" />
AmaderBarisal.com Logo

মোশতাকের কবরে নামফলকও নেই , ছেলেমেয়েরা আসেনা ভয়ে


আমাদেরবরিশাল.কম

২৩ August ২০২০ Sunday ৯:১৫:৫৪ PM

সূর্যের ধরণীতলে বঙ্গবন্ধু হত্যার অবিশ্বাস্য খবরে বিশ্বাসঘাতকদের প্রথম যে ব্যক্তিটি মুখোশের অন্তরাল থেকে জনসম্মুখে হাজির হন, তিনি খন্দকার মোশতাক আহমেদ। হিমালয়সম মহীরূহকে হত্যার পর রাষ্ট্রপতির পদে সমাসীন হন খন্দকার মোশতাক। তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু এবং শেষ দুটোই ঘটনাবহুল। মোশতাক কতটা চাটুকারিতার আশ্রয় নিয়েছিলেন তা তার কয়েকটি ঘটনার দিকে চোখ রাখলে বোঝা যাবে।

বঙ্গবন্ধু তাঁর শাসনামলেই নিজের বাবা-মা’কে হারান। মোশতাক তখন মন্ত্রী।গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় কবর দেয়া হয় বঙ্গবন্ধুর মা-বাবাকে। বঙ্গবন্ধুর বাবা মৌলভী লুৎফর রহমানের মৃত্যুতে গভীর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন মোশতাক। মোশতাক নিজে কবরে নেমে পড়েছিলেন লাশ শায়িত করতে। বঙ্গবন্ধুর মা সায়রা খাতুনের মৃত্যুতে মাটিতে গড়াগড়ি করে কান্নায় চোখমুখ ভাসিয়ে দিয়েছিলেন মোশতাক। সংবাদপত্রে যা খবর হয়ে উঠেছিল।

১৯৭৫ সালের ১৫ জুলাই শেখ কামালের বিয়েতেও বিশিষ্ট ভুমিকায় অবতীর্ণ ছিলেন বানিজ্যমন্ত্রী মোশতাক। তিনি শেখ কামালের উকিল বাপের আসন অলংকৃত করেন।  একবার খন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধুকে একটা সোনার বটগাছ উপহার দিয়ে বলেন, “মুজিব তুমি সত্যিকার অর্থেই বাংলার বটবৃক্ষ’, আমরা হলাম ডালপালা মাত্র।”১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট বাসায় রান্না করা হাঁসের মাংশ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যান মোশতাক। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথপোকথনকালে শেখ রাসেলের আগমন ঘটে। মোশতাক শিশু রাসেলকে আদর করে  মাথায় চুমো খেলেন। এরপর নিজের টুপিটা খুলে রাসেলের মাথায় পরিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মোশতাক বললেন, ‘দ্যাখো ওকে কেমন মানিয়েছে।’ 

সন্ধ্যার পর পরই মোশতাক তার আগামসীহ লেনের বাড়িতে চলে যান। সেই মোশতাক রাতটা দিনে গড়াতেই কী কান্ডটা না ঘটালেন! শুধু কী কান্ড? না, সে-তো  বিশ্বাসঘাতকতামূলক এক মহাকান্ড- মহা হত্যাযজ্ঞ। পূর্বপরিকল্পনা মতো  রাষ্ট্রপতি হলেন মোশতাক। নিহত বঙ্গবন্ধুর লাশটা সিঁড়ির কোন পড়ে আছে তখনো। বাড়িসুদ্ধ লাশ আর লাশ। সেই শুক্রবারই খুনীবেষ্টিত হয়ে বায়তুল মোকাররম মসজিদে জুম্মার নামায আদায় করলেন – তারপর খুনীদের হাতে মিষ্টিমুখ করলেন, করালেন সমবেত মুসুল্লিদের। মুসল্লিরা বিস্মিত ভীতসন্ত্রস্ত মনে দেখলো বঙ্গবন্ধুরই বানিজ্যমন্ত্রী মোশতাক রাষ্ট্রপতি। খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর রাসেলের মাথার ওপর চাপানো তার গাঢ় ছাঁই রঙের কিস্তি টুপিটাকে জাতীয় টুপি হিসাবে ঘোষণা করে দিলেন। বললেন, সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের এ টুপি পরিধান করতে হবে।সব মন্ত্রিরা সম্মতি দিলেন। যারা বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভারই সদস্য ছিলেন। সেই প্রস্তাব পাস করা হলো এই বলে যে জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় ফুল, জাতীয় ফল, জাতীয় পাখির মতো একটা জাতীয় টুপিও থাকা দরকার। মোশতাক অতিশয় ভাগ্যবান ছিলেন। জীবনে বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করেও পার পেয়ে যান বঙ্গবন্ধুর মহানুভবতায়।

বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতেও মোশতাকের প্রতি পরম ভালবাসা প্রকাশ পেয়েছে। বঙ্গবন্ধু রাজনীতির প্রথমদিকের ভুমিকা ভুলে গিয়ে মোশতাককে বন্ধু ভেবে বুকে স্থান দিয়েছিলেন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে কারারুদ্ধ শেখ মুজিবুর রহমানের পাশাপাশি খন্দকার মোশতাক আহমেদও যুগ্ম সম্পাদক হয়েছিলেন। কিন্তু ওই বছরের ১১ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খানের আগমন উপলক্ষে ‘গভর্নর হাউজ’ ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করে আওয়ামী মুসলিম লীগ। কর্মসূচি চলাকালীন গ্রেফতার হন দলের সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক এবং পরে শেখ মুজিব।   ভয়ে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে দল ত্যাগ করেন অন্যতম সহ সভাপতি ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন, আলী আমজাদ খান ও সহ যুগ্ম সম্পাদক এ কে রফিকুল হোসেন। যুগ্ম সম্পাদক মোশতাক রাজনীতির পাট চুকিয়ে আইন ব্যবসায় শামিল হন সিনিয়র সহসভাপতি আতাউর রহমান খানের সঙ্গে। ‘৫০ সালে কারামুক্ত শেখ মুজিব আওয়ামী মুসলিম  লীগের অফিস খুলে বসেন নবাবপুরে। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসাবে শেখ মুজিব দলীয় কার্যক্রম শুরু করলেও মোশতাকের হদিস ছিলনা। ফলে ‘৫৩ সালের প্রথম কাউন্সিলে নির্বাচিত কমিটিতে তার ঠাঁই হয়নি। ‘৫৪ সালের মার্চের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের মনোনয়নলাভে ব্যর্থ হন মোশতাক। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিশেষ অনুকম্পায় তাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে বিজয়ী করে আনা হয়। আওয়ামী লীগও তাকে ফিরিয়ে নেয়।

আওয়ামী মুসলিম লীগ যুক্তফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে এলেও গভর্নর শেরেবাংলার দলে গা ভাসান এবং চীফ হুইপ হন। ‘৫৫ সালে দল অসাম্প্রদায়িক নীতিগ্রহণ করে নাম থেকে “মুসলিম” শব্দ কর্তন করলে মোশতাক   আব্দুস সালাম খানের সঙ্গে হাত মেলান এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে দল টিকিয়ে রাখেন। তারা বহিষ্কারও হন। পরে মোশতাক আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন। ১৯৭১ সালে মুজিব নগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোশতাক পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন গঠনের চক্রান্তের দায়ে অভিযুক্ত হন। হারান মন্ত্রীত্ব। আর সেই মধুর প্রতিশোধ গ্রহণ করেন  “৭৫ সালের ৩ নভেম্বর  জাতীয় চারনেতাকে হত্যা করে। রাষ্ট্রপতির ভাষণে মোশতাক বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ‘দেশের সূর্য সৈনিক’ হিসাবে অভিহিত করেন। 

আওয়ামী লীগ একুশ বছর পর ‘৯৬ সালে ক্ষমতায় ফিরে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার কার্য শুরু করে। কিন্তু মাত্র কদিন আগে ‘৯৬ সালের ৫ মার্চ মোশতাক মারা যান। মৃত্যুর পর পুলিশ পাহারায় বায়তুল মোকাররম মসজিদ প্রাঙ্গণে মোশতাকের নামাজে জানাজা কিন্তু বিক্ষোভের মুখে তা সম্ভব হয়নি। কুমিল্লায় দাউদকান্দির দশপাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে মোশতাককে দাফন করা হয়।

সব কবরে রয়েছে  নামফলক। কিন্তু নেই কেবল মোশতাকের কবরে। ইতিহাসের জঘন্য বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাকের একমাত্র ছেলে ইশতিয়াক আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। দুই  মেয়ে শিরিন সুলতানা ও ডাঃ নাজনীন সুলতানা থাকেন যুক্তরাজ্যে। তারা গত ৯/১০ বছর ধরে  জনরোষের আতঙ্কে  বাড়িতে আসছেন না। পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা বাবার দোতলা বাড়িটি।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।





প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার    সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০। ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।