![]() বরিশালে মুখোমুখি বিএনপি-জামায়াত নেতারা: শতকোটি টাকার জমিতে রাতারাতি মসজিদ
২৩ November ২০২৫ Sunday ১১:২৬:৩৩ AM
সাবেক প্রশাসকের মতে, জমির মালিক মুসলিম ইনস্টিটিউট * বিএনপি নেতা চানের দাবি, জায়গাটি মোহামেডান ক্লাবের অনলাইন নিউজ ডেস্ক: ![]() বরিশালে ৩৩ শতাংশ জমির দখল নিয়ে বিরোধে জড়িয়েছেন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতা। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের নামে এর দখল নিতে চাইছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবায়েদুল হক চান। অন্যদিকে জামায়াতের কয়েকজন নেতা মিলে মাত্র এক রাতের মধ্যে টিনের মসজিদ বানিয়ে দখল করেছেন সেটি। কাগজে-কলমে মুসলিম ইনস্টিটিউটের নামে থাকা ওই জমির বর্তমান বাজার দর ২৫ কোটি টাকারও বেশি। তবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এটির ব্যবহার হলে মূল্যমান ছাড়াবে শতকোটি টাকা। জামায়াত নেতারা অবশ্য ‘মুসলিম ইনস্টিটিউট’ নামেই এর দখল নিয়েছেন। ‘মুসলিম ইনস্টিটিউট জামে মসজিদ’ লিখে সাইনবোর্ডও ঝুলিয়েছেন তারা। তবে তারা সত্যিকার অর্থে ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধি কি না, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। প্রায় শত বছরের পুরোনো মুসলিম ইনস্টিটিউটের নেতৃত্ব কীভাবে তাদের কাছে এলো, তাও স্পষ্ট নয়। বিএনপি নেতা চানের দাবি, ‘এটি মোহামেডান ক্লাবের জমি। ক্ষমতার দাপটে জোর করে দখল করেছিলেন সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা সাদিক আব্দুল্লাহ। এ ঘটনায় হাইকোর্টে রিট করা হলে ক্লাবের পক্ষে রায় আসে। জমিটি দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে স্বার্থান্বেষী মহল।’ বরিশাল নগরীর প্রাণকেন্দ্র সদর রোডে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে থাকা এই জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন চলছিল জটিলতা। বহু বছর ধরে সেখানে ‘মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব’ নামে একটি ভবন থাকলেও খেলাধুলার কোনো আয়োজন দেখেনি কেউ। বরং মাদকসেবী আর জুয়াড়িদের আড্ডা ছিল সেটিতে। ভবনটি ঘিরে মাদক ব্যবসা চলার অভিযোগও ছিল। ২০২৩ সালে ওই ভবন গুঁড়িয়ে দিয়ে জমি দখলে নেয় বরিশাল সিটি করপোরেশন। তৎকালীন মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ তখন জানান, জমির মালিক নগর ভবন। ক্লাবের নামে সেটি জোর করে দখলে রাখা হয়েছিল। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর এই জমির দখল নিতে আবারও শুরু হয় তৎপরতা। এবার নিজেকে ক্লাবের আহ্বায়ক দাবি করে জমি দখলে নামেন বিএনপি নেতা চান। রাস্তাসংলগ্ন অংশে টিন দিয়ে শুরু হয় দোকান নির্মাণ। বিষয়টি জানতে পেরে বাধা দেন তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার ও সিটি প্রশাসক রায়হান কাওসার। তার এই বাধার পরিপ্রেক্ষিতে চান ও তার সহযোগীরা আন্দোলনের হুমকি দিলে দাখিল করতে বলা হয় মালিকানা সংক্রান্ত প্রমাণ। তখন জানানো হয়, ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় দলিলসহ সব কাগজপত্র নিয়ে গেছেন সাদিক। প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত জমি সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলা হলে হাইকোর্টে রিট করেন চান। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ক্লাবের ভবন ভাঙচুর ও ক্ষয়ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রকৃত মালিককে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা দেন আদালত। এসব জটিলতা চলার মধ্যে রেকর্ড রুমে কাগজপত্র ঘেঁটে জানা যায়, জমির প্রকৃত মালিক মুসলিম ইনস্টিটিউট। এসএ খতিয়ানসহ নামজারি এবং সর্বশেষ রেকর্ডেও রয়েছে তাদের নাম। নগরীর একাধিক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি জানান, ‘ব্রিটিশ আমলে বরিশালে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় বরিশাল ক্লাব। অভিজাত ব্রিটিশদের ওই ক্লাবে ব্রিটিশ ছাড়া অন্য কারও প্রবেশাধিকার ছিল না। বিষয়টি অসম্মানজনক মনে করে সদর রোডে বর্তমান শহীদ মিনারের বিপরীতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা প্রতিষ্ঠা করেন ‘ব্রাহ্ম সমাজ’। পাকা ভবন করে সেখানে অবসর কাটাতেন অভিজাত হিন্দুরা। এদিকে খ্রিষ্টানরাও কাছাকাছি জায়গায় গড়েন চার্চ, গির্জাসহ তাদের সময় কাটানোর অবকাঠামো। অন্যসব ধর্মের লোকজন এভাবে ক্লাব স্টাইলে অবকাঠামো গড়লেও মুসলিমদের জন্য ছিল না কিছুই। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৩৭ সালে শায়েস্তাবাদের তৎকালীন জমিদার বরিশাল ক্লাব-ব্রাহ্ম সমাজ ও চার্চের ঠিক পাশেই ৩৩ শতাংশ জমি দান করেন ‘মুসলিম ইনস্টিটিউট’-এর নামে। এখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের ধর্মচর্চাসহ ইসলাম নিয়ে গবেষণা ও দরিদ্র মুসলিমদের জন্য কিছু একটা করবেন-এমনই ছিল দানের লক্ষ্য। তখনকার সময়ে ইনস্টিটিউট পরিচালনার জন্য একটি কমিটিও করা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর গণহারে বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ত্যাগের কারণে সনাতন ধর্মাবলম্বী ও খ্রিষ্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে প্রয়োজনীয়তা কমে মুসলিম ইনস্টিটিউটের। মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় এই ইনস্টিটিউট হারিয়ে ফেলে তার আবেদন। খালি পড়ে থাকে ৩৩ শতাংশ জমি। এই খালি জমিতেই গড়ে ওঠে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। তখন অবশ্য ক্লাবের নামে খেলাধুলাসহ চলত নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড। পরে পরিণত হয় মদ-জুয়ার আড্ডায়। এদিকে মুসলিম ইনস্টিটিউটের নামে থাকা জমির মধ্যে ৬ শতাংশ দখলে নেয় গণপূর্ত অধিদপ্তর। বেআইনিভাবে তাদের নামে ওই ৬ শতাংশের বিএস রেকর্ডও হয়। এছাড়া জমির সামনে গড়ে ওঠে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও বরিশাল অডিটোরিয়াম। জমির মালিক যে মুসলিম ইনস্টিটিউট, তা জানাজানি হওয়ার পর বিএনপি নেতা চান বলেন, মুসলিম ইনস্টিটিউট মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবকে এই জমি দান করে দিয়েছে। যদিও সেই দাবির পক্ষেও কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি তিনি। এবায়েদুল হক চান বলেন, ‘৩৩ শতাংশ জমির বিএস রেকর্ড আছে আমাদের। সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে জমিটি ক্লাবের। তারপরও সাবেক বিভাগীয় কমিশনার রায়হান কাওসারের গড়িমসির কারণে জমি বুঝে পাইনি।’ জমিটি মুসলিম ইনস্টিটিউটের এবং সেখানে তারা মসজিদ করে দখলে নিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জন্মের পর থেকে দেখে আসছি ওখানে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। যারা নিজেদের মুসলিম ইনস্টিটিউটের কমিটি দাবি করছে, তাদের বৈধতা কী? প্রায় ১শ বছরের ধারাবাহিক ক্রমানুসারে কি তারা কমিটিতে এসেছে? তারা কেন সোমবার রাতের আঁধারে মসজিদ বানিয়ে জমি দখল করল? আমরা এটি নিয়ে আদালতে যাব।’ মুসলিম ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক দাবিদার জামায়াত নেতা অ্যাডভোকেট সালাহউদ্দিন মাসুম বলেন, ‘সমাজের ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের নেতৃত্বে এই ইনস্টিটিউট চলবে-এমনই নির্দেশনা ছিল দানপত্রে। ১৯৮৫/৮৬ সাল পর্যন্ত যারা এই ইনস্টিটিউটের সদস্য ছিলেন, তাদের বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে যারা ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসাবে সমাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের নিয়েই কমিটি হয়েছে। আর যা হয়েছে, তা দিনের আলোতেই। কেবল মসজিদ নয়, ইসলামি কমপ্লেক্স করতে চাই আমরা। ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার হবে। দরিদ্র মুসলিমদের সহায়তা কেন্দ্র আর ইসলামিক সংস্কৃতির বিকাশ কেন্দ্র হিসাবে কাজ করবে এই কমপ্লেক্স। এখানে ক্লাবের নামে জুয়া বা মদের আসর বসাতে দেওয়া হবে না।’ বরিশাল নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আপাতদৃষ্টিতে ২০ কোটি মনে হলেও নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় থাকা ওই জমির ব্যবসায়িক বাজারদর কয়েক শ কোটি টাকা। সেখানে যদি বিশাল একটি কমপ্লেক্স তৈরি করে ভাড়া অথবা বিক্রির চিন্তা করা হয়, তাহলে বাণিজ্যটা শতকোটিতে গিয়েই দাঁড়াবে। যে কারণে এই জমির প্রতি এখন নজর অনেকের। আমি মনে করি, যে উদ্দেশ্যে শত বছর আগে মুসলিম জমিদাররা দান করেছেন, সেভাবেই ব্যবহার হওয়া উচিত জমিটি।’ সদ্যবিদায়ি বিভাগীয় কমিশনার ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক (বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব ভূমি মন্ত্রণালয়) রায়হান কাওসার বলেন, ‘এটি শতভাগ নিশ্চিত যে কাগজপত্র অনুযায়ী জমিটির বৈধ মালিক মুসলিম ইনস্টিটিউট। বিএস রেকর্ড অনুযায়ী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব জমির মালিকানা দাবি করলেও তার আইনগত বৈধতা নেই। বরিশাল নগরীর ওই মৌজায় বিএস কার্যকর নয়। এই সংক্রান্ত কোনো প্রজ্ঞাপন বা বিএস প্রিন্ট হয়নি। দখলে থাকলেই কেউ জমির মালিক হয়ে যায় না। আমি বরিশালে থাকাকালে ওবায়েদুল হক চানকে মালিকানার পক্ষে কাগজপত্র দেখাতে বলেছিলাম। তিনি দেখাতে পারেননি। বলেছেন যে সাবেক মেয়র সাদিক সব কাগজপত্র নিয়ে গেছে। রেকর্ড রুমে সব দলিল থাকে। মালিকানার দাবি বৈধ হলে তিনি নকল কপি নিয়ে জমা দিতে পারতেন। উনি যে রায়ের কথা বলছেন, সেখানেও প্রকৃত মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছে। আমি যেহেতু বরিশাল থেকে চলে এসেছি, তাই পরে কী হয়েছে, সে ব্যাপারে বলতে পারব না।’ সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। |
||

