" />
AmaderBarisal.com Logo

ডেঙ্গু আক্রান্তে বরিশাল বিভাগে শীর্ষে পিরোজপুর


আমাদেরবরিশাল.কম

১৩ August ২০২৬ Thursday ৩:১৮:৩৬ PM

পিরোজপুর প্রতিনিধি:

পিরোজপুরে কমছেই না ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। গত আট মাসে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ১,২৮৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন, যা বরিশাল বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। ডেঙ্গু আক্রান্তের দ্বিতীয় অবস্থানে আছে পিরোজপুরের পাশের জেলা ঝালকাঠি।

পিরোজপুরে ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত একজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১,২১৭ জন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৬৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ২৩ জন, নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৬ জন, নেছারাবাদে ১৪ জন, কাউখালীতে ৮ জন, ভান্ডারিয়ায় ১১ জন এবং মঠবাড়িয়ায় ৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। ইন্দুরকানি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নেই।

গত আট মাসের হাসপাতালভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি ৫৯৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন পিরোজপুর সদর হাসপাতালে। এ ছাড়াও নাজিরপুরে ৭৮, নেছারাবাদে ২১৬, কাউখালীতে ৯৬, ভান্ডারিয়ায় ২৪২ এবং মঠবাড়িয়ায় ৫৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

এদিকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। হাসপাতালের সীমিত জায়গার কারণে ডেঙ্গু ও সাধারণ রোগীদের কাছাকাছি অবস্থান করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনরা। তারা ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড বা কক্ষের দাবি জানিয়েছেন।

ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়া এক রোগীর বাবা মো. মারুফ হাওলাদার বলেন, আমার মেয়েকে গত রোববার নিয়ে আসছি পিরোজপুর সদর হাসপাতালে, এখানে পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারছি ডেঙ্গু হইছে। চিকিৎসা সেবা আলহামদুলিল্লাহ ভালোই পাইছি। বর্তমানে রোগই সুস্থ আছে। তবে হাসপাতালে রোগী অনেক বেশি। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা রুমের ব্যবস্থা করলে ভালো হতো।

পেটে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রুমনা বেগম বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের যে মশা কামড় দিয়েছে, সেটা যদি আমাকে কামড়ায় তাহলে আমিও ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হতে পারি। আমি এসেছি পেটে ব্যথা নিয়ে, পরে দেখা যাবে ডেঙ্গু নিয়ে বাসায় ফিরতে হবে। এখানে সেবা ভালোই পেয়েছি, এখন মোটামুটি সুস্থ। তবে একই জায়গায় অনেক রোগী। ডেঙ্গুর জন্য আলাদা কক্ষ, হাম রোগীর জন্য আলাদা কক্ষ এবং সাধারণ রোগীদের জন্য আলাদা কক্ষ থাকলে ভালো হতো।

সরেজমিনে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ডেঙ্গু রোগীদের অনেকেই মশারি ব্যবহার করছেন না। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে নার্সদের নির্দেশনায় দ্রুত মশারি টানিয়ে দেন কয়েকজন রোগী। 

এ বিষয়ে হাসপাতালের এক নার্স জানান, রোগীদের বারবার মশারি ব্যবহারের জন্য বলা হলেও অনেকেই তা খুলে রাখেন।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন মোহাম্মদ ইয়াসিন বলেন, সাংবাদিকরা আসার পর মশারিগুলো টানানো হয়েছে। এতক্ষণ মশারি টানানো ছিল না। দেখলে বোঝাই যায় না কে ডেঙ্গু রোগী আর কে সাধারণ রোগী। ডেঙ্গু রোগীকে যে মশা কামড় দিয়েছে, সেই মশা যদি আমাদের রোগীকে কামড়ায় তাহলে আমাদের রোগীরও ডেঙ্গু হতে পারে। আমাদের পাশে যে ভবন হয়েছে, সেখানে সাধারণ ও ডেঙ্গু রোগীদের আলাদা জায়গার ব্যবস্থা করা হোক।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছে, পাশাপাশি অন্যান্য রোগে আক্রান্ত রোগীরাও একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এতে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হচ্ছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের।

পিরোজপুর সদর হাসপাতালের মেডিকেল কনসালট্যান্ট সুরঞ্জিত সাহা বলেন, এ বছর ডেঙ্গু রোগীর চাপ কমছেই না। আমরা আশা করেছিলাম রোগীর চাপ কিছুটা কমে যাবে, কিন্তু প্রতিনিয়ত রোগী আসছে। একজন রোগী ভর্তি হলে তার চিকিৎসা সম্পন্ন করতে পাঁচ থেকে ছয় দিন সময় লাগে। এর মধ্যে নতুন রোগী আসে, পাশাপাশি অন্যান্য রোগীরাও ভর্তি হচ্ছে। ফলে এখন রোগীর চাপ অনেক বেশি।

তিনি বলেন, আগে আমাদের পাশের জেলা বাগেরহাটের বাদাল এলাকা থেকে বেশিরভাগ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হতো। বর্তমানে পিরোজপুরের বিভিন্ন জায়গা থেকেও রোগী ভর্তি হচ্ছে। 

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সুরঞ্জিত সাহা বলেন, ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে হলে সচেতন হতে হবে। ঘুমানোর আগে অবশ্যই মশারি নিয়ে ঘুমাতে হবে। বাড়ির আশপাশে কোথাও পানি জমে আছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যেসব জায়গায় পানি জমে থাকে, সেখান থেকেই মশা উৎপন্ন হয়। সেগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

সচেতন মহলের মতে, ডেঙ্গু রোগী বাড়ার পেছনে অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ভাঙা রাস্তার আশপাশে পানি জমে থাকা এবং মানুষের অসচেতনতা অন্যতম কারণ। 

পিরোজপুর পৌরসভার বাসিন্দা জালিস মাহমুদ বলেন, পিরোজপুরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা অতটা ভালো নয়। ময়লা জমে থাকে, রাস্তার আশপাশে অনেক জায়গায় পানি জমে থাকে। এ ছাড়া সচেতনতারও অভাব রয়েছে। মানুষজন তার আশপাশ পরিষ্কার করে না। অনেক সময় ফুলের টবে পানি জমে থাকে, বাসার আশপাশের গর্তেও পানি জমে থাকে। এসব জায়গা পরিষ্কার করা উচিত। তাহলে ক্ষতি কমানো সম্ভব।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে কাজ করছে পিরোজপুর পৌরসভা ও জেলা পরিষদ। পিরোজপুর পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা বনি আমিন বলেন, আমরা নিয়মিত মশার লার্ভা নিধনের জন্য স্প্রে করছি, এটি আরও জোরদার করা হবে যেহেতু বর্ষাকাল এসেছে, আর ডেঙ্গুর প্রকোপটা এখন অনেকটাই বেশি। এর জন্য আসলে জনগণকে সচেতন হতে হবে, ডেঙ্গু তো মূলত পরিষ্কার পানিতে জন্মায়, ডাবের খোসা, কনস্ট্রাকশনের জায়গায়, ফুলের টবে পানিতে ডেঙ্গু মশা উৎপন্ন হয়, আমরা জনগণকে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছি। সামনে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আরও জোরদারভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কাজ করবো আমরা।

পিরোজপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন বলেন, পিরোজপুরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ রোধে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পুকুর, ডোবা ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার ড্রেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশের এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, বৃক্ষরোপণসহ ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

পিরোজপুরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জেলার সিভিল সার্জন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, পিরোজপুর জেলার পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে আইইডিসিআর ইনভেস্টিগেশন টিমের জন্য অনুরোধ করেছিলাম। পরিচালক মহোদয় একটি টিম পাঠিয়েছেন। তারা ইতিমধ্যে একদিন কাজ করেছে, প্রথম দিনের রিপোর্টে তারা আমাকে বলেছে সুপারি গাছের গোড়া ও নারিকেল গাছের গোড়ায় পানি জমা, এবং বিভিন্ন নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ে জমে থাকা পানি থেকে ডেঙ্গু উৎপন্ন হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে জনগণের সচেতনতা কিছুটা কম। তাদের ইনভেস্টিগেশন সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার পর তারা যে নির্দেশনা দেবে, সে অনুযায়ী আমরা কাজ করবো। এ ছাড়া আমরা জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত কাজ করছি। যারা ডেঙ্গু রোগী হিসেবে ভর্তি হচ্ছেন, তাদের ভালো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি এবং সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করছি।



সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার    সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০। ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।