" />
AmaderBarisal.com Logo

ভোলার মনপুরা: বেড়িবাঁধ নির্মাণে অনিয়ম, স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা


আমাদেরবরিশাল.কম

১২ September ২০২৬ Saturday ৬:৫০:১৩ PM

মনপুরা ((ভোলা) প্রতিনিধি:

কাজ শেষ হয়নি এখনও। অথচ ফেটে যাচ্ছে বাঁধ রক্ষায় ব্যবহৃত জিওব্যাগ।হাত দিয়ে চাপ দিলেই ঝরে পড়ছে জিওব্যাগে থাকা সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রণ। আবার সঠিকভাবে মাটি ব্যবহার না করায় সামান্য বৃষ্টিতেই বাঁধ ধসে সৃষ্টি হচ্ছে বড় বড় গর্ত। 

এমন অবস্থা ভোলার সাগর মোহনার বিছিন্ন উপজেলা মনপুরায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজের। নদীভাঙন আর জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের হাজার কোটি টাকায় নির্মীয়মাণ বাঁধের পাশাপাশি প্রকল্পের অন্যান্য কাজের মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে এলাকাবাসীর।দুর্যোগ ঝুঁকিতে থাকা মনপুরাবাসীর সুরক্ষায় নেওয়া প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কিত তারা।

এদিকে, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে জীবন দিতে হয়েছে উপজেলার দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের ছাত্রদল নেতা মো. রাসেদকে। বাঁধ নির্মাণ কাজের অনিয়মের প্রতিবাদ করায় ঠিকাদারের লোকজন তাকে কুপিয়ে হত্যা করে বলে অভিযোগ নিহতের স্বজনদের। 

এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে কাজ ফেলে রাখায় ২০২৫ সালের ৩১ মে বাঁধের বালুর স্তূপের নিচে চাপা পড়ে মো. ওমর নামের ১০ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়।এর পরও বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ২০২৫ সালের মে মাসে মানববন্ধনও করে এলাকাবাসী। 

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ভোলার মুজিবনগর ও মনপুরায় উপকূলীয় বাঁধ পুনর্নির্মাণ, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও তীর সংরক্ষণে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কাজ শুরু করে পাউবো। ১১০০ কোটি টাকার প্রকল্পের এ কাজের মধ্যে মনপুরায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ পুনর্নির্মাণ, ১৬৮টি স্পার নির্মাণ, ২৯ লাখ ৭৮ হাজার জিও টিউব ডাম্পিং ও জিওব্যাগ প্লেসিং, ১১টি স্লুইসগেট ও তিনটি হার্বার পয়েন্ট (জেলে নৌকা রাখার স্থান) নির্মাণের কথা রয়েছে। 

সূত্র জানায়, ১৪টি প্যাকেজের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ পায় ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।এর মধ্যে মেসার্স লিয়াকত অ্যান্ড সন্স লিমিটেড বাঁধের ১৮ দশমিক ২ কিলোমিটার, গোলাম রাব্বানি কনস্ট্রাকশন ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার, ওয়েস্টার্ন ইঞ্জনিয়ারিং প্রাইভেট লিমিটেড ৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিরিয়ারিং লিমিটেড ৬ দশমিক ১ কিলোমিটার, প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড ৪দশমিক ৪ কিলোমিটার এবং  ওরিয়েন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড বিল্ডার্স লিমিটেড ০ (শূন্য) দশমিক ৯ কিলোমিটার অংশ নির্মাণ করছে।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের কাজ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারায় ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রকল্পের খরচ কমাতে বাঁধের বাইরের অংশে ব্লকের পরিবর্তে জিওব্যাগভর্তি সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রণ (সেন্টসিমেন্ট) দিয়ে নকশা করা হয়। পরীক্ষামূলকভাবে এটিই প্রথম চালু করা হয় বলে সূত্র জানায়।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে প্রকল্পের কাজ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। তবে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, প্রায় আট কিলোমিটার এলাকায় নামমাত্র মাটি ফেলা হয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিন নির্মীয়মাণ বাঁধ এলাকার সোনারচর, তালতলীসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঁধ রক্ষায় নদীর পাশে ব্লকের পরিবর্তে সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রনভরা সারি সারি জিওব্যাগ সাজানো। এসব জিওব্যাগের অধিকাংশই ফাটা। কোনো কোনো ব্যাগের সেলাই খুলে গেছে। জিও ব্যাগের ভেতর থাকা সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রণ হাত দিলেই ঝরে পড়ছে। 

অথচ কথা ছিল এই জিও ব্যাগের ভেতর থাকা বালু ও সিমেন্ট জমাট বেঁধে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঁধকে সুরক্ষা দেবে। কিন্তু সঠিক অনুপাতে সিমেন্ট না দেওয়ায় তা জোয়ারের পানিতেই ভেসে যাচ্ছে। 

এছাড়া বাঁধের ওপর ও দুই পাশে এক মিটার করে মাটি দেওয়ার কথা থাকলেও তা না দেওয়া হয়নি। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই বাঁধের নানা জায়গায় ধসে পড়ছে। 

উপজেলার দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের তালতলা স্লুইসগেট এলাকায় নতুন বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে গত জুন মাসে। সম্প্রতি বৃষ্টিতে ওই বাঁধের বিভিন্ন জায়গার বালু ধসে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। বাঁধের বালু ঢুকে পড়ছে পাশপাশের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমিতে। তালতলার মতো সাকুচয়িার মাঝের ঘাট, হাজির ইউনিয়নের সোনারচর, চরফৈজুদ্দিনসহ বাঁধের  অর্ধশতাধিক স্থানে ধসে পড়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, একটি জিও ব্যাগে দেড় বস্তা সিমেন্ট দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঠিকাদার এক বস্তা সিমেন্ট ভাগ করে তিন-চারটি জিওব্যাগে দিয়েছে। তাই ভেতরে থাকা বালু জমাট বাঁধেনি। এছাড়া জিওব্যাগ যে  পুরু হওয়ার কথা, তা হয়নি। ফলে কাজ শেষ না হতেই সেগুলো ফেটে যাচ্ছে। 

এছাড়া বাঁধ নির্মাণে পর্যাপ্ত মাটি না দিয়ে মেঘনা নদীর বালু দেওয়া হয়েছে। বাঁধের বাইরের দুই দিক ও ওপরে এক মিটার পুরুত্বে মাটি দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি। এমন বাঁধ মেঘনার ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে কতটা রক্ষা করতে পারবে, তা নিয়ে শঙ্কিত মনপুরার মানুষ।

উপজেলার দক্ষিণ সাকুচিয়া তালতলা এলাকার বাসিন্দা মোশারেফ দালাল বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজের বিস্তারিত তথ্যসহ একটি চার্ট টানিয়ে দেয়। কিন্তু ওই চার্ট অনুযায়ী কাজ হয়নি। বাঁধ নির্মাণে পাউবো ও ঠিকাদারের যোগসাজসে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। দলীয় নেতাদের প্রভাবের কারণে এই অনিয়ম হয়েছে।

হাজিরহাট ইউনিয়নের সোনারচর এলাকার বাসিন্দা আবুল হাশেম বলেন, ‘বাঁধের কাজ যেভাবে হওয়ার কথা ছিল, সেই নিয়মে হয় নাই। জিওব্যাগের মধ্যে দেওয়া সিমেন্ট ও বালু এখই গুড়ো হয়ে যাচ্ছে। জোয়ারের পানির চাপ আসলে এই জিওব্যাগ টিকবে না।’

দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের ৬৫ বছর বয়সী একই এলাকার মো. জামাল জানান, তার চার গন্ডা জমির বাড়ি ছিল। বর্গাজমি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তার বাড়িঘরের ওপর দিয়ে নতুন বেড়িবাঁধ গেছে। কিন্তু কোনো  ক্ষতিপূরণ পাননি। এমনকি ঘর সরাতেও কোনো খরচ দেয়নি কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে অন্যের জমিতে ঘর তুলে থাকেন। এতকিছুর পরও বাঁধটি সঠিকভাবে করা হয়নি বলে অভিযোগ তার।

দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের পঁচা কোড়ালিয়া বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুস সালামের অভিযোগ, পাঁচ-ছয় মাস আগে বেড়িবাঁধের কাজের জন্য পুরনো বাঁধ কেটে দুই পাশে মাটি তুলে রাখা হয়। এখন মানুষ যাতায়াত করতে পারে না। অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয়রা বেড়িবাঁধের মাঝে জমে থাকা পানিতে মাছ চাষ করছে। চার-পাঁচ কিলোমিটার অংশে বাঁধ কেটে রাখা হয়েছে। এতে হাজার হাজার পরিবার ভোগান্তিতে রয়েছে। দ্রুত বাঁধের কাজ শেষ করার দাবি জানান তিনি।

ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ড-২ এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আহসান আহম্মদ খান বলেন, বাঁধের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। বৃষ্টিতে বাঁধের যেসব অংশ ধসে যাচ্ছে, তা সাথে সাথেই ঠিকাদার মেরামত করে দিচ্ছেন। বাঁধের ওপর  সড়ক নির্মাণ হয়ে গেলে এ সমস্যা থাকবে না। 

সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রণভরা জিওব্যাগসহ কাজের মান নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বলেন, আমরা নিয়মিত বাঁধের কাজ মনিটরিংয়ের মাধ্যে রেখেছি। জিওব্যাগে সিমেন্ট ও বালু জমাট না বাঁধার তথ্য এখনও  আমাদের কাছে আসেনি। এধরনের তথ্য পাওয়া গেলে ঠিকাদরের মাধ্যমে তা পরিবর্তন করা হবে।

ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান বলেন, মনপুরার বাঁধ নির্মাণ কাজটি এখনও চলমান। কোনো অনিয়ম হলে বা সেন্টসিমেন্ট জিওব্যাগ ছুটে গেলে তা তদারকি করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররে মাধ্যমে পুনরায় করানো হবে। 

তত্ত্বাবধায়ক বলেন, প্রকল্পটির ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ২০২৭ সালের জুন মাসে এটি শেষ হওয়ার কথা। আশা করছি নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করতে পারবো।



সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার    সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০। ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।