" />
AmaderBarisal.com Logo

যেসব কারণে বরিশালের নদ-নদীতে মিলছে না ইলিশ 


আমাদেরবরিশাল.কম

১৭ September ২০২৬ Thursday ৪:৪৫:৩৩ PM

বিশেষ প্রতিনিধি:

দেশে মোট আহরণকৃত ইলিশের প্রায় ৬৮ শতাংশই পাওয়া যায় বরিশাল বিভাগের নদ-নদী ও সাগরে। তবে গত তিন বছরে পাল্টে গেছে সে হিসাব। ভরা মৌসুমেও এই অঞ্চলে এখন আর মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। ফলে তিন বছরের ব্যবধানে ইলিশ আহরণ নেমে এসেছে প্রায় ৫০ শতাংশে। এ কারণে দেনায় ডুবে পেশা পরিবর্তন করছেন অনেক জেলে।

মৎস্য বিভাগ বলছে, চার কারণে বরিশাল অঞ্চলের নদ-নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। এর মধ্যে নদ-নদীর ‘ডুবচর’ ইলিশের অবাধ বিচরণে প্রধান বাধা হিসেবে দেখছেন তারা। তাই পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে নদী শাসনের প্রস্তাবনাও দিয়েছে বরিশাল মৎস্য বিভাগ। তবে ব্যয়বহুল এই প্রকল্প কবে নাগাদ অনুমোদন হবে তা নিশ্চিত নন কেউ।

বরিশাল নগরীর পোর্ট রোড আড়তে ইলিশ নিয় আসা মেহেন্দিগঞ্জের জেলে নজরুল ইসলাম জানান, প্রায় ৪০ বছর ধরে ইলিশ শিকার করেন তিনি। একসময় মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কালাবদর নদীতে জাল ফেললেই ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পেতেন। এখন ভরা মৌসুমেও ইলিশ না পেয়ে ছুটছেন চট্টগ্রাম সমুদ্রে। তাও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ।

তিনি বলেন, জুন থেকে শুরু হয়েছে ইলিশের ভরা মৌসুম। কিন্তু আগস্ট মাস পর্যন্ত জালে ইলিশ ওঠেনি। চলতি মাসের দুই-একদিন ধরে কিছুটা ইলিশ ধরা পড়ছে। তার মধ্যেই আগামী ৪ অক্টোবর থেকে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে। সমিতির কিস্তিসহ ধারদেনা করে জাল কিনেছি। এখনো প্রায় চার লাখ টাকা ঋণ আছে। এই কদিনের মধ্যে দেনা কীভাবে পরিশোধ করব তা মাথায় আসছে না।

ভোলার জেলে আব্দুল মান্নান খন্দকার বলেন, চলতি মৌসুমে ২০ লাখ টাকার জাল কিনেছি। মুদি দোকানসহ আনুসাঙ্গিক আরও দুই লাখ টাকা বকেয়া। গত জুন থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করেছি। এখনো ১০ লাখ টাকা দেনা রয়েছে। এতদিন কাঙ্ক্ষিত মাছ পাইনি। এখন জালে মাছ পড়তে শুরু করেছে। তার মধ্যেই নিষেধাজ্ঞা শুরুর আর ২০ দিনের মতো বাকি। এই নিষেধাজ্ঞাটা আরেকটু পরে দিলে আমাদের জেলেদের জন্য ভালো হতো। লাভ করতে না পারি; অন্তত দেনার দায় থেকে রক্ষা পেতাম।

জেলে কামাল হোসেন বলেন, নদী এবং সাগরে আগের মতো ইলিশ মিলছে না। আগে যেখানে একটি বোটেই আমরা ৩-৪শ মণ ইলিশ পেতাম সেখানে এখন ১০০ মণ মাছও পাচ্ছি না। দেনা করে জাল কিনে, ট্রলার ভাড়া করে নদী-সাগরে গিয়ে শূন্য হাতে ফিরতে হচ্ছে। এজন্য অনেক জেলে এই পেশা ছেড়ে দিচ্ছে। তারা রিকশা-ভ্যান, ইজিবাইক চালিয়ে সংসার এবং দেনা মেটানোর চেষ্টা করছে। মূলত নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মা ইলিশ এবং জাটকা শিকারের কারণেই এখন আগের মতো ইলিশ মিলছে না।

শুধু জেলে পাড়ায় নয়; ইলিশের সংকটে হাহাকার চলছে বরিশালের অন্যতম মোকাম পোর্টরোডের মৎস্য আড়তে। 

পোর্ট রোডের আড়তদার আলী হোসেন বেপারি বলেন, দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে এই আড়তে ব্যবসা করি। একসময় বরিশালে মোকাম বলতে পোর্টরোডই ছিল। তখন একেকটি ট্রলারে ৪-৫শ মণ ইলিশ আসত। আড়ত ছিল মাছে ভরপুর, দামও ছিল কম। এখন ভরা মৌসুমেও ইলিশ আসছে না। চলতি মৌসুমে গত দুই দিন ধরে সর্বোচ্চ দেড়শ থেকে দুইশ মণ ইলিশ এসেছে। বাকি ইলিশ অন্য মোকামে চলে যায়।

তিনি জানান, বর্তমানে কেজির ইলিশ ৯৮ হাজার থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মণ বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া এলসি সাইজ ৭৫ থেকে ৮০ হাজার, ৫০০ গ্রাম ৬৫ হাজার, ৪০০ গ্রাম ৪৮-৫০ হাজার, ৩০০ গ্রাম ৪২-৪৪ হাজার এবং ৪টায় কেজি মাছের মণ ৩২ হাজার টাকা চলছে।

বরিশাল মৎস্য ভবনের গত ১৬ বছরের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে বরিশাল অঞ্চলের নদ-নদী এবং সাগরে ইলিশের উৎপাদন এবং আহরণ ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে। শুরুর বছরে এক লাখ ৭০ হাজার ৭৬২ টন ইলিশ আহরণ হয় নদী এবং সাগর থেকে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সেই আহরণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ টনে। ওই বছর সারা দেশের মধ্যে বরিশাল অঞ্চলে সর্বোচ্চ ৬৮ শতাংশ ইলিশ আহরণ হয়।

তবে ইলিশ আহরণ কমতে থাকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে। ওই বছর বরিশালের নদ-নদী এবং সমুদ্র থেকে ইলিশ আহরণ কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ টনে। পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ টন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নেমেছে দুই লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ টনে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৬ টন ইলিশ আহরণ কমেছে, যা গত ১০ বছরের হিসেবেও সর্বনিম্ন।

নদ-নদীতে কেন ইলিশের আহরণ কমছে তা নিয়ে গবেষণা করেছে বরিশাল মৎস্য বিভাগ। বিভাগের কর্মকর্তারা চারটি কারণ দাঁড় করিয়েছেন ইলিশ আহরণ হ্রাসের জন্য। নদ-নদীতে ‘ডুবুচর’, অতিসূক্ষ্ম ক্ষুদ্র ফাঁসের জালের বিস্তার, অবাধে জাটকা এবং মা ইলিশ আহরণ ও দূষণ।

বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, নদ-নদীতে প্রচুর ‘ডুবচর’ জেগেছে। বিশেষ করে নদ-নদী এবং সাগরে প্রবেশের মুখগুলো ‘ডুবচরে’ আটকে আছে। এ কারণে ইলিশ বিচরণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সাগরের ইলিশ নদীতে যেতে পারছে না। বাধাগ্রস্ত হয়ে ফিরে যাচ্ছে। ইলিশ উৎপাদন এবং আহরণের এটিই প্রধান কারণ হিসেবে আমরা দেখছি।

তিনি আরও বলেন, নদ-নদীতে ইলিশের বিচরণ এবং উৎপাদন বাড়াতে সবার আগে ‘ডুবোচর’ অপসরণ প্রয়োজন। এই বিষয়ে আমরা দফায় দফায় মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখেছি। তবে এটি অনেক বড় এবং ব্যয়বহুল প্রকল্প, যা মৎস্য বিভাগের পক্ষে করা সম্ভব নয়। আমরা প্রস্তাবনা দিয়েছি পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ইলিশের গতিপথ থেকে ‘ডুবচর’ অপসারণের জন্য। বিষয়টি আন্তঃমন্ত্রণালয় দেখছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, ইলিশ উৎপাদন এবং আহরণ কমে যাওয়ার পেছনে আরেকটি প্রধান কারণ হচ্ছে নিষেধাজ্ঞার সময়ে জাটকা এবং মা ইলিশ শিকার। তার ওপর অতিসূক্ষ্ম ক্ষুদ্র ফাঁসের জাল ব্যবহার করায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ছে।

তিনি বলেন, মা ইলিশ এবং জাটকা সংরক্ষণে আমাদের নিয়মিত অভিযান চলে। অভিযানে অংশ নেওয়া জনবলের থেকে জেলের সংখ্যা বেশি। ৪ লাখ ২২ হাজার ২৭৫ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছে। এর মধ্যে সমুদ্রগামী জেলের সংখ্যা ১ লাখ ৬১ হাজার ৯৫৭ জন। নিবন্ধনের বাইরেও অনেক জেলে রয়েছে। এসব জেলেরা দিন দিন উন্নত প্রযুক্তির নৌযান নিয়ে ইলিশ শিকারে যাচ্ছে। অল্প সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দিয়ে তাদের প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তার ওপর আমাদের পর্যাপ্ত এবং দ্রুতগতির নৌযানের সংখ্যাও কম। যে কারণে অভিযানগুলো সঠিকভাবে করা সম্ভব হয় না।

অন্যদিকে, নদীদূষণও ইলিশ উৎপাদন এবং আহরণ দিনকে দিন কমিয়ে দিচ্ছে। বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর তীরঘেঁষে কল-কারখানা গড়ে উঠছে। এসব কাল কারখানার বর্জ্য সরাসরি নদীতে যাচ্ছে। তাছাড়া সদর ঘাটের বুড়িগঙ্গার পানি এতটাই দূষিত যে, সেখানে কোনো মাছই পাওয়া যাবে না। সেটার একটা প্রভাব পড়ছে পদ্মা-মেঘনা, তেঁতুলিয়াসহ অন্য নদীগুলোতে। ইলিশ স্বচ্ছপানির মাছ। দূষণের কারণে নদীতে ইলিশ আসছে না। তাছাড়া পদ্মা সেতু নির্মাণের পর সেখানেও ‘ডুবচর’ সৃষ্টি হয়েছে। ইলিশের অবাধ বিচরণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

মৎস্য বিভাগের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, চলমান এই সংকট স্থানীয়ভাবে সমাধানের কোনো উপায় নেই। এটি জাতীয় বিষয়- সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সমাধান করতে হবে। আমরা আমাদের সংকট এবং প্রস্তাবনা যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করেছি। তারা উদ্যোগ এবং বাস্তবায়ন করলে বরিশালের নদ-নদী আবারও মাছে মাছে ভরে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান।



সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক


প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার    সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০। ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।