![]() ইয়াহিয়া-নিয়াজীর চোখে স্বাধীনতার ঘোষক ও শেখ মুজিবের বিচার
১৬ March ২০২১ Tuesday ৯:২৮:৪১ PM
সোহেল সানি: একাত্তরের যুদ্ধকালীন শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার অভিযোগপত্র ও পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ভাষণগুলোই বলে দেয়, যুদ্ধের প্রতিপক্ষ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক কে? প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার রেডিও-টেলিভিশনে দেয়া ভাষণসমূহ এবং বিদেশী গণমাধ্যমের খবরাখবরই ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ বিতর্কের অবসান ঘটায়। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক জুরি কমিশন, পাকিস্তানের মিত্রশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বক্তব্যেও শেখ মুজিব যুদ্ধের প্রতিপক্ষরূপে চিহ্নিত হয়েছেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অপরাধেই শেখ মুজিব অভিযুক্ত হন এবং সামরিক আদালতে বিচারকার্য পরিচালিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিন্ডিত করা হয়।শেখ মুজিবের সেই বিচার সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব সাধারণতন্ত্র এবং বাংলাদেশের মিত্রশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারতসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের বার্তা-বিবৃতিগুলোই প্রকৃত তথ্য-উপাত্ত। এছাড়াও বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধুই যে স্বাধীনতার ঘোষক, তা বাংলাদেশ-ভারত মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার জেনারেল নিয়াজী তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। ইতিহাস বিকৃতি রোধে এসব তথ্য-উপাত্তই যথেষ্ট। “পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য শেখ মুজিবের বিচার হবে” শেখ মুজিবকে দেশদ্রোহিতার অপরাধে শাস্তি পেতে হবে “শেখ মুজিবের বিচারে জাতিসংঘের মহাসচিব উথান্টের মন্তব্যে পাকিস্তানের প্রতিবাদ” The Pakistan delegation regrets that in the statement made on August 10 by a U.N. spokesman on his behalf, the Secretary General should have chosen to make a comment on the impending trial of Sheikh Mujibur Rahman which exceeds both the bounds of humanitarian concern and the competence of the U.N. as defined in the U.N. Charter. জাতিসংঘে পাক-রাষ্ট্রদূত আগা শাহীর বিবৃতি – “শেখ মুজিবের বিচারের প্রতিবাদে জেনেভা থেকে আন্তর্জাতিক জ্যুরিস্ট কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের প্রতিবাদ জানিয়ে জরুরি বার্তা পাঠায় ১০ আগস্ট, ১৯৭১।কমিশনের সেক্রেটারি জেনারেল নিয়াল ম্যাকডেরমট স্বাক্ষরিত বার্তায় বলা হয়েছে যে বিচারের ক্ষেত্রে গোপন করার তো কিছু নেই’ই, আন্তর্জাতিক জ্যুরিস্ট কমিশন সামরিক আদালতে গোপনে শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের প্রতিবাদ করছে। “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ” “আরব সাধারণতন্ত্রের তীব্র প্রতিবাদ” “ভারতের হুশিয়ারি” ভারত সরকার গত ৯ আগস্ট সোমবার নয়াদিল্লীতে এই বলে পাকিস্তানকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোর্টমার্শাল হলে পাকিস্তানকে তার সমুচিত ফল ভোগ করতে হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং লোকসভায় এ কথা ঘোষণা করেন এবং তার সঙ্গে সঙ্গে পাক – জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের সময় শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত নাও থাকতে পারেন বলে ইয়াহিয়া খান যে বিবৃতি দিয়েছেন তার বিরুদ্ধেও ভারতের তীব্র ক্ষোভের কথা ব্যক্ত করেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেন, ইসলামাবাদের জঙ্গীচক্র কর্তৃক বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের বিচারের নামে যে বিচারের প্রহসন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সভ্যতার ইতিহাসে তা বৃহত্তম ট্রাজেডি ছাড়া আর কিছু নয়।প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বিবৃতিতে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল উথান্টের কাছে শেখ মুজিবুর রহমানের বিনাশর্তে মুক্তির জন্য হস্তক্ষেপ করার দাবি জানান। “জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্বেগ” “নিয়াজীর গ্রন্থেও স্বাধীনতার ঘোষক” স্বাধীনতার ঘোষণাদানকারীও বলা হয়েছে শেখ মুজিবকে। গ্রন্থটিতে মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বদাতা হিসাবে এসেছে জেনারেল ওসমানীর নাম। গ্রন্থটিতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ২৭ মার্চে মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণার কোন অস্তিত্ব নেই। ‘৭১ এর যুদ্ধের প্রকৃতি, পাকিস্তানের ভাঙ্গন, যুদ্ধ পরিকল্পনা, আক্রমণ, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী, আলবদর, আলসামস্ সহ রাজাকার বাহিনী, যুদ্ধ শিবির, গোপনীয় রিপোর্ট, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, পাকিস্তান সেনাপ্রধান জেনারেল আবদুল হামিদ খানের ভুমিকা এবং বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথকমান্ড, তথা মিত্রবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণের প্রেক্ষিত ও বাধ্যবাধকতার নিখুঁত বর্ননা করা হয়েছে গ্রন্থটিতে। পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য লে. জেনারেল নিয়াজি শুধু জেনারেল ইয়াহিয়া, জেনারেল টিক্কা খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোকে দায়ীই করেননি, তাদের তিনজনকে পাকিস্তানের বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিহিত করেছেন। নিয়াজি বিশ্বাস করতেন, পূর্ব পাকিস্তান সংকট একটি রাজনৈতিক সংকট। যার সমাধান কোনো সামরিক যুদ্ধের মাধ্যমে হতে পারে না। তিনি দাবি করেছেন, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে জরুরি বার্তায় বলেছিলেন সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবকে মুক্তি দিয়ে তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক। কিন্তু ইয়াহিয়া তার আবেদনে সাড়া দেননি। বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ নিপীড়নের কথাও স্বীকার করেছেন। যদিও নিয়াজি সেই শাসকগোষ্ঠীর নিদের্শেই দায়িত্বপালন করেছেন কেন সেবিষয়ে নিজস্ব মত তুলে ধরেছেন। নিয়াজি লিখেছেন উপরের নির্দেশেই তাকে যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে। যা চরম অপমানের, তার চেয়ে মৃত্যুবরণ করা ভালো হতো। মজার ব্যাপার হচ্ছে নিয়াজি কিন্তু আত্মমর্যাদার জন্য মৃত্যুবরণ করেননি, আত্মসমর্পণ দলিলে সাক্ষর করে মিত্রবাহিনীর হাতে বন্দীত্ববরণ করেন। গ্রন্থটিতে নিয়াজি বলেছেন, জুলফিকার আলী ভুট্টো সিজারের চেয়ে পরাক্রমশালী ছিলেন। ক্ষমতাবলে হয়েছিলেন চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, এ পদবী তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায়ও ব্যবহার করেন। যে কারণে আমার গ্রন্থটির প্রকাশ বিলম্বে হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে ভারতীয় হামলা সম্পর্কে অবগত করলে, তিনি বলেন ‘পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আমি কি করতে পারি? আমি পারি কেবল প্রার্থনা করতে। ‘ এই বাক্যটি দ্বারা ইয়াহিয়া রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে তার সকল দায়িত্ব ও কর্তব্য শেষ করেন। পশ্চিম পাকিস্তান রক্ষা করতেই আমাকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়া হয়। গ্রন্থে নিয়াজি লিখেন, ‘৭১ সালের ১৪ মার্চ ভুট্টো দুজন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের প্রস্তাব করে বলেছিলেন, তিনি নিজে হবেন পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আর মুজিব হবেন পূর্বপাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি (ভুট্টো) ‘ওধার তুম ইধার হাম’ বলতে দুটি পাকিস্তানকে বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছিল না। কারণ আওয়ামী লীগ এমন এক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল যেখান থেকে তার ফেরার পথ ছিল না। ২৩ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে পালন করা হয় প্রতিরোধ দিবস। মুজিবের বাসভবনে বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো হয়। মুজিব কর্নেল ওসমানীকে সার্বিক অপারেশনের কমান্ডার নিযুক্ত করেন। মেজর জেনারেল (অবঃ) মাজেদের তত্ত্বাবধানে সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের তালিকাভুক্ত করা হয়। ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র ও গোলাবারুদ আসতে থাকে। ভারতের সক্রিয় সহযোগিতায় সশস্ত্র সংগ্রামের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। নিয়াজি লিখেছেন, মনে রাখা প্রয়োজন যে, তখনো বাঙালি সেনারা বিদ্রোহ করেনি। ২৫ ও ২৬ মার্চ মধ্যরাতে জেনারেল টিক্কা আঘাত হানেন। একটি শান্তিপূর্ণ রাত পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে, চারদিকে আর্তনাদ, অগ্নিসংযোগ। জেনারেল টিক্কা তার সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন যেন তিনি তার নিজের বিপথগামী লোকের সঙ্গে নয় শত্রুর সঙ্গে লড়াই করছেন। ২৫ মার্চের সেই সামরিক অভিযানের হিংস্রতা ও নৃশংসতা বুখারায় চেঙ্গিস খান, বাগদাদে হালাকু খান এবং জালিয়ানওয়ালাবাগে বিট্রিশ জেনারেল ডায়ারের নিষ্ঠুরতাকেও ছাড়িয়ে যায়। সশস্ত্র বাঙালি ইউনিট ও ব্যক্তিবর্গকে নিরস্ত্র এবং বাঙালি নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করার জন্য টিক্কা খানকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি এ দায়িত্ব পালন করার পরিবর্তে বেসামরিক লোকজনকে হত্যা এবং পোড়া মাটি নীতি গ্রহণ করেন। তিনি তার সেনাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘আমি মাটি চাই মানুষ নয়। ‘ মেজর জেনারেল ফরমান ও বিগ্রেডিয়ার জাহানজেব আরবাব ঢাকায় তার এ নির্দেশ পালন করেন। জেনারেল রাও ফরমান তার টেবিল ডায়েরিতে লিখেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের শ্যামল মাটি লাল করে দেয়া হবে। ‘বাঙালির রক্ত দিয়ে মাটি লাল করে দেয়া হয়েছিল। ‘৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাঙালিরা গভর্নর হাউজ (বঙ্গভবন) অবরোধ করার পর তারা ফরমানের ডায়েরি খুঁজে পায়। বাংলাদেশ সফরকালে মুজিব ভুট্টোকে এ ডায়েরি দেখিয়েছিলেন। নিয়াজি লিখেন, আমার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ভুট্টো এ ডায়েরি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তাকে আমি আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানতাম না। জেনারেল টিক্কা তার ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালন থেকে সরে যাওয়ায় সকল বাঙালি সশস্ত্র ব্যক্তি ও ইউনিট তাদের অস্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, সাজসরঞ্জাম ও পরিবহন নিয়ে পালিয়ে যায়। এবং মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করে। ..মুজিব ছাড়া সকল নেতৃবৃন্দ পালিয়ে যায় এবং কলকাতায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠন করে। ২৫ ও ২৬ মার্চ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার আগে ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করেন। ঢাকা ত্যাগের আগে তিনি টিক্কাকে বলেছিলেন, ‘তাদেরকে খুঁজে বের করো। ‘ টিক্কার নিষ্ঠুরতা দেখার জন্য ভুট্টো ঢাকায় থেকে গেলেন। ভুট্টো দেখতে পেলেন ঢাকা জ্বলছে। লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট। প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। |
||

