" />
AmaderBarisal.com Logo

বাংলাদেশের জলবায়ু অঙ্গীকার: NDC, COP30 এবং বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের প্রেক্ষাপট


আমাদেরবরিশাল.কম

৩০ November ২০২৫ Sunday ৬:০৩:৫৬ PM

বিশেষ প্রতিনিধি, আমাদের বরিশাল।বাংলাদেশ এখন তার জলবায়ু অভিযাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও নদীভাঙনের মতো ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি দেশের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে প্রতিদিন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। অভিযোজনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তোলা এখন আর বিকল্প নয়—এটি টিকে থাকার অপরিহার্য শর্ত।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের তৃতীয় জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (NDC 3.0) এবং আসন্ন COP30 (বেলেম, ব্রাজিল) জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা ও বৈশ্বিক সহযোগিতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরানোর সুযোগ তৈরি করেছে।

NDC 3.0 অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট ৮৪.৯২ মিলিয়ন টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড সমতুল্য (CO₂eq) নির্গমন হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। এর মধ্যে ৬.৩৯% অনিরপেক্ষ (unconditional) এবং ১৩.৯১% শর্তাধীন (conditional) হ্রাস অন্তর্ভুক্ত। এই প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের নিজস্ব সামর্থ্যের পাশাপাশি উন্নত দেশগুলোর সহায়তার ওপরও নির্ভরশীল।

পরিকল্পনাটিতে অভিযোজন, প্রশমন, জেন্ডার সমতা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং স্থানীয় পর্যায়ের অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন আনুমানিক ১১৬.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের ন্যায্য বণ্টনের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।আসন্ন COP30 সম্মেলনে বৈশ্বিক প্রত্যাশা স্পষ্ট—জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অভিযোজন ও “লস অ্যান্ড ড্যামেজ” (ক্ষতি ও নির্ঘাত) তহবিল প্রাপ্তি এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। নতুনভাবে গঠিত Loss and Damage Fund আশা জাগালেও, এর কার্যকর ব্যবস্থাপনা, তহবিলে সহজ প্রবেশাধিকার এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ এই প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিতে পারে—বিশেষ করে তহবিল ব্যবস্থাপনা সহজ করা, জাতীয় প্রস্তুতি জোরদার করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে বৈশ্বিক আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রেখে।

দেশে ইতিমধ্যে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস (DRR) ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় অগ্রগতি হয়েছে। গত কয়েক দশকে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, আশ্রয়কেন্দ্র এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রস্তুতি কর্মসূচি হাজারো প্রাণ রক্ষা করেছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দুর্যোগের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় এখন প্রয়োজন DRR এবং জলবায়ু শাসনের পূর্ণ সমন্বয়।

স্থানীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (LAPA), বিকেন্দ্রীকরণ, নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ও বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা—এই উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের অভিযোজন কাঠামোকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করছে।

কার্যকর জলবায়ু সুশাসনের মূলভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ ও সমন্বয়। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যখন স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠান একসাথে কাজ করে, তখন পরিবর্তন হয় টেকসই ও স্থায়ী। জলবায়ু অর্থের যথাযথ ব্যবহার, জবাবদিহি ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। COP30 সামনে রেখে বাংলাদেশের কণ্ঠ আজ আরও শক্তিশালী।

এই দেশের গল্প কেবল ঝুঁকির নয়, এটি উদ্ভাবন, নেতৃত্ব ও টিকে থাকার গল্প। এখন বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সময়, যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলো শুধু টিকে না থাকে, বরং এগিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটি এক আহ্বান—জবাবদিহিমূলক সুশাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের মাধ্যমে এমন এক ভবিষ্যৎ গড়ার, যেখানে প্রতিটি টাকার ব্যবহার মানুষের জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তন আনে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের টিকে থাকার কৌশলবাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হলেও, টিকে থাকার লড়াইয়ে দেশটি দেখিয়েছে অসাধারণ সক্ষমতা।

ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, লবণাক্ততা ও নদীভাঙনের মতো দুর্যোগ বারবার আঘাত হানলেও, মানুষ তাদের জ্ঞান, উদ্ভাবন ও সহনশীলতার মাধ্যমে নতুন করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ তিনটি মূল দিককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে—অভিযোজন, সুশাসন ও স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তোলা।

জাতীয় পর্যায়ে সরকার NDC 3.0 এবং মুজিব ক্লাইমেট প্রস্পেরিটি প্ল্যানের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে, যার লক্ষ্য কেবল ক্ষতি কমানো নয়, বরং জলবায়ু ঝুঁকিকে উন্নয়নের সুযোগে রূপান্তর করা।দেশে এখন স্থানীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (LAPA), কমিউনিটি-ভিত্তিক দুর্যোগ প্রস্তুতি, নারী নেতৃত্বে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক জবাবদিহির মতো উদ্যোগ বাড়ছে। এগুলো মানুষের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিচ্ছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ তৈরি করছে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়নের ন্যায্য বণ্টনের দাবিতে সক্রিয়। COP সম্মেলনগুলোতে দেশটি ধারাবাহিকভাবে অভিযোজন তহবিল, লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের গুরুত্ব তুলে ধরছে।টিকে থাকার পথে বাংলাদেশের শক্তি শুধু অর্থ বা নীতি নয়—এটি মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা, সহযোগিতামূলক মনোভাব এবং আশার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক জাতির গল্প। উন্নত সুশাসন, বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং স্থানীয় নেতৃত্ব যদি একসাথে এগিয়ে যায়, তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনের এই বৈশ্বিক সংকটে বাংলাদেশ শুধু টিকে থাকবে না, বরং নতুন সম্ভাবনার পথ দেখাবে।



সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার    সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০। ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।