![]() বরিশালের সাবেক ডিসি-এডিসির দুর্নীতি:ভুয়া বিল-ভাউচারে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
১১ October ২০২৬ Sunday ৫:১১:৪৮ PM
অনলাইন নিউজ ডেস্ক: ![]() গত অর্থবছরের জুন ক্লোজিংয়ের নামে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে বরিশালের সাবেক জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সালমা পারভিন ও একাধিক কর্মচারীর বিরুদ্ধে। একই কাজের বিপরীতে দুই বিল উত্তোলন, চেকের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করে তা আবার তুলে আনা, পুরাতন প্রিন্টার ও কম্পিউটার কিনে নতুনের বিল উত্তোলন ও বিভিন্ন ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে এসব অর্থ তুলে আত্মসাৎ করা হয় বলে অভিযোগ। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও জেলা প্রশাসকের বাংলোর সাবেক সিএ ও সাবেক নাজিরের সহায়তায় এসব অর্থ তোলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে অর্থনৈতিক কোনো দুর্নীতি হলে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বর্তমান জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার। সূত্র জানায়, বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে বিভিন্ন উপখাতের জন্য প্রতিবছর নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে। তবে বরাদ্দ করা অর্থ খরচের পর উদ্বৃত্ত থাকলে বছর শেষে তা চালানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট খাতে জমা দেওয়া হয়। এমনকি খরচ বেশি হলে অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে বরাদ্দ এনে খরচ মেটানো হয়। সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ১২ মে ১২৯ নম্বর স্মারকে বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ট্রেজারি ভবনের নিচতলা ও ডিডিএলজি রুমের সংস্কারের জন্য দুটি কোটেশনে ১০ লাখ টাকার সংস্কারকাজ দেখানো হয়। এ দুটি রুমের মেরামত, টাইলস স্থাপন ও সংস্কার, দরজা-জানালা পরিবর্তন, স্যানিটারি ফিটিংসসহ বিভিন্ন ধরনের আনুষঙ্গিক কাজ করে গণপূর্ত বিভাগ। কাজ দুটির জন্য ১৪ লাখ টাকা বিল ছাড় করে গণপূর্ত বিভাগ। এক বছর আগে কাজ শেষ করে বিল উত্তোলন করে নেন ঠিকাদার মিলটন। কিন্তু গণপূর্ত বিভাগের করা কাজ বছর না ঘুরতেই একই কক্ষে গত জুন ক্লোজিংয়ে টাইলস বসানো ও গ্রিল স্থাপনের কাজ দেখিয়ে বিল-ভাউচারের মাধ্যমে পাঁচ লাখ করে মোট ১০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। ওই দুটি কাজেরও ঠিকাদার হিসেবে দেখানো হয় নগরীর কালিজিরা এলাকার বাসিন্দা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সাবেক নাজির আসাদুজ্জামান খানের বড় ভাই মেসার্স জামান অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী আক্তারুজ্জামান খানকে। এ বিষয়ে ঠিকাদার আক্তারুজ্জামান আমার দেশকে জানান, অনেক আগে তিনি ঠিকাদারি কাজ করতেন। এখন আর করেন না। সাম্প্রতিক সময়ে বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে কোনো ঠিকাদারি কাজ করেছেন কি নাÑজানতে চাইলে শুরুতে তা অস্বীকার করেন। কিছুক্ষণ পর তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, তিনি ডিসি অফিসে ঠিকাদারি কাজ করেছেন। তবে কবে কাজ করেছেন, কী কী কাজ করেছেন এবং কত টাকার কাজ করেছেনÑএমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো জবাব দেননি। অনেকক্ষণ পর কোনো উত্তর না দিয়েই তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন এবং পরে কল দেওয়া হলেও ফোন রিসিভ করেননি। সূত্র জানায়, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অন্যান্য মনিহারি কেনার জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে ওই খাত থেকে মনিহারি সামগ্রী কেনা বাবদ ১০ লাখ টাকা খরচ করা হয়। বরাদ্দের অবশিষ্ট ২৪ লাখ টাকার মধ্যে জুন ক্লোজিংয়ের সময় সংশ্লিষ্ট খাত থেকে ১১ লাখ টাকা ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়। সূত্রমতে, চাহিদাপত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের (এনডিসি) অনুমোদন ছাড়া ১১টি ভুয়া বিলের মাধ্যমে ১১ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। নগরীর বান্ধ রোড (লঞ্চঘাট) এলাকার ছোট দোকান তালুকদার স্টোরস থেকে মুদি-মনিহারি পণ্যসামগ্রী কেনা বাবদ ১১ লখ টাকা বিল-ভাউচার দেখানো হয়। এমনকি ওই প্রতিষ্ঠানের নামে উল্লিখিত ১১ লাখ টাকার একটি চেক প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে জমা দিয়েই প্রতিষ্ঠানটি থেকে অগ্রিম চেক নিয়ে পরক্ষণেই তা তুলে নেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সাবেক নাজির আসাদুজ্জামান খান আসাদ। সাবেক জেলা প্রশাসক সুমন ও বর্তমান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সালমার নির্দেশে দোকান মালিকের সঙ্গে পরস্পর যোগসাজশে তালুকদার স্টোরসের অ্যাকাউন্ট থেকে সাবেক নাজির ওই টাকা তুলে নিয়েছেন। তালুকদার স্টোরসের মালিকের কাছ থেকে অগ্রিম চেক নিয়ে নাজির আসাদুজ্জামান ওই অ্যাকাউন্ট থেকে উল্লিখিত টাকা তুলে নিয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন দোকান মালিক জাহানারা বেগম ও তার স্বামী হুমাউন কবীর। এমনকি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কাছে তার পাওনা আগের টাকা পরিশোধ করা হয়নি বলেও জানান হুমাউন। তবে শিগগির পাওনা টাকা পরিশোধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এদিকে ডিসি কার্যালয়ের বিভিন্ন শাখার ফাইল কাভার, অফিসারদের জন্য হ্যান্ড নোটবুক ও রেকর্ড রুমের ভলিউম বাঁধাইয়ের বিপরীতে পাঁচ লাখ টাকার ভুয়া বিল-ভাউচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সরকারি বিধি অনুয়ায়ী স্বীকৃত কোনো বাঁধাইখানা থেকে খাতাপত্র বাঁধাই করার বিধিবিধান রয়েছে। কিন্তু তালুকদার স্টোরসের নামে পাঁচ লাখ টাকার বিল-ভাউচার জমা দিয়ে কোনো ধরনের বাঁধাইয়ের কাজ না করেই উল্লিখিত টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে তালুকদার স্টোরসের মালিক জাহানারা বেগমের স্বামী হুমাউন কবীর জানান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি তার স্ত্রীর নামে। বর্তমানে তিনি এটি দেখাশোনা করেন। এই দোকানে কোনো বাঁধাইয়ের কাজ করা হয় না। তিনি আরো জানান, বাঁধাই ও মনিহারি সামগ্রী কেনার বিল-ভাউচার করে তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দেওয়া হয়েছিল। পরে তাদের কাছ থেকে সমপরিমাণ টাকার চেক নিয়ে ওই টাকা তুলে নিয়েছেন নাজির আসাদুজ্জামান। এদিকে, ডিসি কার্যালয়ের প্রিন্টার কেনা বাবদ টাকার ভাউচার দেখানো হয়েছে। ভাউচারে নতুন প্রিন্টার কেনা হয়েছে দেখিয়ে লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা থেকে কিছু পুরাতন (সেকেন্ড হ্যান্ড) প্রিন্টার কিনে তারা বরিশাল আর্ক কম্পিউটার থেকে নতুন কম্পিউটার কেনার ভাউচার দেখিয়ে অতিরিক্ত টাকা আত্মসাৎ করেছেন। সূত্র জানায়, শুধু প্রিন্টারই নয়; এর আগে কম্পিউটার ও অন্যান্য জিনিসপত্র কেনার নামে সরকারি অর্থ নয়ছয় করা হয়েছে। কম্পিউটার না কিনেই ভাউচার দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করেছেন সাবেক ডিসি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকসহ কয়েকজন। জুন ক্লোজিংয়ের নামে ডিসি অফিসে মিটিং-সেমিনার, তেল ও আপ্যায়নসহ বিভিন্ন খাতে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করেছেন তারা। ডিসি কার্যালয় সূত্র জানায়, শিক্ষা শাখার কর্মচারী কল্যাণ তহবিলে বাৎসরিক কল্যাণ পরিদপ্তরের আয়োজনে স্পোর্টস অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। অনেকটা ছোট পরিসরেই আয়োজন করায় তহবিলে ৭৭ হাজার টাকা উদ্বৃত্ত থাকে। অনুষ্ঠান শেষে বরিশাল সিটি করপোরেশন থেকে ২৫ হাজার টাকা এবং জেলা পরিষদ থেকে ২০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছিল। সব মিলিয়ে ওই খাতে লক্ষাধিক টাকা উদ্বৃত্ত থাকলেও পরে সাবেক ডিসি ও বর্তমান এডিসি মিলে ওই টাকা আত্মসাৎ করেন বলেও অভিযোগ। এছাড়া বর্তমান এডিসির বিরুদ্ধে আগের কর্মস্থলেও ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচিও পালিত হয়। এ বিষয়ে ডিসি কার্যালয়ের সাবেক নাজির আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, মনিহারি সামগ্রী কেনা ও বাইন্ডিংয়ের জন্য তালুকদার এন্টারপ্রাইজের অ্যাকাউন্টে দেওয়া বিল চেকের মাধ্যমে তিনি তুলে আনেননি। তার ভাই ডিসি অফিসে কোনো কাজ করেননি। অফিসের কেউ হয়তো তার লাইসেন্স ব্যবহার করেছেন। কে লাইসেন্স ব্যবহার করেছেনÑজানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা তদন্ত করলেই বের হবে। জুন ক্লোজিংয়ের নামে অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে জানতে গত দুদিন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সালমা পারভিনের অফিসে গেলেও তিনি সাক্ষাৎ দেননি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার বলেন, জুন ক্লোজিংয়ের সময় আমি ছিলাম না, তাই এ বিষয়ে বলতে পারব না। এছাড়া পুরাতন প্রিন্টার কেনার বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে তদন্ত করে অনিয়মের প্রমাণ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন বলেও জানান তিনি। সূত্র: আমার দেশ। সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। |
||

