" />
AmaderBarisal.com Logo

দক্ষিণাঞ্চলে বেহাল ১১ শতাধিক কমিউনিটি ক্লিনিক, কোনোটাতে বাস করে সাপ


আমাদেরবরিশাল.কম

৭ July ২০২৬ Tuesday ৫:২১:০২ PM

বিশেষ প্রতিনিধি:

বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলেই মুখ থুবড়ে পড়েছে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান মাধ্যম কমিউনিটি ক্লিনিক। বিভাগের এক হাজারের বেশি ক্লিনিকের এখন বেহাল দশা। কোথাও জরাজীর্ণ ভবন, কোথাও আবার ঝোপঝাড়ে বাসা বেঁধেছে বিষধর সাপ। এছাড়া ন্যূনতম তদারকির অভাব ও ওষুধ সংকট নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার সরকারি উদ্যোগটি পুরোপুরি ভেস্তে যেতে বসেছে।

কাগজে সচল, বাস্তবে পরিত্যক্ত 

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, বরিশাল বিভাগে মোট কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা ১ হাজার ১১৭টি। যার একটি বৃহৎ অংশ বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অথচ সরকারি নথিতে এগুলোর অধিকাংশই সচল হিসেবে দেখানো হচ্ছে; যার বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।

সরেজমিনে দেখা যায়, বরিশাল নগরীর কাশিপুরের ইছাকাঠি কমিউনিটি ক্লিনিকটি দেখতে পরিত্যক্ত ভবনের মতো মনে হয়। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে, বৃষ্টি হলে পানি জমে থাকে, আর মাসের পর মাস নেই বিদ্যুৎ। এর সাথে যুক্ত হওয়া ওষুধ সংকটের মাঝেই ঝুঁকি নিয়ে চলছে এখানকার স্বাস্থ্যসেবা।

ইছাকাঠি এলাকার বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকার ক্লিনিক দিছে সুবিধার জন্য, যাতে ঘরের কাছে চিকিৎসা পাই। কিন্তু এখানে আসলে ছোটখাটো দুই-একটা বড়ি ছাড়া কোনো ওষুধ পাওয়া যায় না। ভাঙাচোরা ঘরে ঝুঁকি নিয়ে বসতে হয়। সেবা নিতে এসে উল্টো আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’

একই এলাকার ভুক্তভোগী নারী মোসাম্মৎ রেহানা বেগম বলেন, ‘বাচ্চাটারে নিয়ে আইছিলাম কাশির ওষুধ আর পরামর্শের জন্য। ডাক্তার (সিএইচসিপি) তো বসেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র নাই। বেশির ভাগ ওষুধই আমাদের বাইরে থেকে কিনতে হয়। এই ক্লিনিক এখন নামেই আছে, কাজে নেই।’

ক্লিনিকে সাপের বাসা, আতঙ্কে সেবাদান ব্যাহত 

সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বিভাগের ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের করুয়াকাঠি কমিউনিটি ক্লিনিকের। মাত্র কয়েক মাস আগে এখানে অফিস চলাকালেই দফায় দফায় বিষধর সাপ বেরিয়ে এলে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বাথরুম, মেঝেসহ ক্লিনিকটির বিভিন্ন স্থানে সাপের বাসার সন্ধান মেলে। এখনও কাটেনি সেই সাপের আতঙ্ক।

এ বিষয়ে করুয়াকাঠি কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) মারজিয়া খানম বলেন, ‘এখানে কাজ করা এখন জীবনের ঝুঁকি নেয়ার মতো। অফিসের মধ্যে কখন কোথা থেকে সাপ বেরিয়ে আসে, সেই আতঙ্কে তটস্থ থাকতে হয়। বাথরুম বা মেঝেতে সাপের বাসা থাকায় আমরা এবং রোগীরা কেউ নিরাপদ বোধ করছি না। এই অবস্থায় সেবা দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’

বিশ বছর আগে যাত্রা শুরু করা ঝালকাঠির মোট ৯৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রায় সবগুলোরই একই অবস্থা। গ্রামের বনজঙ্গল ঘেরা নিচু জমিতে ক্লিনিকগুলোর ভবন নির্মাণের পর আর কোনো বড় ধরনের সংস্কার হয়নি। ফলে ঝোপঝাড় আর সাপ আতঙ্কেই কাটে গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা।

তদারকির অভাব ও দায়িত্বে অবহেলা 

এদিকে উপকূলঘেঁষা বরগুনা জেলার চিত্র আরও হতাশাজনক। শনিবার (৪ জুলাই) সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও সদর উপজেলার খাজুরতলা কমিউনিটি ক্লিনিক তালাবদ্ধ দেখা যায়।

নাম প্র‍কাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা জানান, ‘কোনো প্রকার তদারকি না থাকায় সিএইচসিপি সঙ্গীতা নিজের ইচ্ছামতো এই ক্লিনিক খোলেন এবং বন্ধ করেন।’

একই অবস্থা পার্শ্ববর্তী বদরখালী ইউনিয়নের কমিউনিটি ক্লিনিকেরও। গত বৃহস্পতিবারও বন্ধ ছিল এই ক্লিনিকটি। এতে করে চিকিৎসাসেবা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।

অনিয়মিত ক্লিনিক খোলার বিষয়ে খাজুরতলা কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি সঙ্গীতা মুঠোফোনে জানান, ‘ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কিছু জরুরি সমস্যার কারণে মাঝে মাঝে ক্লিনিকে পৌঁছাতে দেরি হয়। তবে নিয়মিতই সেবা দেয়ার চেষ্টা করি। স্থানীয়দের অভিযোগ পুরোপুরি সঠিক নয়।’

কর্তৃপক্ষের আশ্বাস 

বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মো. আবুল ফাত্তাহ বলেন, ‘জেলার যে সকল কমিউনিটি ক্লিনিক জরাজীর্ণ রয়েছে, তাদের মধ্যে কিছু সংস্কার করেছে বেসরকারি এনজিওগুলো।’ পাশাপাশি দায়িত্ব অবহেলার বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানান তিনি।

ঝালকাঠির সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ হুমায়ূন কবির বলেন, ‘ঝালকাঠির বেশ কিছু ক্লিনিকের ভবন জরাজীর্ণ এবং নিচু এলাকায় হওয়ায় কিছু সমস্যা হচ্ছে। জরাজীর্ণ এসব ক্লিনিকগুলো দ্রুত সংস্কার এবং ওষুধ সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য আমরা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে আবেদন জানিয়েছি। আশা করছি দ্রুতই বরাদ্দ পাওয়া যাবে।’

প্র‍ান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর সামগ্রিক অচলাবস্থা ও সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ লোকমান হাকিম বলেন, ‘অনেক জায়গায় সমস্যা রয়েছে। তবে সেবার মান বাড়াতে সরকারের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। গ্রামীণ জনপদের এই স্বাস্থ্যসেবা যাতে কোনোভাবেই ভেস্তে না যায়, সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’



সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার    সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০। ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।