শীত ও করোনায় চাহিদা না থাকায় দিন কাটছে অর্ধাহারে অনাহারে
আমাদেরবরিশাল.কম
৩০ December ২০২০ Wednesday ৬:১২:২৫ PM
রাজাপুরের শীতলপাটি গ্রামের পাটিকরদের করোনায় ২ কোটি টাকার ক্ষতি, ঋণের বোঝায় দেউলিয়া
রহিম রেজা, ঝালকাঠি থেকেঃ
ঝালকাঠির রাজাপুরের মঠবাড়ি ইউনিয়নের হাইলাকাঠি গ্রামের কয়েক শ’ বছরের পুরনো পাইত্তা বাগান (পাটি গাছের বাগান) এবং ওখানের শীতল পাটি বুননের শিল্পকে ঘিরে ওই গ্রামটি দেশজুড়ে পাটি গ্রাম হিসেবেই পরিচিত। জেলা ব্রান্ডিং পন্যে হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে শীতলপাটি। প্রায় ১শ’ পরিবার রয়েছে যারা পাটি তৈরি এবং বিক্রি করেই জীবীকা নির্বাহ করেন।সারা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নির্বস্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় শীতল পাটিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে জাতিসংঘের শিক্ষা,বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো।কিন্তু আজও অবহেলিত পাটি শিল্পের সাথে জড়িত পাটিকর পরিবারগুলো।
দীর্ঘদিন ধরেই পুঁজি সংকট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বেহাল দশাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে রয়েছেন। তার মধ্যে শীত ও কয়েক মাসের করোনায় শীতলপাটির চাহিদা না থাকায় বেচাবিক্রি নেই বললেই চলে। ফলে প্রতিটি পরিবার দেড় থেকে ২ লাখ টাকা করে ক্ষতির মুখে পড়েছে।ফলে সবমিলিয়ে এ পাটি গ্রামের পাটিকররা প্রায় ২ কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়েছেন দাবি শীতলপাটি তৈরীর কারিগর পাটিকর ও সমিতির নেতৃবৃন্দদের।
এমন পরিস্থিতিতে তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে দিন কাটছে অর্ধাহারে অনাহারে। অপরদিকে প্লাস্টিকের তৈরী পাটিতে সয়লাব সর্বত্র। তাই এখন অনেকেই বৃত্তি পরিবর্তন করে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে বলে জানান পাটিকররা। এছাড়াও জেলায় মোট ১১ টি গ্রামের ২শ পরিবার লোক এ বৃত্তিতে জড়িত হয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন। প্রতিবছর পাটি তৈরীর কাচামাল প্রস্তুত ও বুননের মৌরুমে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কাচামাল সংগ্রহ ও পরে তা বিক্রি করে জীবীকা নির্বাহ করেন পাটিকররা। চৈত্র-বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ (মার্চ-এপ্রিল ও মে) মাসে পাটি বিক্রির মূল মৌসুম। ওই সময়েই তৈরী করা কয়েক হাজার পাটি করোনা মহামারির কারণে অবিক্রিত অবস্থায় রয়েছে। এখন সেই ১ হাজার টাকা দামের শীতল পাটি বিক্রি করতে ৪শ থেকে ৫শ টাকায়।এনজিও থেকে নেয়া ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় ঋণ উত্তোলন কারীদের বিভিন্ন ধরনের অশালীন কথাও শুনতে হচ্ছে তাদের।
সরেজমিনে পাটি শিল্পীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এ অঞ্চলে অতিথিদের সামনে একটি ভালমানের শীতলপাটি বিছিয়ে নিজেদের আভিজাত্যকে ফুটিয়ে তোলা হয়। পাটি শিল্প তাই বাংলাদেশের লোকাচারে জীবনঘনিষ্ঠ ও ঐতিহ্যবাহী লৌকিক উপাদান। গরমের মৌসুমে এসব পাটি তাপে খুব বেশি গরম হয় না বলেই এটিকে শীতলপাটি বলা হয়। পাইত্রা বা মোর্তা নামে এক ধরণের বর্ষজীবী উদ্ভিদের কান্ড থেকে বেতি তৈরি করা হয়। পরিপক্ক পাটি গাছ কেটে পানিতে ভিজিয়ে তার পর পাটির বেতি তোলা হয়। এর পর ভাতের মাড় ও পানি মিশিয়ে বেতি জ্বাল দেয়া হয়। এর ফলে বেতি হয়ে ওঠে মসৃণ ও সাদাটে। বেতির উপরের খোলস থেকে শীতলপাটি পরের অংশ তুলে বুকার পাটি এবং অবশিষ্ট অংশ ছোটার (চিকন দড়ি) কাজে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার হাইলাকাঠি ও ডহরশংকর গ্রামে রয়েছে দুইশতাধিক পরিবার। এরা সবাই পাটি বুনে জীবীকা নির্বাহ করেন। পুরাতন ঐতিহ্যের কারু হাতে গড়া শীতল পাটির জন্য এ গ্রামদুটিকে ‘শীতল পাটির’ গ্রামও বলা হয়। এ গ্রামের শত শত হেক্টর জমি জুড়ে রয়েছে বিশাল নজরকাড়া পাটিগাছের বাগান।
এখানে শীতলপাটি, নামাযের পাটি ও আসন পাটি নামে তিন ধরনের পাটি তৈরি করা হয়। পাটির বুনন পদ্ধতি প্রধানত দুই ধরণের। প্রথমত, পাটির জমিনে ‘জো’ তুলে তাতে রঙিন বেতি দিয়ে নকশা তুলে। দ্বিতীয়ত, পাটির জমিন তৈরি হলে তার চর্তুদিকে অন্য রঙের বেতি দিয়ে মুড়ে দিয়ে। পারিবারিক ও উত্তারাধিকার সূত্রে পাটিকরদের পেশা এগিয়ে চলছে। শৈল্পিক উপস্থাপনায় এবং নির্মাণ কুশলতার কারণে দক্ষ ও সুনিপুন একজন পাটিয়াল নারীর কদরও রয়েছে সর্বত্র। একটি পাটি বুনতে ৩/৪ জনের দুই তিনদিন সময় লাগে। যা বিক্রি করে পাঁচশ থেকে দেড় হাজার টাকা আসে। মহাজনরা প্রতি পাটিতে একশ থেকে পাঁচশ টাকা লাভ করেন। পাইত্রা চাষ ও কেনার জন্য প্রচুর মূলধন প্রয়োজন হয়। এ জন্য শিল্পীরা মহাজন ও এনজিওদের কাছে হাত পাততে বাধ্য হয়। এ শিল্পের সাথে জড়িতদের জীবন যাত্রার মানের উন্নতি হচ্ছে না। শীতলপাটি শিল্পীর জন্য ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা না থাকায় পূঁজির জন্য শিল্পীরা দাদন ব্যবসায়ী, সুদখোর মহাজনদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকেন। তা ছাড়া বিদেশে ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্তে¡ও এখন পর্যন্ত শীতলপাটি রপ্তানিযোগ্য পণ্যের স্বীকৃতি পায়নি। যদিও পাটি জেলা ব্রান্ডিং পন্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। মঞ্জুরানী পাটিকর বলেন, আমাদের অন্যকোন উপার্জন নেই। শুধু মাত্র শীতলপাটি বিক্রি করেই সংসারের খরচ এবং ছেলে-মেয়ের লেখা পড়া চালাই। তবে শীত মৌসুমে এবং বর্ষার সময় আর্থিক সংকটে ভুগতে হয়। তখন এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়। সরকার যদি বিনা সুদে ঋণ প্রদান করতো, তা হলে বেশি পরিমানে পাইত্রা ক্রয় করে শীতলপাটি তৈরি করা সম্ভব হতো। ৪র্থ শ্রেণির ছাত্রী অন্তরা ও ৩য় শ্রেণির ছাত্রী শর্মিলা (পাটিকর) জানায়, আমাদের পরিবারের সকলেই পাটি বুনতে পারে। বাবা-মাকে সহযোগিতা করার জন্য পড়া-লেখার পাশাপাশি পাটি তৈরি করি। এতে বাবা মাও আমার প্রতি খুশি। হাইলাকাঠি গ্রামের বাবুল পাটিকর জানান, শীত মৌসূমে বাগান থেকে পাটি গাছ কেটে শীতল পাটি বুননের জন্য বেতি তৈরী (কাঁচামাল প্রস্তুত) করা হয়। এসময়ে আমরা বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নেই। তা দিয়ে সংসার পরিচালনা করি। গতবছর ঋণ নিয়ে ১২০পিস শীতল পাটি বুনেছিলাম। কিন্তু করোনা মহামারির কারনে কোথাও কোন মেলা, মাহফিল বা অনুষ্ঠান না থাকায় বুনানো পাটি ঘরেই রয়েছে। প্রত্যেকটি পাটি কম হলেও ১হাজারের বেশি টাকা দামে বিক্রি হতো। ১২০ পিস পাটি বিক্রি করতে পারলে কমপক্ষে ১লাখ ২০ হাজার টাকা উপার্জন করা যেতো। সেই পাটি এখন আদামে (অনেক কম দামে) বিক্রি করতে হচ্ছে। ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় ঋণ উত্তোলনকারীদের অনেক গালমন্দ শুনতে হচ্ছে।
একই গ্রামের নির্মল পাটিকর জানান, প্রতিবছর যে পাটি ১২শ টাকায় বিক্রি করি, গত মৌসুমে বুনানো সেই পাটি এখন ৪শ থেকে ৫শ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। উপায় না পেয়ে নদীতে মাছ ধরে সেই মাছ বিক্রি করে এখন কোনমতে সংসার চালাচ্ছি। পাটিকর সমিতির সাবেক সভাপতি বলাই পাটিকর জানান, চট্টগ্রামে জব্বারের বলিখেলা অনুষ্ঠানের মেলায়, চরমোনাই-ছারছিনা মাহফিলে এবং বিভিন্ন মেলা-অনুষ্ঠানে আমাদের এলাকার ৪টি গ্রামসহ জেলার ১১টি গ্রাম থেকে ১৫হাজারেরও বেশি পাটি বিক্রি হতো। করোনার কারণে আমাদের বুনানো পাটি ঘরেই আছে, কোথাও বিক্রি করতে পারি নাই। ২শতাধিক পরিবারের প্রত্যেকটি পরিবারে লক্ষাধিক টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেসরকারী সংস্থা (এনজিও) থেকে ঋণ নিয়ে এখন আছি মহাবিপাকে। একদিকে বিক্রি করতে না পারায় লোকসান, অপরদিকে ঋণ পরিশোধের চাপ এবং অন্যদিকে সংসার পরিচালনা করে স্বাভাবিক জীবনযাপনে অনেক কষ্ট হচ্ছে। তিনি আরো জানান, প্লাস্টিকের তৈরী পাটি স্বল্পদামে গ্রামাঞ্চলে বিক্রির ফলে আমাদের পাটি গাছের বেতির তৈরী শীতলপাটি বিক্রি লাভ জনক না হওয়ায় অনেক পাটিকর তৈরীর কাজ থেকে সরে গেছেন। কেউ এখন অটো চালাচ্ছেন, আবার কেউ রিক্সায়, কেউ ফেরিওয়ালা, দোকানী, কেউ মৎস্যজীবীর কাজ করে জীবন জীবীকা চালাচ্ছেন। আমাদেরও এক সময় এ পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্যপেশায় যেতে হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। পাটিকর সমিতির সভাপতি তাপস পাটিকর জানান, ঝালকাঠির শীতলপাটি দেশে-বিদেশে সমাদৃত হওয়ায় ঝালকাঠিতে উর্ধ্বতন কোন অতিথি এলে তাকে শীতলপাটি উপহার দেয়। প্রতিবছর শীত মৌসূমে কাচামাল প্রস্তুত করে শীতল পাটি বুনিয়ে চৈত্র-বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে বিভিন্ন মেলা, মাহফিল ও অনুষ্ঠানে বিক্রি করে লক্ষাধিক টাকা উপার্জন করে প্রতিটি পরিবার। বুননের সময়ে বেসরকারী সংস্থা (এনজিও) থেকে ঋণ নিয়ে সংসার পরিচালনা করে পাটিকররা। যথাসময়ে বিক্রি করে এনজিওর ঋণ পরিশোধ শেষে সংসারের খরচাদি বাদে কিছু টাকা জমাও থাকে। কিন্তু গতবছর শীত মৌসূমে বুনানো শীতল পাটি কোথাও বিক্রি করতে না পারায় এখনও ঘরে রয়েছে। প্রতিটি পরিবার লক্ষাধিক টাকা লোকসানে পড়ে এনজিও ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে কিস্তি দিতে না পারায় গালমন্দ শুনতে হচ্ছে বলেও অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন তিনি।জেলা প্রশাসক জোহর আলী যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যার কথা স্বীকার করে সাংবাদিকদের জানান,সহজ শর্তে ঋণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ তাদের জীবন যাত্রার মানের উন্নয়নে প্রশিক্ষনসহ সার্বিক সহযোগীতার আশ^াস দেন।
সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক
প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।