" />
AmaderBarisal.com Logo

৩২ বছর পর পরিবারের সন্ধান পেয়েছেন পাকিস্তানে পাচার হওয়া বরগুনার আছিয়া


আমাদেরবরিশাল.কম

১৩ August ২০২৬ Thursday ৫:৩০:৪৪ PM

বরগুনা প্রতিনিধি:

১৬ বছর বয়সে ঢাকা থেকে পাকিস্তানে পাচার হয়ে যান বরগুনার মেয়ে আছিয়া। এরপর কেটে গেছে তিন দশকেরও বেশি সময়। পরিবারের কেউ জানতেন না তিনি কোথায় আছেন, বেঁচে আছেন কি না।

সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে পাকিস্তানে থাকা সেই আছিয়ার সন্ধান পেয়েছে পরিবার। এখন সাত সন্তানের জননী আছিয়া ফিরতে চান ৯০ বছর বয়সি বাবার কাছে। দেশে ফিরতে বাংলাদেশ সরকার ও পাকিস্তান সরকারের সহযোগিতা চান আছিয়া এবং তার পরিবার। 

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নব্বই দশকের শুরুতে অভাবের কারণে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় যায় আছিয়ার পরিবার। বাসাভাড়া নিয়ে থাকতেন মিরপুরের বড়বাগ এলাকায়। আর দিনমজুরি করতেন আছিয়ার বাবা তমিজ উদ্দিন। ১৯৯৪ সালের দিকে এক বিকালে বরগুনা যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন ১৬ বছরের আছিয়া, এরপর আর ফেরেননি। অনেক খোঁজ করেও মেয়ের সন্ধান পায়নি পরিবার। একসময় মেয়েকে হারানোর বেদনা নিয়েই গ্রামে ফিরে আসেন তারা। এরপর কেটে গেছে বছরের পর বছর। এর মধ্যে পাঁচ বোনের বিয়ে হয়েছে, ভাইও সংসার শুরু করেছেন। আর তিন বছর আগে মেয়ের অপেক্ষা করতে করতেই মারা গেছেন আছিয়ার মা রাহেলা। 

কিছুদিন আগে নিজের পরিচয় ও বাংলাদেশে থাকা বাবার ঠিকানা জানিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন আছিয়ার মেয়ে।  এর পরে সামাজিক  মাধ্যমের কল্যাণে বাংলাদেশ থেকে তার এলাকার একজন ঠিকানা যাচাই করে চিনতে পারেন তাকে। ঠিকানা মিলে যাওয়ার পরে তমিজ উদ্দিন, তার ছেলে মোস্তফা ও মেয়েদের ছবি পাঠানো হয় আছিয়ার কাছে। ছবিগুলো দেখেই হারিয়ে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের চিনতে পারেন তিনি।

সরেজমিন বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের চারাভাঙ্গা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জীর্ণ ঘরেই বসে আছেন ৯০ বছর বয়সি তমিজ উদ্দিন হাওলাদার। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর, ঝাপসা হয়ে এসেছে দৃষ্টি, সে দৃষ্টি অপেক্ষার। কখন মোবাইল নিয়ে আসবেন প্রতিবেশী রিয়াজ। 

মোবাইলের পর্দায় মেয়ে আছিয়ার মুখ ভেসে উঠলেই বদলে যায় তার মুখের অভিব্যক্তি। কখনো হাসেন, কখনো চোখের পানি মুছেন। কণ্ঠ শুনতে পান বাবা, কথাও হয় প্রতিদিন। তবু ৩২ বছরের অপেক্ষার অবসান যেন হচ্ছে না তার। কারণ, মেয়েকে দেখা যায় কিন্তু ছোঁয়া যায় না।

মরার আগে আমার আছিয়ারে একবার দেখতে চাই। এমন আকুতি করে আছিয়ার বাবা তমিজ উদ্দিন বলেন, আমার ৯০ বছর বয়সে মাইয়ারে না পাইয়া শোকে কাতর হইয়া ছিলাম। আল্লাহ এখন আমার মায়ের খোঁজ দিছে। আমি চাই মরার আগে ওরে একটু ছুইয়া দেখতে। আমার মেয়েরে আপনারা আইন্না দেন।

আছিয়ার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ স্থাপনে ভূমিকা রাখা রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ফেসবুকে আমাদের গ্রামের এক নারীর হারিয়ে যাওয়ার বিজ্ঞপ্তি দেখতে পাই। পরে মুরব্বিদের সঙ্গে কথা বলে তাদের বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত হই। এরপর আছিয়ার ফুফুর সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমার ফোনের মাধ্যমেই এখন দুই পরিবারের যোগাযোগ চলছে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুরোধ, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতা করা হোক।

আছিয়ার ভাই মোস্তফা  বলেন, আমার বোন হারিয়ে গেছে প্রায় ৩২ বছর আগে৷ এতদিন তার বেঁচে থাকার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু হঠাৎ তার সন্ধান পেয়েছি। সে বেঁচে আছে। আমরা চাই সে যেন দেশে আসতে পারে। সরকার যেন আমাদের সহযোগিতা করে।

পাকিস্তানে পাচার হয়ে যাওয়ার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মোবাইলে আছিয়া বলেন, ১৯৯৪ সালে বরগুনা যাওয়ার উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়ে সদরঘাট এলাকায় যাই। সেখানে এক নারীর সঙ্গে দেখা হয়। ওই নারী আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে। পরে আমাকে অজ্ঞান করে প্রথমে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি বদ্ধ ঘরে ১০-১২ দিন রাখা হয়। আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিল। এরপর আমাকে পাকিস্তানের মোজাফফরনগরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ৪০ হাজার রুপিতে আমাকে আমার স্বামীর কাছে বিক্রি করা হয়।

আছিয়া জানান, তার স্বামী স্কুলশিক্ষক ছিলেন এবং ভালো মানুষ ছিলেন। তাদের ছয় মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর স্বজনদের কথা আরও বেশি মনে পড়তে থাকে তার। পরে তার বড় মেয়ে সামাজিক গমাধ্যমে মায়ের নাম-ঠিকানা দিয়ে পোস্ট করলে বাংলাদেশে থাকা পরিবারের সন্ধান পান তিনি।

আছিয়া বলেন, আমি অনেক চেষ্টা করেও বাড়ির কোনো খোঁজ নিতে পারিনি। এখন পরিবারের সন্ধান পেয়েছি। আমি পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছি। দেশে ফিরতে প্রায় চার লাখ পাকিস্তানি রুপি লাগবে বলে জানতে পেরেছি কিন্তু এতো টাকা আমার কাছে নেই। আমি আমার বাবাকে দেখতে দেশে ফিরতে চাই। এজন্য বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরকারের সহযোগিতা চাই।

এ বিষয়ে বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার বলেন, আছিয়ার যদি বাংলাদেশের বাসিন্দা হিসেবে কোনো প্রমাণপত্র থাকে তবে পাকিস্তানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। অন্যথায় যেহেতু ৩২ বছর পূর্বের ঘটনা আর যদি নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট বা অন্যান্য প্রমাণপত্র না থাকে তার পরিবারের সদস্যরা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করলে আমাদের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী আছিয়াকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 



সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার    সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০। ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।