![]() নদীর দু’পাশে করোনা সংক্রমণের এত পার্থক্য কেন?
১ June ২০২০ Monday ১০:১৭:০১ PM
বাংলাদেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। সেই হিসাবে দেশে করোনা সংক্রমণের ১২ সপ্তাহ পেরিয়ে গেল। এবছরের ২৯ মে’র উপাত্ত অনুযায়ী দেশে করোনায় আক্রান্ত মোট শনাক্তের সংখ্যা ৪২ হাজার ৮৪৪ জন। তবে সংক্রমণের পরিমাণ দেশের সব স্থানে এক রকম নয়। মিজানুর রহমান। ভূতাত্ত্বিকভাবে বিভাজিত দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংক্রমণের হার বিভিন্ন রকম। কিছু এলাকায় সংক্রমণ এখনও বেশ কম। সংক্রমণের সঙ্গে ভূতাত্ত্বিক বিভাজনের ভূমিকা দেখার জন্য সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকার সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলের ভূ-সংযোগ ও করোনা সংক্রমণের অবস্থা খতিয়ে দেখেছে বাংলা ট্রিবিউন গবেষণা বিভাগ। পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা ও মেঘনা দ্বারা বিভাজিত বাংলাদেশের পূর্ব পাশের জেলাগুলোতে সংক্রমণের পরিমাণ পশ্চিম পাশের পরিমাণের চেয়ে প্রায় সাতগুণ বেশি। ঢাকার সঙ্গে ভূমি সংযোগের ভিত্তিতে সংক্রমণ পরিস্থিতি ![]() ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডটি ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা ও মেঘনা দ্বারা বিভাজিত। এই চারটি নদীর সমন্বিত গতিপথ দেশের উত্তর অংশ থেকে ক্রমেই দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর গিয়ে পড়েছে। এই নদীগুলোর গতিপথ দিয়ে বাংলাদেশকে যদি মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত করতে হয় তাহলে আমরা দেশকে পশ্চিম ও পূর্ব এই দুই ভাগে বিভক্ত করতে পারি। দেশের উত্তরের পঞ্চগড় থেকে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা বরিশাল ও খুলনার জেলাগুলো পর্যন্ত অঞ্চলকে মোটা দাগে পশ্চিম ভাগ এবং জামালপুর-ময়মনসিংহ থেকে সিলেট হয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পর্যন্ত জেলাগুলোকে পূর্ব ভাগের জেলা হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। আরও বিস্তর পর্যালোচনায় দেখা যায়, পশ্চিম পাশের চারটি বিভাগ আবার পদ্মা দ্বারা দুই ভাগে বিভক্ত। উত্তরে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ এবং দক্ষিণে খুলনা ও বরিশাল বিভাগ। উল্লেখ্য, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের সঙ্গে এই নদী বিধৌত অঞ্চলে ঢাকা বিভাগের পাঁচটি জেলাও রয়েছে। এগুলো হচ্ছে ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও রাজবাড়ী। খুলনা ও বরিশাল বিভাগের সঙ্গে ঢাকা বিভাগের এই পাঁচটি জেলা মিলিয়ে মোট ২১টি জেলা রয়েছে এই অঞ্চলে। এই ২১ জেলার সম্মিলিত জনসংখ্যা তিন কোটি চার লাখ ৭০ হাজার। এসব জেলায় করোনা আক্রান্ত মোট শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪০৪ জন। অর্থাৎ, এখানে আক্রান্ত প্রতি লাখে পাঁচ জন। আগ্রহের বিষয় হচ্ছে, একই বিভাগ হওয়া সত্ত্বেও পদ্মা নদীর পশ্চিম পাশে ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোর সঙ্গে এ বিভাগের পূর্ব পাশের জেলাগুলোর মধ্যে সংক্রমণের মাত্রায় ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। ![]() ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও পদ্মা দ্বারা পৃথক রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলা থেকে মোট আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন এক হাজার ৫১৩ জন। এসব জেলার সম্মিলিত জনসংখ্যা তিন কোটি ৪২ লাখ ৭২ হাজার জন। অর্থাৎ, প্রতি লাখে আক্রান্তের সংখ্যা চার জন। এই অঞ্চলটির সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকার সঙ্গে যমুনা সেতুর মাধ্যমে সংযুক্ত। সেতু সংযোগ থাকা সত্ত্বেও সরকারিভাবে যোগাযোগ নিয়ন্ত্রিত থাকায় ২৯ মে এই অঞ্চলে সংক্রমণ বাড়েনি, যা অত্যন্ত আশার কথা। তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এই ১৬টি জেলার মধ্যে ১৫টিতেই আক্রান্তের সংখ্যা এখনও ২০০ অতিক্রম না করলেও রংপুর জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ৪০০ অতিক্রম করেছে। বাড়তে থাকলে রংপুর এই অঞ্চলের জন্য হটস্পট হয়ে উঠতে পারে, যা পাশের জেলাগুলোতেও সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে বিগড়ে যেতে পারে পুরো অঞ্চলের সংক্রমণ পরিস্থিতি। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত দেখা গেছে ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে। পদ্মার পূর্ব পাশে অবস্থিত ঢাকা বিভাগের আটটি জেলাসহ ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের জেলাগুলো মিলিয়ে এই অঞ্চলে জেলার সংখ্যা মোট ১৬টি। এই জেলাগুলো থেকে মোট ২২ হাজার ৯২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এই জেলাগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা পাঁচ কোটি আট লাখ ৭৭ হাজার জন। হিসাব মোতাবেক, এই ১৬টি জেলায় প্রতি লাখে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৩ জন। সংক্রমণের কেন্দ্র ঢাকা জেলাকে বাদ দিলে বাকি ১৫ জেলার ক্ষেত্রে এই সংখ্যা প্রতি লাখে ১৫ জন। ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় প্রতি লাখে সংক্রমণ ৯ জন এবং সিলেট বিভাগের চার জেলায় প্রতি লাখে আক্রান্ত ৭ জন। সংক্রমণের কেন্দ্র থেকে মেঘনা নদী দ্বারা বিভাজিত চট্টগ্রাম বিভাগে মোট আক্রান্তের সংখ্যা চার হাজার ৭৩১ জন। এই অঞ্চলে দুই কোটি ৮৪ লাখ ২৩ হাজার মানুষের বাস। সেই হিসেবে প্রতি লাখে আক্রান্তের সংখ্যা ১৭ জন। তবে এই অঞ্চলে সংক্রমণ বাড়ছে দ্রুত। এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার সঙ্গে ঢাকার ও চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক যোগাযোগের যোগসূত্র থাকতে পারে। যেসব জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা চারশ’ পেরিয়েছে, সেগুলোর ম্যাপিং করলে এই যোগসূত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়। ![]() চিত্র ৩ থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে যে ১০টি জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা চারশ’ পেরিয়েছে তার মধ্যে নয়টিই পূর্ব পাশে অবস্থিত এবং একই অবিভক্ত রেখায় পড়ে। পূর্ব ভূখণ্ডের লাল চিহ্নিত অংশের দিকে তাকালে দেখা যায় উত্তর থেকে দক্ষিণে যথাক্রমে ময়মনসিংহ, গাজীপুর, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এই নয়টি জেলার সবক’টিতে আক্রান্তের সংখ্যা চারশ’ পেরিয়েছে এবং সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, চট্টগ্রাম বিভাগের চারটি জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী ও কুমিল্লায় সংক্রমণ ব্যাপক মাত্রায় গতি পেয়েছে। নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এই বিভাগটির অবস্থাও ঢাকার মতো হয়ে যেতে পারে। পশ্চিম ভূখণ্ডের মাত্র একটি জেলাতেই আক্রান্তের সংখ্যা ৪০০ পেরিয়েছে, সেটি হচ্ছে রংপুর। তবে রংপুর এই অঞ্চলের হটস্পট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, ইতোপূর্বে চট্টগ্রামের সংক্রমণের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, দীর্ঘদিন এই জেলাটিতে সংক্রমণ ধীরে ধীরে বাড়ছিল। ১৪ মে চট্টগ্রামে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৪৯৭ জন। ১৫ দিনের ব্যবধানে ২৯ মে চট্টগ্রামে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় দুই হাজার ২২৬ জনে। চট্টগ্রামকে এখন দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সংক্রমণের কেন্দ্র বললেও ভুল হবে না। চট্টগ্রামের উদাহরণ থেকে শিক্ষা নিয়ে রংপুরের সংক্রমণ এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে রংপুর ও রাজশাহী এই দুটি বিভাগে সংক্রমণ গতি পেতে পারে। সংক্রমণে তারতম্যের সম্ভাব্য কারণ ও কার্যকর পরিকল্পনায় নদীর ভূমিকা উপরোক্ত চিত্রগুলো এবং পর্যালোচনা থেকে সংক্রমণের কেন্দ্রের সঙ্গে একটি অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার বিষয়টির একটি সম্পর্ক পাওয়া যায়। ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশের অনেক অঞ্চল ছোট বড় অসংখ্য নদী দ্বারা বিভাজিত। এই নদীগুলো অঞ্চলভিত্তিক সংক্রমণের গতি কেমন হবে তা নির্ধারণ করছে বলে ধারণা করা যায়। তবে এই বিষয়টির আরও সুনির্দিষ্ট প্রমাণের জন্য বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন আছে। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে অসংখ্য নদী রয়েছে। বিস্তর গবেষণায় নদীবেষ্টিত এমন অঞ্চল খুঁজে পাওয়া যেতে পারে, যেগুলোতে সংক্রমণের গতি তুলনামূলক ধীর বা সংক্রমণ এখনও পৌঁছায়নি। নদীর বেষ্টনীতে যেহেতু আঞ্চলিক আইসোলেশনের প্রক্রিয়া সহজ, তাই অঞ্চলভিত্তিক সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এই বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। সম্পাদনায়ঃএম এইচ চুন্নু।আমাদের বরিশাল। কৃতজ্ঞতা প্রকাশঃ ১। করোনার জেলাভিত্তিক উপাত্ত আইইডিসিআরের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া হয়েছে ২। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০১১ সালের জরিপ থেকে নেওয়া হয়েছে। জেলাভিত্তিক বর্তমান জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক বিভাজন না জানা থাকায় আগের তথ্যই ব্যবহার করা হয়েছে। সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। |
||




