![]() ছয় দফা: একটি ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক মুক্তির ইশতেহার
৭ June ২০২৬ Sunday ৫:১৫:৩২ PM
-বাহাউদ্দিন গোলাপ: ![]() ইতিহাসের গতিপথ সর্বদা সরলরেখায় চলে না। কিছু ক্ষণ আসে যা কালানুক্রমিক সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে একটি জাতির সামষ্টিক চৈতন্যের অবিনাশী স্মারক হয়ে ওঠে। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন তেমনই এক মহিমান্বিত লগ্ন, যখন এই গাঙ্গেয় বদ্বীপের মানচিত্র তার শতাব্দীর নীরবতা ভেঙে নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণের মৌলিক ব্যাকরণ রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছিল। দূরদর্শী জননায়ক শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ‘ছয় দফা’ কেবল কাগজের বুকে খোদাই করা কিছু শুষ্ক শাসনতান্ত্রিক অনুচ্ছেদ মাত্র ছিল না; তা ছিল মূলত দীর্ঘকাল ধরে শোষিত ও অবদমিত এক জনপদের মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি এবং অস্তিত্ব রক্ষার এক চুড়ান্ত রাজনৈতিক দর্শন। একটি নদী যেভাবে তার নিজস্ব উৎস থেকে যাত্রা শুরু করে সমস্ত কৃত্রিম বাধা ডিঙিয়ে সমুদ্রের অবাধ্য টানে ধাবিত হয়, বাঙালির স্বাধিকারের চেতনাও তেমনি ৭ জুনের রাজপথের রক্ত আর ছয় দফার দর্শনকে পাথেয় করে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে এক সার্বভৌম স্বাধীনতার চূড়ান্ত মোহনায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। ঐতিহাসিক পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর এক জাতীয় সম্মেলনে এই রূপরেখা প্রথম উত্থাপিত হয়। তৎকালীন পাক-ভারত যুদ্ধ-পরবর্তী উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু যখন এই ঐতিহাসিক রূপরেখা সম্মেলনে বিষয় নির্ধারণী কমিটিতে পেশ করেন, তখন পশ্চিম পাকিস্তানি কায়েমি স্বার্থবাদী শাসকগোষ্ঠী স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। তারা এই দাবিকে সম্মেলনের মূল আলোচ্যসূচিতে তুলতেই অস্বীকার করে এবং একে পাকিস্তান ভাঙার চক্রান্ত হিসেবে প্রচার করতে শুরু করে। কিন্তু দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু আপোসের পথ বেছে নেননি। ৬ ফেব্রুয়ারি এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি এই দাবি দেশ ও বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করেন। ঢাকায় ফিরে আসার পর স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খান চরম ক্ষিপ্ত হয়ে একে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আখ্যা দেন এবং অস্ত্রের ভাষায় এই আন্দোলন দমন করার খোলাখুলি হুমকি দেন। তবে আইয়ুব শাহী এটি বুঝতে পারেনি যে, যে দাবির শিকড় জনতার হৃদগের গভীরে প্রোথিত, তাকে কোনো সামরিক বুট দিয়ে পিষে ফেলা সম্ভব নয়। এই ঐতিহাসিক সনদের নেপথ্যে ছিল এক দীর্ঘ ও সুসংগঠিত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি। পূর্ব বাংলার প্রতি পাকিস্তানের কাঠামোগত বৈষম্যকে বঙ্গবন্ধু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, যার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। একই সাথে, পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিসে বাঙালির প্রতি বৈষম্যের স্বরূপ ভেতর থেকে প্রত্যক্ষ করা তৎকালীন সিএসপি কর্মকর্তা রুহুল কুদ্দুস (যিনি পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিপরিষদ সচিব হন) গোপনে বঙ্গবন্ধুকে প্রশাসনিক ও সংখ্যাতাত্ত্বিক অকাট্য তথ্য সরবরাহ করে এই দলিলের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতাকে মজবুত করেছিলেন। ১৯৬৬ সালের মার্চ মাসে ঢাকার ঐতিহাসিক কাউন্সিলে এই ‘ছয় দফা’ সর্বসম্মতিক্রমে আওয়ামী লীগের দলীয় ইশতেহার হিসেবে গৃহীত হয়। এই কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দলের সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন, যা বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনকে এক সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করে। এই প্রচারণাকে বেগবান করতে বঙ্গবন্ধু নিজের নামে ‘আমাদের বাঁচার দাবী: ৬-দফা কর্মসূচী’ শিরোনামে একটি ঐতিহাসিক পুস্তিকা প্রকাশ করেন, যা বাঙালির স্বাধিকারের প্রথম আনুষ্ঠানিক লিখিত দলিল হিসেবে মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে যায়। শাসনতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির সুনির্দিষ্ট খসড়া হিসেবে এই দলিলের ছয়টি দফা ছিল একটি বৈষম্যহীন ও স্বশাসিত রাষ্ট্রকাঠামো বিনির্মাণের এক নিখুঁত বুদ্ধিবৃত্তিক রূপরেখা। প্রথম দফায় ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে একটি সত্যিকারের ফেডারেশন বা যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়, যেখানে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারে আইনসভা হবে সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারে নির্বাচিত এবং সম্পূর্ণ সার্বভৌম। দ্বিতীয় দফায় কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেবল প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র—এই দুটি বিষয় ন্যস্ত করে বাকি সব বিষয়ের পূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনি ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। শাসনতান্ত্রিক এই সুরক্ষার সমান্তরালে, ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক শোষণের পথ বন্ধ করতে তৃতীয় দফায় দুই অঞ্চলের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক অথচ সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা ব্যবস্থা অথবা একই মুদ্রার অধীনে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক রিজার্ভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার দাবি তোলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় চতুর্থ দফায় কর, শুল্ক ও রাজস্ব আদায়ের একক ও চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাব করা হয় এবং পঞ্চম দফায় আঞ্চলিকভাবে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নিজ নিজ প্রদেশের পূর্ণ মালিকানা প্রতিষ্ঠা করে কেন্দ্রীয় সরকারের পরিচালনার জন্য একটি নির্দিষ্ট লেভি বা অংশ দেওয়ার এক অনন্য স্বনির্ভর অর্থনৈতিক মডেল দাঁড় করানো হয়। আর সর্বশেষ তথা ষষ্ঠ দফায় ছিল সবচেয়ে দূরদর্শী ও কৌশলগত দাবি, যেখানে পূর্ব পাকিস্তানের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য আধা-সামরিক বাহিনী বা মিলিশিয়া গঠনের রূপরেখা দেওয়া হয়, যা বাঙালিদের নিজেদের সুরক্ষার প্রশ্নে এক অপরাজেয় আত্মবিশ্বাস ও সার্বভৌম মনস্তত্ত্বের ভিত্তি তৈরি করেছিল। এই ছয় দফা কোনো আকস্মিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না, এর পেছনে ছিল দীর্ঘ আঠারো বছরের সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক বঞ্চনার এক নিখুঁত খতিয়ান। রেহমান সোবহান, নূরুল ইসলাম ও আনিসুর রহমানের মতো তৎকালীন প্রথিতযশা বাঙালি অর্থনীতিবিদদের তৈরি ‘দুই-অর্থনীতি তত্ত্ব’ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পদ পাচারের যে অকাট্য রূপরেখা হাজির করেছিল, ছয় দফা ছিল তারই এক সাহসী রাজনৈতিক জবাব। তৎকালীন পাকিস্তানের পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল হকও তাঁর এক ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে স্বীকার করেছিলেন যে, দেশের সিংহভাগ জাতীয় সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানের নির্দিষ্ট ‘২২ পরিবারের’ হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। পূর্ব বাংলার সোনালী আঁশ পাট আর চামড়া বিক্রি করে অর্জিত সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় আশি শতাংশই ব্যয় হতো করাচি, লাহোর বা ইসলামাবাদের আধুনিকায়নে, অথচ সমস্ত প্রধান প্রধান আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সদর দফতর সেখানে থাকায় পূর্ব বাংলার নিজস্ব পুঁজি গঠনের কোনো সুযোগই ছিল না। এই সুগভীর অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ বন্ধ করতেই বঙ্গবন্ধু তাঁর মুদ্রানীতি ও রাজস্ব সংক্রান্ত দফায় দুই অঞ্চলের জন্য দুটি পৃথক মুদ্রা কিংবা একটিই মুদ্রা ব্যবস্থার অধীনে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক রিজার্ভ ব্যাংকের দাবি তোলেন। কর আদায়ের এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের একক ও পূর্ণ ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করার যে অকাট্য প্রস্তাব তিনি করেছিলেন, তা ছিল মূলত পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক শোষণের পথ বন্ধ করার এক নিখুঁত অর্থনৈতিক অস্ত্র। অর্থনৈতিক বঞ্চনার এই বলয়ের সাথে যুক্ত হয়েছিল এক গভীর সামরিক ও নিরাপত্তা সংকট, যা ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় অত্যন্ত নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। সেই ১৭ দিনের যুদ্ধে কাশ্মীর সীমান্ত রক্ষা করতে গিয়ে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা পূর্ব অঞ্চলের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত এবং ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল, যেখানে এই বিশাল ভূখণ্ডের নিরাপত্তার জন্য মাত্র এক ডিভিশন সৈন্য ছাড়া আর কোনো কার্যকর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ছিল না। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কুর্মিটোলা সেনানিবাসের ১৪তম ডিভিশনের কমান্ডিং অফিসার মেজর জেনারেল মুজাফফর উদ্দিনের সেই ঐতিহাসিক ও নিষ্ঠুর উক্তি বাঙালিদের চোখ খুলে দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, “পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের যুদ্ধক্ষেত্রে।” এই চরম সামরিক বৈষম্য ও ভৌগোলিক নিরাপত্তাহীনতার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে বঙ্গবন্ধু তাঁর ষষ্ঠ দফায় পূর্ব পাকিস্তানের নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য মিলিশিয়া বা আধা-সামরিক বাহিনী গঠনের দাবি জানান। এটি কেবল একটি সাধারণ সামরিক দাবি ছিল না, বরং এটি ছিল বাঙালিদের নিজস্ব প্রতিরক্ষাবলয় গড়ে তোলার এক কৌশলগত রাজনৈতিক চাল, যা পশ্চিম পাকিস্তানি জেনারেলদের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। লাহোর থেকে ফিরে বঙ্গবন্ধু যখন এই মুক্তির সনদ নিয়ে দেশের মানুষের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছিলেন, তখন প্রথম দিকে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির একটি বড় অংশ এই দাবির চরম সাহসিকতা দেখে কিছুটা দ্বিধান্বিত ছিলেন। কিন্তু দূরদর্শী নেতা মফস্বলের বিস্তূর্ণ জনপদে, হাটে-বাজারে ঘুরে সাধারণ মানুষকে যখন সহজ ভাষায় বোঝালেন যে এটি তাদের ভাতের ও বাঁচার দাবি, তখন এই আন্দোলন উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে একটি মাঠপর্যায়ের গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এই প্রচারণায় তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকা অনন্য বুদ্ধিবৃত্তিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল, যা নিয়মিত সম্পাদকীয় ও খবরের মাধ্যমে ছয় দফাকে বাঙালির ঘরে ঘরে মনস্তাত্ত্বিক এজেন্ডায় পরিণত করে এবং পরবর্তীতে আইয়ুব সরকারের চরম কোপানলে পড়ে নিষিদ্ধ হয়। আইয়ুব খানের সেই “অস্ত্রের ভাষার” হুমকির জবাবে বঙ্গবন্ধু পল্টনের ঐতিহাসিক জনসভায় গর্জে উঠে বলেছিলেন, “বন্দুক-কামানের ভাষা আমরা চিনি। বাংলার মানুষ এবার নিজের ভাষা তথা ভাতের ও বাঁচার ভাষায় জবাব দেবে।” এতে ভীতসন্ত্রস্ত আইয়ুব সরকার ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস প্রয়োগ করে বঙ্গবন্ধুকে একের পর এক মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে মাত্র তিন মাসে আটবার গ্রেফতার করে। কিন্তু ততদিনে এই স্ফুলিঙ্গ অবদমিত চেতনার দেয়াল ভেঙে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলার প্রতিটি ঘরে, যার ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালের ১৩ মে আওয়ামী লীগের পল্টন জনসভা থেকে ৭ জুন দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতালের ডাক দেওয়া হয়। সেদিন ৭ জুনের সকালটি ছিল এক অভূতপূর্ব গণজাগরণের সাক্ষী, যেখানে ঢাকা, টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জের রাজপথ সিক্ত হয়েছিল মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হকসহ এগারো জন বীর বাঙালির তপ্ত রক্তে। এই হরতালের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বাংলার মেহনতি শ্রমজীবী শ্রেণি। টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ ও পোস্তগোলার শিল্পাঞ্চলসহ আদমজী জুট মিলের হাজার হাজার শ্রমিক স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ বন্ধ করে রাজপথে নেমে আসেন। পাশাপাশি তৎকালীন নেত্রী আমেনা বেগমের সাহসী ও সুসংগঠিত নেতৃত্বে ঢাকার রাজপথে নারীদের অভূতপূর্ব ও স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল স্বাধিকার আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় পিকেটিং করার সময় পুলিশ ও ইপিআর-এর গুলিতে শহীদ হন সাধারণ স্কুটার চালক মনু মিয়া। তাঁর এই বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ আন্দোলনকে এক নতুন গতি দেয় এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শহীদদের স্মরণে ও তাদের পরিবারের সহায়তার জন্য ঐতিহাসিক ‘মনু মিয়া ফান্ড’ গঠন করা হয়, যা রাজনৈতিক আন্দোলনে মেহনতি মানুষের প্রতি দলের মমত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বৈরাচারী সরকার সান্ধ্য আইন জারি করে এবং রাতে হাজার হাজার আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করে আন্দোলন স্তব্ধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু কলকারখানার মেহনতি শ্রমিক আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-জনতার সেই দৃঢ় সংকল্প প্রমাণ করেছিল যে, স্বৈরাচারী শাসন কখনো জাগ্রত জনআকাঙ্ক্ষাকে পরাজিত করতে পারে না। শহীদের রক্তে ভেজা সেই রাজপথ বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনকে এক নতুন ও চূড়ান্ত স্বাধীনতার মাত্রায় উন্নীত করে। এই গৌরবোজ্জ্বল ও ত্যাগের দিনলিপি বঙ্গবন্ধুর নিজের স্মৃতিকথা ও সমকালীন রোজনামচাতেও গভীর মমতায় ফুটে উঠেছে। এই আন্দোলনের গভীরতা ও তীব্রতা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। লন্ডনের বিখ্যাত ‘দ্য টাইমস’ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ তাদের তৎকালীন প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল যে, ছয় দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা তাদের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র গঠনের ইচ্ছাকে স্পষ্ট দর কষাকষির পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। ইতিহাসের কালপঞ্জি ও কার্যকারণ সম্পর্ক লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ৭ জুনের এই রক্তঝরা পথ ধরেই পরবর্তী ইতিহাস নির্মিত হয়েছে অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক, আইনি ও যৌক্তিক ধাপে ধাপে। ছয় দফাভিত্তিক গণজোয়ারকে রুখতে গিয়ে পাকিস্তানি শাসকেরা যখন বঙ্গবন্ধুকে ১ নম্বর আসামি করে এবং তাঁর সাথে আরও ৩৪ জন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাসহ মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ (যার আনুষ্ঠানিক নাম ছিল: রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য) দায়ের করল, তখন তা হিতে বিপরীত হয়ে ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পতন ঘটায়। ঊনসত্তরের সেই গণবিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু যখন কারামুক্ত হয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ ও বাঙালির অবিসংবাদিত নেতার আসনে অধিষ্ঠিত হন, তখন এই ছয় দফা আর কেবল একটি দলের রাজনৈতিক ইশতেহার ছিল না, তা হয়ে উঠেছিল সমগ্র বাঙালি জাতির বেঁচে থাকার একমাত্র আইনি সনদ। যার চূড়ান্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিফলন ঘটে ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে, যেখানে বাঙালি জাতি ছয় দফাকে গণভোটের মর্যাদায় রূপান্তর করে আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয়ী করে এই সনদকে একটি অলঙ্ঘনীয় আইনি বৈধতা দান করে। নির্বাচনে অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনের পরও যখন সামরিক জান্তা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়, তখনই নিয়মতান্ত্রিক ও যুক্তিনির্ভর ছয় দফা স্বাধিকারের গণ্ডি পেরিয়ে এক দফায় রূপ নেয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের সেই মহাকাব্যিক বজ্রকণ্ঠের ঘোষণা এবং ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তার মূল জ্বালানি ও আইনি যৌক্তিকতা সরবরাহ করেছিল ১৯৬৬-এর এই ঐতিহাসিক ছয় দফা। রক্তক্ষয়ী ৯ মাসের যুদ্ধ এবং ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর যে লাল-সবুজের পতাকার জন্ম হলো, তা আসলে ৭ জুনের শহীদের রক্তের অক্ষরে লেখা ঐতিহাসিক সনদেরই এক চূড়ান্ত, নান্দনিক ও সার্বভৌম ফসল। এই সুদীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের চুলচেরা ইতিহাস ও রাজনৈতিক পরিক্রমা আজ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদ। আজ দীর্ঘ সময় পেরিয়ে আমরা যখন একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের মুখোমুখি, তখন ইতিহাসের ধুলোবালি পেরিয়ে এই ছয় দফা আমাদের সামনে এক নতুন ও শানিত প্রাসঙ্গিকতায় উদ্ভাসিত হয়। ছয় দফা কেবল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আইনি ভিত্তিই ছিল না, বরং তা ছিল একটি স্বনির্ভর ও স্বশাসিত জাতিসত্তা বিনির্মাণের চিরন্তন রক্ষাকবচ। বর্তমান বাংলাদেশের সমসাময়িক উন্নয়ন অভিযাত্রায় অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, আঞ্চলিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ১৯৬৬ সালের এই মুক্তির সনদ আজও সমভাবে পথপ্রদর্শক। ৭ জুনের আত্মদান ও ছয় দফার মূল চেতনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের সার্বভৌমত্ব কেবল ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়, তা নিহিত থাকে নাগরিকের অর্থনৈতিক মুক্তি ও মনস্তাত্ত্বিক আত্মবিশ্বাসের মেলবন্ধনে। ইতিহাসের গৌরব আর আগামীর সমৃদ্ধির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা তাই আমাদের জাতীয় বিকাশের এক শাশ্বত এবং চির অনির্বাণ আলোকবর্তিকা। 📌 বাহাউদ্দিন গোলাপ, সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। |
||

