" />
AmaderBarisal.com Logo

সাপ্লাই চেইন ভেঙে দেওয়ায় সংকট: গ্রাম পর্যায়ে মিলছে না অকটেন-ডিজেল


আমাদেরবরিশাল.কম

২৭ April ২০২৬ Monday ১১:২৮:২৮ AM

বিশেষ প্রতিনিধি:

প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার কারণেই জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। গ্রাম, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় শহরের পাম্পে ভিড় করছেন সেচযন্ত্র ও যানবাহন মালিকরা। এতে পাম্পে সৃষ্টি হচ্ছে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। সংকটের আশঙ্কায় অতিরিক্ত তেল কেনা ও মজুত করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। অথচ যুগ যুগ ধরে চলা সাপ্লাই চেইন ঠিক থাকলে এসবের কিছুই হতো না।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই কোন উদ্দেশ্যে ভাঙা হলো বহু পুরোনো সরবরাহ ব্যবস্থা-সেটাই এখন প্রশ্ন। যে প্রশ্নের সঠিক কোনো উত্তর দিতে পারছেন না পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির কর্মকর্তারাও। তারা শুধু বলছেন অবৈধ মজুত ঠেকানো আর অপচয় রোধে বিপিসির (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণের কথা। যেসব নির্দেশনার কারণেই ভেঙে পড়ে তৃণমূল পর্যন্ত থাকা সাপ্লাই চেইন। যার ফলে এখনো তেল পাচ্ছেন না গ্রামের মানুষ। কমছে না পাম্পে ভিড়।

দেশে তেল সরবরাহের মূলত ৩টি ধাপ রয়েছে। কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে জ্বালানি যায় পাম্পে। সেখান থেকে বিক্রি হয় মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে। এর বাইরে ডিপো থেকে তেল নেন প্যাক পয়েন্ট ডিলাররা। ড্রামে রেখে সেই তেল বিক্রি করেন তারা। প্যাক পয়েন্ট ডিলারদের কাছ থেকে আবার তেল নিয়ে বিক্রি করেন সাব-ডিলার। শেষোক্ত সাব-ডিলারদের অবশ্য জ্বালানি তেল বিক্রির বৈধ লাইসেন্স নেই। মূল ডিলারদের কাছ থেকে তেল নিয়ে বিক্রি করেন তারা। এই প্যাক পয়েন্ট আর সাব-ডিলাররা তেল বিক্রি করেন গ্রামীণ এলাকায়। উপজেলা শহর কিংবা গ্রামের হাট-বাজার, যেখানে কোনো পেট্রোলপাম্প নেই সেখানে তেল বিক্রি করেন তারা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম খক্ষ পড়ে এই প্যাক পয়েন্ট আর সাব-ডিলারদের ওপরে। প্রথমেই বন্ধ হয়ে যায় সাব-ডিলারদের বিক্রি। সেই সঙ্গে প্যাক পয়েন্ট ডিলারদের কাছে সরবরাহ কমে যায়। 

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার একজন প্যাক পয়েন্ট ডিলার যুগান্তরকে বলেন, ‘ডিলারশিপ থাকলেও আমরা ডিপো থেকে খুব একটা বেশি তেল নিতাম না। ডিপো থেকে তেল নিতে অগ্রিম টাকা দিতে হয়। তাই বাকিতে তেল নিতাম পেট্রোলপাম্পগুলো থেকে। ডিলারশিপ টেকাতে সামান্য কিছু তেল সরকারি ডিপো থেকে নিতাম। যুদ্ধ শুরুর পর নিয়ম করা হলো পাম্প থেকে ড্রামে বা অন্য কোনো পাত্রে নেওয়া যাবে না তেল। অন্যদিকে বিপিসি বলল, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে ডিলাররা যতটুকু তেল নিয়েছে সেই অনুযায়ী সরবরাহ পাবে। একদিকে বন্ধ হয়ে গেল পাম্প থেকে তেল নেওয়া। আর আমরা তো ডিপো থেকে কখনোই খুব বেশি তেল নেইনি। ফলে কমে গেল সরবরাহ। সেই সঙ্গে তেল শূন্য হয়ে পড়ল উপজেলা ইউনিয়ন আর গ্রাম পর্যায়ের হাটবাজার।’

প্যাক পয়েন্ট ডিলারদের পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যায় সাব-ডিলারদের তেল বিক্রিও। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পৌর শহরের ১০-১২টি দোকান থেকে তেল কিনতাম আমরা। যুদ্ধ শুরুর পর তেল শূন্য হয়ে যায় দোকানগুলো। এখান থেকে সবচেয়ে কাছের পেট্রোলপাম্পটিও কমপক্ষে ১০ কিলোমিটার দূরে। বাধ্য হয়ে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তেল আনতে হচ্ছে।’ নলছিটি কলেজ সড়কের সরদার ট্রেডার্সের মালিক সোহাগ সরদার বলেন, ‘ঝালকাঠির ডিলারদের কাছ থেকে তেল এনে বিক্রি করতাম। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে আমার দোকানে সপ্তাহে ৩ ব্যারেল ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন বিক্রি হতো। যুদ্ধ শুরুর পর আর তেল পাচ্ছি না। অন্য দোকানগুলোরও একই অবস্থা।’ 

বরিশালের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন উপজেলা হিজলার কাউরিয়া বন্দরের তেল ব্যবসায়ী দলিলুর রহমান বলেন, ‘যুদ্ধের আগে প্রতি সপ্তাহে ৭শ লিটার পেট্রোল, ২শ লিটার অকটেন আর ৩শ লিটার ডিজেল বিক্রি হতো আমার দোকানে। যুদ্ধ শুরুর পর গত আড়াই মাসে পেয়েছি মাত্র ৬শ লিটার পেট্রোল আর ১ হাজার লিটার ডিজেল। অকটেন পাইনি।’ 

সাব-ডিলার হিসাবে তেল বিক্রি করা দলিলুর রহমানের মতো আরও অন্তত ২০-২৫ জন তেল বিক্রেতা আছেন এ উপজেলায়। সবারও একই অবস্থা। হিজলা শহরের বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আগে রাস্তার পাশের দোকানে মিলত তেল। হাত বাড়ালেই পাওয়া যেত অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল। এখন ৩০-৪০ কিলোমিটার দূরে বরিশাল শহরে গিয়ে তেল আনতে হয়। নয়তো লিটারপ্রতি ৪০-৫০ টাকা বেশি দিয়ে তেল কিনতে হয় এক শ্রেণির বাইকারদের কাছ থেকে। তারা বরিশালে গিয়ে বাইকের ট্যাংকি ভরে তেল নিয়ে এসে এখানে নামিয়ে বিক্রি করে।’

পরিচয় না প্রকাশের শর্তে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘বরিশাল বিভাগের ৬ জেলায় ৪২ উপজেলা এবং ৩৫২টি ইউনিয়ন রয়েছে। ইউনিয়নগুলো তো আছে ১ হাজার ৫৬টি ওয়ার্ড। যুদ্ধ শুরুর আগে এসব ওয়ার্ডে জ্বালানি তেল সহজলভ্য ছিল। প্রতিটি ইউনিয়নে কম করে হলেও ছিল ৪-৫টি তেলের দোকান। এই দোকানগুলো অবশ্য বৈধ ছিল না। বরিশালে থাকা পদ্মা, মেঘনা আর যমুনা অয়েল কোম্পানি মিলিয়ে প্যাক পয়েন্ট ডিলার রয়েছে সর্বোচ্চ ৪৫ থেকে ৫০টি। এইসব প্যাক পয়েন্ট ডিলার অথবা পাম্পগুলো থেকে তেল নিয়ে ইউনিয়ন ওয়ার্ড পর্যায়ে বিক্রি করত তারা। আমরা এই দোকানগুলোকে বলতাম স্লিপ সিস্টেম সেলার। এটা ছিল ওপেন সিক্রেট। বৈধতা না থাকা সত্ত্বেও এসব দোকানে তেল বিক্রির বিষয়টি দেখেও দেখতাম না। কারণ নদ-নদীর এলাকা বরিশালের অন্তত ১৫ উপজেলায় নেই পেট্রোলপাম্প। ইউনিয়ন ওয়ার্ড পর্যায়ে প্যাক পয়েন্ট ডিলাররাই তেল সরবরাহের একমাত্র ভরসা। আর একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে তেল পৌঁছানোর সাপ্লাই চেইন টিকিয়ে রাখত স্লিপ সিস্টেমের সেলাররা। যুদ্ধ শুরুর পর নির্দেশনা আসতে শুরু করে। প্রথমে সিলিং দেওয়া হয় তেল বিক্রিতে। এরপর বলা হয় গত বছরের এই সময়ের চাহিদা অনুযায়ী পাম্প আর প্যাক পয়েন্ট ডিলারদের তেল সরবরাহ করতে। ফলে বন্ধ হয়ে যায় গ্রাম পর্যায়ে তেল সরবরাহ। যার প্রভাব পড়ে শহরের পেট্রোলপাম্পগুলোতে। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে পাম্পে অপেক্ষমাণ মোটরসাইকেল আর যানবাহনের সারি। যে অবস্থা এখনো চলছে। ইউনিয়ন ওয়ার্ড পর্যায়ে এখনো চলছে জ্বালানি তেলের সংকট।’ 

আরও একটি কারণে বন্ধ হয়ে যায় সাব-ডিলারদের তেল বিক্রি। যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতের সন্ধানে অভিযানে নামে সরকার। মজুত করা প্রায় সাড়ে ৪ লাখ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার হওয়ার খবরও এসেছে গণমাধ্যমে। অথচ এই তেলের বড় একটা অংশ গ্রাম পর্যায়ে তেল বিক্রি করা সাব-ডিলারদের। চরফ্যাশন উপজেলার ঢালচর এলাকার একজন সাব-ডিলার বলেন, ‘এরকম ঘটনা বহু আছে যে সাব-ডিলার হিসাবে তেল বিক্রি করা দোকান থেকে আটক হয়েছে অকটেন-ডিজেল। ওই বেচারা হয়তো বহু বছর ধরে বিক্রি করছেন জ্বালানি তেল। কিন্তু বৈধ লাইসেন্স না থাকায় তা হয়ে গেছে অবৈধ মজুত। এ কারণেও গ্রাম পর্যায়ের অনেক সাব-ডিলার বন্ধ করে দেন তেল বিক্রি।’ 

বরিশাল নগরীর একাধিক পেট্রোলপাম্প মালিক বলেন, ‘ওয়ার্ড ইউনিয়ন পর্যায়ে থাকা সাপ্লাই চেইন ভেঙে দেওয়ার কারণেই মূলত সৃষ্টি হয় সংকটের। দেশের এমন কোনো ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পাবেন না যেখানে কম করে হলেও ৩০-৪০টি মোটরসাইকেল নেই। সেই সঙ্গে রয়েছে ডিজেলচালিত যানবাহন এবং সেচযন্ত্রসহ নানা ইঞ্জিন। আগে এরা গ্রামে বসেই পেত তেল। গ্রামগুলো তেলশূন্য হয়ে পড়ায় এরাই ভিড় করছেন পেট্রোলপাম্পগুলোতে।’

যমুনা অয়েল কোম্পানির বরিশালের ডিএমও কাওসার হোসেন বলেন, ‘পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থ তো বিস্ফোরক দ্রব্য। নিরাপত্তা বিধান মেনে এগুলো সংরক্ষণ ও বিক্রি করতে হয়। সে কারণেই এগুলো বিক্রির ডিলারশিপ দেওয়া কিংবা পাম্পগুলোর লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। আপনি যদি বলেন যে, অবৈধ দোকানে আমরা এগুলো বিক্রির অনুমতি দেব তাহলে সেটা কতটা যৌক্তিক? তাছাড়া যেসব প্যাক পয়েন্ট ডিলাররা নিয়ম মেনে ডিপো থেকে তেল না নিয়ে বাজার থেকে তেল কিনে বিক্রি করেছেন তাদের চাহিদাই বা আমরা কিভাবে নির্ধারণ করব?’ 

মেঘনা অয়েল কোম্পানির ডিএমও আনিসুর রহমান বলেন, ‘সাপ্লাই চেইন প্রশ্নে যেসব অনিয়ম ধরা পড়েছে সেগুলো দূর করার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে যাতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতেও প্যাক পয়েন্ট ডিলারশিপ দেওয়া যায় সে ব্যাপারে কাজ করছে আমাদের কোম্পানি।’



সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার    সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০। ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।