
ভয়াল ১৫ নভেম্বর
আট বছরেও কাটেনি সিডরের ক্ষতি !
মো.মিজানুর রহমান টিপু ,বামনা . আমাদেরবরিশাল.কম ১৫ November ২০১৫ Sunday ৯:৩০:৫০ AM
আজ ১৫ নভেম্বর। প্রলংয়কারী ঘূর্ণিঝড় সিডরের অষ্টম বছর আজ। ২০০৭ সালের এই দিনে রাত ১২টায় ঘণ্টায় ১৮০ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানা দমকা হাওয়া ও জলোচ্ছ্বাসে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে বরগুনার বামনা উপজেলার সমগ্র উপকূল। যেদিকে চোখ পড়েছে সে দিকেই ধ্বংসস্তুপ দেখা গেছে। ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে বরগুনার বামনা উপজেলার চারটি ইউনিয়নের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বিষখালী নদীরতীরবর্তী এ জনপদের ১৬ হাজার ৩২টি পরিবার সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ৫০ হাজার ২০৯ জন মানুষ দুর্যোগে পড়েন। ২১ হাজার ৭১৯ জন সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হন। সিডরে ৪৮ জন মানুষের প্রাণহানিসহ ২ হাজার ৬৫ জন মানুষ আহত হন। ১১ হাজার ৭৪৯টি বসতবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। ৪ হাজার ২৮৩টি বসতবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বরগুনার বামনা উপজেলা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরে বিধ্বস্ত হওয়ার ৮ বছর পরেও এ উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ পরিবারকে অদ্যাবধি পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়নি। ঘূর্ণিঝড় সিডরের বিধ্বস্ত পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায় পুনর্বাসনের যে কাজ হয়েছে তা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম। এখনও অনেক পরিবার গৃহহীন বসবাস করছে। সরজমিন দেখা গেছে, বামনা উপজেলা সদর ইউনিয়নের পুরনো বামনা গ্রামের সিডর দুর্গত আইউব আলী (৬৬) এখনও খুপড়ি ঘরে বসবাস করছেন।
তিনি জানান, তার আসল বসতি বিষখালী নদীর পেটে বিলীন হয়ে যায়। সিডরের কয়েক বছর আগে আইউব আলী নদীতীরে খুপড়ি ঘর তুলে কোন মতে বসবাস করে আসছিলেন। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে তার পুরো ঘরটি ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। আবার গৃহহীন হয়ে পড়েন। সিডরের পর একটি এক কক্ষের পুনর্বাসনের ঘরও তিনি পান। সেই ঘরে বসবাসের কোন উপায় নেই। অপরিসর আর বেড়াবিহীন এক কক্ষের ঘরে আর তার ঠাঁই মেলেনি। এখন ওই ঘর ছেড়ে নদীতীরে একটি খুপড়ি ঘরেই তিনি বাস করছেন। শুধু আইউব আলী নন, বামনা সদর ইউনিয়নের কালিকাবাড়ী গ্রামের বিধবা মনোয়ারা বেগম (৫৬) ঘূর্ণিঝড় সিডরে বিধ্বস্ত হওয়ার ৮ বছর পরেও এখনও পলিথিন টানিয়ে ঘরে বসবাস করছেন প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে।
অর্থের অভাবে প্রতিবন্ধী ছেলে মো. সেলিমকে (২১) দুই মুঠো খাবার দিতে পারছেন না। ‘আকাশে মেঘ দেখলেই বুহের মধ্যে কাঁপ (কম্পন) শুরু অয়, মনে অয় আবার বুজি সিডর আইল। এবার বুঝি মাইয়া-পোলারেও ভাসাইয়া লইয়া যাইব’ উপজেলার পুরান বামনা গ্রামের গুরুপদ সাহা এভাবেই তাঁর অনুভূতির কথা বললেন। তাঁর স্ত্রী রেখা রানী সাহা জলোচ্ছাসে ভেসে যায় সেদিন। চার দিন পর তার লাশ পাওয়া গিয়েছিল নদীর পাশে ধানক্ষেতে। তাদের ঘরটিও ভেসে গিয়েছিল। বামনা উপজেলার ৪৯টি গ্রামে ১৬ হাজার ৩২টি পরিবার সম্পূর্ণ রুপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে মাত্র ৩২৩৫টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। ৫৬৪৩টি পরিবার নিজস্ব অর্থায়নে গৃহ পুনঃনির্মাণ কোন রকম করেছে। তবে এখনও ৭ হাজার ১৫৪টি পরিবার রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে-পুড়ে গৃহহীন বসবাস করছে। তাদের অধিকাংশ পরিবারেই স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা নেই। বিশুদ্ধ পানি ক্ষেত্রে ৩০টি পরিবারের জন্য রয়েছে একটি টিউবওয়েল।
উপজেলার বুকাবুনিয়া এবং ডৌয়াতলা ইউনিয়নের যেসব স্থানে টিউবওয়েলের পানি পেতে সমস্যা সে এলাকায় ৪টি পিএসএফ থাকলেও সেগুলো বর্তমানে অকেজো। ফলে বিশুদ্ধ পানির অভাবে ওইসব এলাকার অধিকাংশ মানুষ ডায়রিয়াসহ জটিল রোগে ভুগছে। জাপান সরকারের অর্থ-সহায়তায় সিডর-পরবর্তী গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসন সহায়তা হিসেবে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয় উপকূলীয় বামনা উপজেলায় ৩০টি ব্যারাকে ৩০০ গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে এসব আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলে।
সিডরের ৮ বছর পার হলেও এসব ঘরে দুর্গত মানুষের কষ্টের জীবনযাপনের কেউ খবর নেননি। এসব ব্যারাকে বসবাসকারীদের পানীয়জলের জন্য যেসব টিউবওয়েল বসানো হয়েছিল সেগুলো ছয় মাস পরেই অকেজো হয়ে পড়ে এবং স্বাস্থ্যসম্মত পায়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও ভেঙে পরে। ফলে ব্যারাকগুলোতে আশ্রয় নেয়া পরিবারগুলো বিভিন্ন রোগ-ব্যাধিতে ভুগছেন। আবাসনের ঘরের টিনের ছাউনি মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে বামনা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আহাদী হোসেন জানান, পরিপত্র না দেখে এ মুহূর্তে কিছু বলতে পারছি না।
বামনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মো. মাহবুবুর রশিদ জানান, ঘূর্ণিঝড় সিডরে গৃহহাড়া ছিন্নমূল মানুষরাই আবাসনগুলোতে বসবাস করে তাই কর্তৃপক্ষের উচিত আবাসনগুলো প্রতি দুই বছর পরপর সরজমিন গিয়ে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করা। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে সরজমিন পাঠিয়ে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে।
সম্পাদনা: জপ / বরিশাল ডেস্ক
প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
|