![]() মুজিবনগর দিবস: একটি সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও কূটনৈতিক অভিষেক
১৭ April ২০২৬ Friday ৬:৩৪:৩৪ PM
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ: ![]() 📌 আজ ১৭ এপ্রিল, ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। একাত্তরের এই দিনে বৈশাখের তপ্ত দুপুরে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার ছায়াশীতল আম্রকানন হঠাৎ করেই হয়ে উঠেছিল এক পরাধীন জাতির নবজন্মের আঁতুড়ঘর। চারদিকে আমের মুকুলের প্রগাঢ় ঘ্রাণ আর পাতার ফাঁক দিয়ে গলে আসা রোদের ঝিলিকের মাঝেই সেদিন রচিত হয়েছিল এক অমোঘ ইতিহাস। ঝিনাইদহের তৎকালীন এসডিপিও মাহবুব উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একদল চৌকস পুলিশের দেওয়া সেই ঐতিহাসিক ‘গার্ড অব অনার’ এবং ধূলিধূসরিত প্রান্তরে উত্তোলিত জাতীয় পতাকা ছিল মূলত বিশ্ব গণমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ‘সার্বভৌম ক্ষমতা’ প্রদর্শনের প্রথম আনুষ্ঠানিক মহড়া। তৎকালীন বিশ্বব্যবস্থায় যখন যেকোনো মুক্তি সংগ্রামকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার আন্তর্জাতিক প্রবণতা ছিল, তখন মুজিবনগর সরকারের আত্মপ্রকাশ ছিল পাকিস্তানের ‘একক অখণ্ডতার’ কৃত্রিম ন্যারেটিভকে আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডে চূর্ণ করে দেওয়া। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে অর্জিত জনগণের নিরঙ্কুশ গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটই এই সরকারকে দিয়েছিল সেই অনন্য নৈতিক বৈধতা, যা একে একটি ‘বিদ্রোহী গোষ্ঠী’ থেকে উন্নীত করেছিল ‘ডি জুর’ (de jure) বা আইনি সার্বভৌম সরকারে। সেই ঐতিহাসিক আম্রকাননে অধ্যাপক ইউসুফ আলী কর্তৃক পাঠকৃত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ (Proclamation of Independence) ছিল মূলত বাংলাদেশের প্রথম কার্যকরী সংবিধান। ১০ এপ্রিল গঠিত এই সরকার ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাকে একটি সুসংহত সাংবিধানিক কাঠামো দান করে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে বাঙালি বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, তাদের লড়াই কোনো জনবিচ্ছিন্ন গেরিলা তৎপরতা নয়, বরং একটি বৈধ ও সুসংহত প্রশাসনের অধীনে পরিচালিত রাষ্ট্রিক সংগ্রাম। রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলামের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং তাজউদ্দীন আহমদের প্রখর প্রশাসনিক ও প্রধানমন্ত্রীর প্রজ্ঞা এই সরকারকে সমসাময়িকভাবে ‘গভর্নমেন্ট-ইন-এক্সাইল’ বা প্রবাসী সরকারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সফল উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। মুজিবনগর সরকারের কাঠামোগত ভিত্তি ছিল ৪ জাতীয় নেতার লড়াকু সমন্বয় ও যোগ্য নেতৃত্ব। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত এই মন্ত্রিসভায় ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী সামলেছেন অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতো জটিল চ্যালেঞ্জ। এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে ন্যস্ত করা হয়েছিল স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের গুরুদায়িত্ব, যা যুদ্ধকালীন শরণার্থী ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় ছিল অপরিহার্য। এছাড়া খন্দকার মোশতাক আহমেদকে পররাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক বলয় গড়ে তোলা হয়। ১২টি বিশেষায়িত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই প্রশাসন কলকাতার থিয়েটার রোডের সচিবালয় থেকে যেভাবে সামরিক সমন্বয়, সিভিল প্রশাসন পুনর্গঠন এবং রাজস্ব ও ডাক বিভাগীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করেছে—তা আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্বে ‘স্টেট-ইন-মেকিং’-এর এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীর নেতৃত্বে নিয়মিত ও অনিয়মিত বাহিনীর সমন্বয় এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনা প্রমাণ করে যে, এটি একটি কার্যকর রাষ্ট্রযন্ত্র (Functional State Machinery), যা চূড়ান্ত বিজয় ত্বরান্বিত করেছিল। ভূ-রাজনৈতিক দাবার ছকে মুজিবনগর সরকারের কূটনৈতিক বিজয় ছিল অতুলনীয়। তৎকালীন স্নায়ুযুদ্ধের মেরুকরণে যখন ওয়াশিংটন-ইসলামাবাদ-বেইজিং অক্ষ বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, তখন এই সরকার ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কৌশলগত সমর্থন আদায়ে প্রখর বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। বিশেষ করে ‘নিক্সন-কিসিঞ্জার ডকট্রিন’-এর বিপরীতে বাংলাদেশের গণহত্যার বিচারবিভাগীয় ও মানবিক ব্যাখ্যা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া ছিল এই সরকারের এক অভাবনীয় মাস্টারস্ট্রোক। সিডনি শ্যানবার্গের মতো আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এই সরকারের শপথ গ্রহণ নিশ্চিত করেছিল যে, বিশ্ব সম্প্রদায় এই লড়াইকে আর পাকিস্তানের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবে গণ্য করতে পারবে না। এটি ছিল একাধারে রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের টেবিলে এক সুনিপুণ ও সার্থক বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। আজ ২০২৬ সালের ১৭ এপ্রিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই মহান অর্জনের ৫৫তম বার্ষিকীতে মুজিবনগর দিবসের উত্তরাধিকার কেবল ইতিহাসের নির্লিপ্ত স্মৃতিচারণ নয়, বরং তা একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রামাণ্য দলিল। বর্তমান বিশ্বে যখন ইউক্রেন বা ফিলিস্তিনের মতো অঞ্চলে ‘সার্বভৌমত্ব’ এবং ‘প্রবাসী সরকার’ নিয়ে নতুন করে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে, তখন মুজিবনগর সরকারের সফল মডেলটি একটি অনন্য ‘কেস স্টাডি’ হিসেবে বিশ্ব দরবারে সমাদৃত। ১০ এপ্রিলের সেই ঘোষণাপত্র থেকে ১৭ এপ্রিলের শপথ পর্যন্ত যাত্রাপথটি ছিল মূলত পরাধীনতার শেকল ভেঙে সাংবিধানিক সার্বভৌমত্বের আলোয় প্রবেশের পথ। এই ঐতিহাসিক দিনটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের সেই আদি ভিত্তিপ্রস্তর, যার ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক বাংলাদেশ আজ তার উন্নয়ন ও কূটনীতির ইমারত নির্মাণ করছে। মুজিবনগর কেবল একটি স্মৃতিবিজড়িত স্থানের নাম নয়; এটি বাঙালির রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার এক চিরন্তন স্মারক। ১৭ এপ্রিলের সেই আম্রকাননে রোপিত আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক বৈধতার বীজটিই আজকের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রাণশক্তি। যতদিন মানচিত্রে সার্বভৌম বাংলাদেশ টিকে থাকবে, মুজিবনগরের সেই প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিক কাঠামোই বাঙালির জয়যাত্রায় শ্রেষ্ঠ রক্ষাকবচ হিসেবে দেদীপ্যমান থাকবে। 📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ, সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। |
||

