" />
AmaderBarisal.com Logo

তজুমদ্দিনের চরের ১০ স্কুলে হয় না পাঠদান, শ্রেণিকক্ষে বসে মাদকের আসর


আমাদেরবরিশাল.কম

২৩ June ২০২৬ Tuesday ৫:১৩:৩৮ PM

তজুমদ্দিন ((ভোলা) প্রতিনিধি:

শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতি ও কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবসহ নানামুখী সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে ভোলার তজুমদ্দিনের মেঘনা নদীর মধ্যবর্তী চরাঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম। দুটি চরের ১০টি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা স্কুলে যান কালেভদ্রে।

চলতি শিক্ষাবর্ষের গত ৬ মাসে একদিনও পাঠদান হয়নি এমন প্রতিষ্ঠানও রয়েছে এর মধ্যে। কোথাও আবার স্কুল ভবন দখল করে চলছে অসামাজিক কর্মকাণ্ড, কোনোটি আবার ব্যবহার হচ্ছে আবাসিক ঘর হিসেবে। এতে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে ওই চরের প্রায় ৮০০ শিশুর শিক্ষাজীবন। ফলে চরাঞ্চলের অভিভাবকদের মনে তীব্র উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) তজুমদ্দিনের বিভিন্ন চর ঘুরে প্রাথমিক শিক্ষার এমন বেহাল চিত্র দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে এমন অবস্থা চলমান থাকলেও এসবের কিছুই জানেন না জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার। তবে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়ার গতানুগতিক আশ্বাস দিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

৬ মাসেও হয়নি কোনো পাঠদান

তজুমদ্দিন উপজেলার মেঘনার মধ্যবর্তী নাগর পাটোয়ারীর চরের পূর্ব বিশারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ৭৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। গত ১১ জুন বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, দফতরী মো. কবির ছাড়া সেখানে আর কেউ নেই। কাগজপত্রে একজন মাত্র শিক্ষক থাকলেও চলতি বছরের বিগত ৬ মাসে একদিনও পাঠদান হয়নি এই স্কুলে। বিদ্যালয়ের একমাত্র শিক্ষক মো. বাবলু প্রশাসনিক কাজে মাঝে মধ্যে স্কুলে আসলেও কোনো ক্লাস নেন না।

ওই স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী রিপা (রোল নং ১) জানায়, চলতি বছরের ১১ জুন পর্যন্ত সে একদিনও পাঠদান পায়নি। কারণ হিসেবে ওই শিক্ষার্থী উল্লেখ করে, শিক্ষকরা ক্লাসে আসেন না। একই তথ্য জানায় দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তামান্না বেগমও। ক্লাস না হওয়ায় তারা দিন দিন স্কুলে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

অভিভাবক ও ব্যবসায়ী নোমান হাওলাদার বলেন, ‘স্কুলে কোনো ক্লাস হয় না। একজন মাত্র শিক্ষক, তিনি মাঝে মাঝে স্কুলে এসে মিডডে মিলের রুটি ও ডিম নিয়ে যান। ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তির বিষয়ে কোনো কার্যক্রম নেই। চলতি বছরে কোনো ক্লাসই হয়নি।’ 

মো. ফিরোজ নামের অপর এক অভিভাবক জানান, শিক্ষকদের গাফিলতির কারণে অনেক শিশুই স্কুলে আসে না। তাদেরকে স্কুলমুখী করার কোনো উদ্যোগও নেই শিক্ষকদের। ক্লাস না করলেও স্কুলের শিক্ষক মো. বাবলু মাঝে মাঝে আসেন শুধু ডিম ও রুটি ভাগ করার জন্য। স্থানীয়দের চাপের মুখে সেই ডিম-রুটি মাঝে মধ্যে পাশের মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয় বলে জানান উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা।

তবে স্কুলে উপস্থিত না থাকার বিষয়ে শিক্ষক মো. বাবলু বলেন, ‘উপজেলা শিক্ষা অফিসে কাজ থাকায় যথাসময়ে উপস্থিত হতে পারিনি।’

স্কুল ভবন দখল করে জলদস্যুদের আস্তানা ও মাদক সেবন

চর মোজাম্মেলের মুক্তিযোদ্ধা বাজার সংলগ্ন পশ্চিম রামদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে একটি ভবনে কোনোমতে শ্রেণি কার্যক্রম চলছে। তবে দোতলা অপর ভবনটি দখল করে দিনে-রাতে নানা অপকর্ম পরিচালনা করছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। মেঘনার কুখ্যাত জলদস্যু ছালাউদ্দিন ডাকাত ওই ভবনে আস্তানা গেড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

শিক্ষা সংক্রান্ত সরঞ্জামের পরিবর্তে সেখানে খাট-চৌকি বসিয়ে বসবাস করছে অবৈধ দখলদাররা। দিন-রাতে সেখানে চলে আড্ডাবাজি ও মাদক সেবনের মতো অপকর্ম। আর ভবনের নিচতলার রুমগুলো ব্যবহার হচ্ছে মাছ ধরার জাল রাখার গোডাউন হিসেবে। স্কুল ভবন দখল হওয়ার বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ‘গত ২৬ এপ্রিল বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। পরবর্তী ব্যবস্থা যথাযথ কর্তৃপক্ষ নেবেন।’

শ্রেণিকক্ষ যখন আবাসিক বাসা

পার্শ্ববর্তী চর মোজাম্মেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ব্যবহার হচ্ছে পুরোপুরি আবাসিক বাসা হিসেবে। সেখানে টেলিভিশন ও ফ্রিজের মতো আধুনিক সরঞ্জাম নিয়ে বসবাস করছেন কয়েকজন। সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের দোতলার একটি কক্ষে খাট-চৌকি বসিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ৭-৮ জন লোক বসবাস করছেন।

নিজেদেরকে ওই এলাকার হাইস্কুলের শিক্ষক দাবি করে মো. ছালেক আহমেদ ও আল আমিন নামের দুই ব্যক্তি বলেন, ‘দুর্গম এলাকায় নিরাপদ থাকার বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় আমরা স্কুলের কক্ষটি ব্যবহার করছি।’ তবে শ্রেণিকক্ষে এভাবে বসবাস করা অনুচিত বলে স্বীকার করে তারা জানান, বাধ্য হয়েই তাদের এখানে থাকতে হচ্ছে। এই স্কুলের আরেকটি কক্ষে থাকছেন খোদ প্রাইমারি শিক্ষকরাই।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুমন চন্দ্র দাস জানান, ‘আমার যোগদানের আগে থেকেই পার্শ্ববর্তী হাই স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক আবাসিক হিসেবে একটি শ্রেণিকক্ষ ব্যবহার করছেন।’ এই স্কুলে ১১৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য চারজন শিক্ষক পদায়ন করা হলেও সরেজমিনে একমাত্র সুমন চন্দ্র দাসকেই পাওয়া গেছে। তিনি আরও জানান, বাকি তিনজনের মধ্যে একজন ডেপুটেশনে অন্য স্কুলে দায়িত্ব পালন করছেন, একজন পিটিআইতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন এবং অন্যজন ছুটিতে আছেন।

খুপরি টিনের ঘরে প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে পাঠদান

মেঘনার ভাঙনে মূল ভবন বিলীন হয়ে যাওয়ায় মোহাম্মদ ভেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নতুন করে স্থাপন করা হয়েছে চর লাদেনে। ছোট তিন রুমের একটি খুপরি টিনের ঘরে চলে ৬৬ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান। শ্রেণিকক্ষে আলো-বাতাসের কোনো সুব্যবস্থা নেই। স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রনি কর্মকার জানান এই দুর্দশার কথা। তারা মাত্র দুজন শিক্ষক কর্মরত আছেন; ফলে একজন ছুটিতে গেলে অপরজনকে একাই সামলাতে হয় পুরো স্কুল। এলাকায় কোনো রাস্তাঘাট নেই, ফলে ঝড়-বাদলে জীবন ঝুঁকি নিয়ে থাকতে হয়। পাঠদানের ন্যূনতম পরিবেশ না থাকলেও বাধ্য হয়ে কোনোমতে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

অন্যদিকে, ৭৯ নং চর জহির উদ্দিন রেডক্রিসেন্ট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চলছে খোলা মাঠের মধ্যে খুপড়ির মতো আরেকটি টিনের ঘরে। সেখানে বর্ষার ঝড়-বাদলে জীবন ঝুঁকি নিয়ে চলে পাঠদান। সরেজমিনে দেখা যায়, মো. শাকিল নামের এক তরুণ ক্লাস নিচ্ছেন। তিনি জানান, ওই স্কুলের একমাত্র মূল শিক্ষক রকিবুল ইসলাম তাকে সম্মানীর বিনিময়ে ক্লাস করানোর জন্য ‘পক্সি শিক্ষক’ হিসেবে রেখেছেন। স্থানীয়রা জানান, শাকিল মূলত স্কুলটি সচল রেখেছেন, মূল শিক্ষক রকিবুল ইসলাম মাঝে মধ্যে আসেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য তছলিম উদ্দিন পটোয়ারী জানান, শিক্ষক ও ভবন সংকটের কারণে চরের শিশুদের শিক্ষাজীবন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব নয়। এ জন্য তিনি জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষক পদায়ন ও একটি পাকা ভবনের দাবি জানান। এছাড়া সাম্প্রতিক ঝড়ে বিধ্বস্ত চর জহির উদ্দিন মরিয়ম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামমাত্র কার্যক্রম চলছে পাশের একটি মক্তবে।

সরেজমিনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই চরের প্রতিটি স্কুলের চিত্রই একই রকম। কর্মরত শিক্ষকরা আসেন তাদের ইচ্ছামাফিক। কিছু স্কুল চলে প্রক্সি শিক্ষক দিয়ে, আবার কিছু স্কুলে ক্লাসই হয় না। শিক্ষা বিভাগের কোনো তদারকি নেই, দুই-চার বছরেও একবার চরে আসেন না শিক্ষা কর্মকর্তারা।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

তজুমদ্দিন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. রিয়াজ আলম জানান, মেঘনার মাঝের চর মোজাম্মেল ও চর জহির উদ্দিনে মোট ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫৯টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৯ জন শিক্ষক। অর্থাৎ শূন্য পদের সংখ্যা ৩০টি। আর মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭৬৬ জন। তিনি আরও জানান, দুর্গম এলাকা হওয়ায় সবসময় তদারকি করা সম্ভব হয় না। যদিও শিক্ষক সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

স্কুল ভবন দখলের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি প্রথমে অস্বীকার করলেও পরবর্তীতে তিনি জানান, তিনি নতুন যোগদান করেছেন এবং এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে সেখানে একটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) সাথে কথা হয়েছে।

স্কুল ভবন দখলের বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আমিনুল ইসলামও কিছু জানেন না বলে দাবি করেন। এ ঘটনা তিনি এই প্রতিবেদকের কাছ থেকেই প্রথম শুনেছেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্য কোনো সমস্যা থাকলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সহযোগিতা নেয়ার জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে নির্দেশ দেয়া হবে। উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে লিখিত জানানোর পরও কেন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, সেই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে।’

শিক্ষক সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন শিক্ষক নিয়োগ হলে চরাঞ্চলে পদায়ন করা হবে।’ বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত শিক্ষকদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মাসের পর মাস শিক্ষক অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে দুই-একটি অভিযোগ এসেছে। উপজেলা শিক্ষা অফিসারের প্রতিবেদন পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

উল্লেখ্য, দেশের একমাত্র দ্বীপজেলা ভোলার দুর্গম চরাঞ্চলে মোট ৪৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যার মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৮ হাজার ৫২১ জন।



সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার    সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০। ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।