|

বরিশালের গৈলার মনসা দেবীমূর্তি ও মন্দির নির্মাণের কথা
আমাদেরবরিশাল.কম
১১ October ২০১২ Thursday ১০:০৬:৫৫ PM
অজয় দাশগুপ্ত :: বাংলাদেশের বরিশাল জেলার একটি গ্রাম, নাম তার গৈলা। এক সময়ে তা গৌরনদী থানার অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমানে অন্তর্ভুক্ত আগৈলঝাড়া উপজেলায়। মনসামঙ্গল রচয়িতা বিজয়গুপ্ত এ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তবে এ ঐতিহাসিক গ্রন্থ রচনার সময় মন্দিরের স্থানটি ছিল ফুল্ক্নশ্রী গ্রামে, যা কবির ভাষায় ‘পশ্চিমে ঘাঘর নদী, পূবে গ-শ্েবর। মধ্যে ফুল্ক্নশ্রী গ্রাম প-িত নগর’।
ফুল্ক্নশ্রী-গৈলা কেন প-িত নগর, সে সমঙর্কে নিশ্চিত হতে অতীতের লিখিত নজির খুব একটা মিলবে না। তবে গৈলার কথা নামে প্রকাশিত একটি বইয়ের তথ্য এখানে উল্ক্নেখ করা চলে। এতে গৈলার শিক্ষার বিবরণ অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে বিত্রক্রমপুর থেকে ত্রিলোচন দাশ নামে এক ব্যক্তি গৈলার টোলে সংস্ট্কৃত পড়তে আসেন। কতটা প্রসিদব্দ হলে এত দহৃর থেকে ( ঢাকার কাছে বিত্রক্রমপুর, পদ্মা-মেঘনা-আড়িয়াল খাঁর রূপ সে যুগের কত ভয়গ্ধকর ছিল কে জানে! নৌকা ছাড়া অন্য বাহন থাকার কথা নয়) কেউ পড়তে আসেন, সেটা নিয়ে গবেষণা চলতে পারে। এই ত্রিলোচন দাশের বোন রুক্সিণি দেবীর পুত্র বিজয় গুপ্টৱ।
এই গৈলা গ্রামে ‘আধুনিক যুগে’ শিক্ষার প্রসার সমঙর্কে একটি ধারণা দেওয়ার জন্য গৈলার কথা বই থেকে আরও উদব্দৃতি দিচ্ছি :ক. ১৮৮৫ থেকে ১৮৯২ পর্যনৱ এ গ্রামে গ্রাজুয়েট ছিলেন ১৪ জন। খ. ১৯৪৭ সালের পহৃর্ব পর্যনৱ ডক্টরেট-ডি ফিল ডিগ্রিধারী ছিলেন ৪০ জন (মহিলা ৭ জন, এদের একজন কৃতী লেখক মৈত্রেয়ী দেবীর মা সুরমা দাশগুপ্টৱ)। গ. চিকিৎসা শাস্ট্পে স্ট্বাতক ও স্ট্বাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ৪৪ জন। ঘ. গ্রাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ার ৪৩ জন। ঙ. এম এ ডিগ্রিধারী নারী ৪৭ জন (ডক্টরেট ডিগ্রিধারীদের এ তালিকায় রাখা হয়নি)। চ. গৈলা এখনো শিক্ষার জন্য প্রসিদব্দ। বর্তমানে গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা প্রায় ১৪০। প্রতি বছর প্রায় দেড়শ’ ছাত্রছাত্রী মাধ্যমিক পাশ করে।
বিজয় গুপ্টৱ মনসা মঙ্গল রচনা করেছিলেন প্রায় পাঁচ শ’ বছর আগে। দেশ-বিদেশে বিপুলভাবে সমাদৃত এ কাব্য রচিত হয়েছিল যে অঙ্গনে সেখানে তিনি গড়েছিলেন মনসাদেবীর মন্দির। কালের গর্ভে তা হারিয়ে যায়নি। বরং হয়ে রয়েছে ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র। ২০০৪ সালের ২৫ ডিসেল্ফ্বর এ মন্দিরেই মনসা মঙ্গলের বিবরণ অনুযায়ী নির্মাণ করা প্রায় এক টন ওজনের পিতলের মনসা দেবীমহৃর্তি স্ট’াপন করা হয়। ঢাকার শাঁখারি বাজারে এ মহৃর্তি নির্মাণ করা হয় রামগোপাল কংস বণিকের তত্ত্বাবধানে। দেবীমহৃর্তি স্ট’াপনের পর থেকেই স্ট’ানীয় জনগণ মনসা মন্দিরটি আরো সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে নির্মাণ করায় উদ্যোগী হন। এ উদ্যোগে সাড়া দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। তারা দুই দফায় প্রায় ১৫ লাখ টাকা দিয়েছে বরিশাল জেলা পরিষদের মাধ্যমে। সমাজের বিভিল্প্ব স্টৱরের নারী-পুরুষও উদারভাবে আর্থিক সহায়তা দিয়ে চলেছেন। অন্য যাদের সহযোগিতা পেয়েছি তাদের মধ্যে বিজয়কৃষষ্ণ দে’র কথাও উল্ক্নেখ করতে হয়। অমৃৎ লাল শিল্কপ্প গোষ্ঠীর তিনি কর্ণধার। অনেক ব্যস্টৱতার মধ্যেও যখন যেভাবে পাশে পেতে চেয়েছি, তিনি বিমুখ করেননি। ২০০৪ সালের ২৫ ডিসেল্ফ্বর মনসা দেবীমহৃর্তি মন্দিরে স্ট’াপন করা হয়। মহৃর্তির ঠিক সামনে রয়েছে বিজয়গুপ্টৱ প্রতিষ্ঠিত আদি ঘট, যার ওপরে সিঁদুরের প্রলেপ পড়তে পড়তে এখন বেশ বড় আকার ধারণ করেছে।
মন্দিরের নকশা তৈরি করেছেন খ্যাতিমান প্রকৌশলী অরুণ কানিৱ চত্রক্রবর্তী। এতে ধর্মীয় অনুভহৃতি, সাংস্ট্কৃতিক ঐতিহ্য ও আধুনিকতার চমৎকার সংমিশ্রণ রয়েছে। ইসঙাতের ১২ টি স্টৱল্ফ্ভের ওপর সুদৃশ্য সিরামিক টালির আচ্ছাদনে গড়ে উঠেছে মন্দিরটি। সোনালি অ্যালুমিনিয়াম ফেদ্ধমে স্ট্বচ্ছ ১০ মিলিমিটার পুরু টেমঙারড কাচের দেয়াল ঘেরা বিজয় গুপ্টৱ প্রতিষ্ঠিত মনসা মন্দির এখন সর্বমহলে অনুপম শিল্কপ্পকর্ম হিসেবে স্ট্বীকৃতি পেয়েছে। মেঝেতে রয়েছে শুভ্রতার প্রতীক মার্বেল পাথর। ইটের দেয়াল নয়, মন্দিরের চারপাশে আচ্ছাদন তৈরি হয়েছে ইসঙাত দিয়ে।
মন্দিরের পশ্চিম পাশেই রয়েছে মনসাকুন্ড নামে পরিচিত ঐতিহাসিক দীঘি, যেখান থেকে স্ট্বপ্বাদেশ পেয়ে বিজয় গুপ্টৱ তুলে এনেছিলেন মন্দিরে স্ট’াপিত মহৃল পহৃজার ঘট। মন্দির থেকে প্রায় ৪০ ধাপের সিঁড়ি নেমে গেছে দীঘিতে। প্রথম ডিজাইনে এটি ছিল না। কিন’ সর্বস্টৱরের জনগণের সভায় মন্দিরের নকশা অনুমোদনের দিন স্ট’পতি অরুণ চত্রক্রবর্তী দীঘিতে একটি সিঁড়ি নামিয়ে দেওয়ার প্রস্টৱাব করলে তাতে সোৎসাহ সল্ফ্মতি মেলে। এজন্য প্রায় পাঁচ লাখ টাকা বাড়তি ব্যয় হয়েছে। কিন’ যখন সিঁিড়র ওপরে দাঁড়িয়ে মন্দিরের মার্বেল পাথরের ভিতের নিচে মানসা দেবী মহৃর্তি ও দীঘির জলের প্রতিবিল্ফ্ব দেখতে পাওয়া যায়, তখন এ ব্যয় তুচ্ছ মনে হয়। সিঁড়ি থেকে মন্দিরে তাকালে মনে হয় যেন দীঘির জলের ওপর ভেসে আছে মন্দির ও দেবীমহৃর্তি।
এখন মন্দিরের সামনের প্রশস্ট’ অঙ্গনে রয়ানি এবং বিভিল্প্ব ধর্মীয় সমাবেশ সমঙল্প্ব করার জন্য একটি বড় মিলনায়তন গড়ে তোলার পরিকল্কপ্পনা রয়েছে। মন্দিরের পেছনের অংশে গড়ে উঠছে সবুজ উদ্যান।
বিজয়গুপ্টেৱর মনসা মন্দির সর্বদাই ধর্মনির্বিশেষে নারী-পুরুষের কাছে আকর্ষণীয় স্ট’ান। নবরূপে দেবীমহৃর্তি ও মন্দির নির্মাণ করায় তা আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে স্ট্বীকৃত হচ্ছে। প্রতিদিন দেশের নানা প্রানৱ থেকে পুন্যার্থী ও দর্শনার্থীরা আসেন এখানে। ভারতের বিভিল্প্ব এলাকা থেকেও আসেন। মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ হলে এ আকর্ষণ আরও বাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। সমঙ্রতি এ মন্দির পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান, বাংলাদেশ সরকারের তথ্যসচিব হেদায়েতউল্ক্নাহ মামুন, স্ট’ানীয় সরকার সচিব মিহির কানিৱ মজুমদার এবং ঢাকাস্ট’ ভারতীয় হাইকমিশনের পদস্ট’ কর্মকর্তা অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়। বরিশাল জেলা প্রশাসনের জেলার আকর্ষণীয় স্ট’ানের তালিকায় রয়েছে বিজয়গুপ্টেৱর মনসা মন্দিরের নাম।
অজয় দাশগুপ্টৱ :দৈনিক সমকালের সমঙাদকীয় বিভাগ প্রধান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগল্প্বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের খ-কালীন শিক্ষক
স্ট’ায়ী ঠিকানা :গৈলা, বরিশাল
সম্পাদনা: সেন্ট্রাল ডেস্ক
প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
|
|