানের পর পজেসন বাবদ অগ্রীম টাকা গ্রহন না করে ব্যবসায়ীদের কাছে স্টল ভাড়া দেওয়া হয়। মার্কেটের সামনের দিকের স্টলগুলোতে ২ হাজার টাকা করে এবং মাঝে ও পেছনের দিকের স্টলগুলোর মালিকরা ১১শ থেকে ১৫শ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিচ্ছেন।
মেডিনোভা প্রসঙ্গে সুপারিনটেন্ড বলেন, মেডিনোভা কর্তৃপক্ষ তাদের অর্থদিয়ে দোতালা নির্মান করায় কম ভাড়া নির্ধারন করা হয়েছে। এমনকি ভাড়ার টাকা দিয়ে নির্মান ব্যয়ের টাকা ভাড়া দিয়ে কেটে নেওয়া হচ্ছে।
বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমম্বয় পরিষদের সভাপতি শান্তি দাস আমাদের বরিশাল ডটকম’কে জানান, ঐতিহ্যবাহি বিআই হোস্টেল ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। মার্কেটের দোতাল ও তিনতলা মাত্র ২৭ হাজার টাকা মেডিনোভার কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। যা বাজার দরের সঙ্গে মোটেই সামসঞ্জ্য নয়। হোষ্টেলের ১৭ টি কক্ষে ২৭ জন ছাত্রের আবাসনের ব্যবস্থা করা হলেও ভবনের অবস্থা খুবই নাজুক।
ট্রাষ্ট্রি র্বোডের সভাপতি জেলা প্রশাসক মোঃ শহীদুল আলম আমাদের বরিশাল ডটকম’কে জানান, প্রতিষ্ঠানটি অর্থ সংকটে ভুগছে। অনেক সংষ্কার করতে হবে। এ জন্য মার্কেটের দোকান ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কারণ তারা যে ভাড়া দিচ্ছে – তা একেবারে বেমানান।
সম্পাদনা: বরিশাল ডেস্ক
প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
|