" />
AmaderBarisal.com Logo

পবিপ্রবির ক্যাম্পাস জুড়ে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য


আমাদেরবরিশাল.কম

১৬ December ২০১২ Sunday ৩:০০:৪৩ AM

DSC_1048বরিশাল :: যুদ্ধশেষে মুক্ত স্বদেশে ফিরেছেন এক গেরিলা যোদ্ধা। তাঁর বাঁ কাঁধে রাইফেল। ঊর্ধ্বমুখী ডান হাতে ধরা স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। মুখে স্মিত হাঁসি। আকাশপানে তাকিয়ে দীর্ঘদিন পরে গায়ে মাখছেন স্বাধীন মাতৃভূমির আলো-হাওয়া। এই মূল ভাবনার ওপর ভিত্তি করে নির্মাণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘জয়বাংলা’।

বিশাল ভিত্তির ওপর ১২ ফুট দৈর্ঘ্যরে ‘জয়বাংলা’ শীর্ষক ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়েছে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) প্রবেশদ্বারে। পবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের (প্রশাসনিক) কার্যালয়ে প্রবেশ করতে যে কারোই প্রথম চোঁখ আটকাবে এই ভাস্কর্যটির দিকে।

স্বাধীনতার স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জাতির জনকের আবক্ষ ভাস্কর্য নির্মান কাজ প্রায় শেষ পথে। প্রশাসনিক ভবনের উল্টো দিকে জয়বাংলা ভাস্কর্যের পাশেই উপাচার্যের কার্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী এ আবক্ষ ভাস্কর্য নির্মাণ কার্যক্রমের দিকে। উপাচার্যের কার্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই বাম পাশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী সাত বীরশ্রেষ্ঠের আবক্ষ ভাস্কর্য নির্মাণ করা হচ্ছে। দেয়াল আকৃতির এই ভাস্কর্য গুলোর উচ্চতা পাঁচ থেকে ছয় ফুট।

এক সারিতেই রয়েছে সেই সাত বীরশ্রেষ্ঠের আবক্ষ ভাস্কর্যগুলো। শুরুর দিকে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ভাস্কর্য। তাঁর পাশে রুহুল আমিন ও মোহাম্মদ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য। পর্যায়ক্রমে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ, মোস্তফা কামাল, ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ও মতিউর রহমানের ভাস্কর্য। সেগুলো যেন অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আগামী প্রযন্মের দিকে। পরাধীনতা থেকে দেশ মুক্ত করা লড়াকু সৈনিকদের প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পথচারীরা। এই ভাস্কর্যের দিকে প্রতিদিন দর্শকরা অবলোকন করেন বরিশাল-বাউফল গামী গাড়ির জানালা দিয়ে। আবার অনেকে দেখেন ক্যাম্পাসের মধ্যদিয়ে বয়েচলা রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে।

মৌলবাদিতের অপপ্রচার: ‘শহীদ বা পরলোকগত কোনো মানুষের ভাস্কর্য নির্মাণের মাধ্যমে তাদের স্মৃতি ও কীর্তিকে চিরভাস্বর করার প্রয়াসকে ইসলামী শরিয়ত বা কানুন অনুমোদন করে না। আমি আমার ইমানি চেতনা ও ইসলামী মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার বিবেচনা করে ভাস্কর্য নির্মাণে টাকা প্রদান করতে ইচ্ছুক নই।’ ক্যাম্পাসে সাত বীরশ্রেষ্ঠর ভাস্কর্য নির্মাণের কঠোর সমালোচনা করে এভাবে লিখিত বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. জহুরুল হক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজস্ব অর্থায়নে ক্যাম্পাসে এই ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহনের শুরুর দিকে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

চলতি বছরের ২০ জুন নেওয়া সেই উদ্যোগের কঠোর সমালোচনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের আরেক সহযোগী অধ্যাপক মো. মহসীন হোসেন খান। ভাস্কর্য নির্মাণের অর্থ না দেওয়ার জন্য রেজিস্ট্রারের কাছে পাঠানো আবেদনে তিনি বলেন, ‘ধর্মীয় দৃষ্টিতে ভাস্কর্য নির্মাণের জন্য অর্থ দিলে মৃত্যুর পর শাস্তি ভোগ করতে হবে।’ দেশ স্বাধীন করার ব্রত নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা জীবন দিয়েছেন, তাঁরা বিনিময়ে পেয়েছেন বীরশ্রেষ্ঠের মহান সন্মান। তাই শিক্ষক কর্মচারীদের অর্থায়নে ওই ভাস্কর্যগুলো নির্মান করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. নওয়াব আলী বলেন, ক্যাম্পাসে সাত বীরশ্রেষ্ঠর ভাস্কর্য নির্মাণে প্রতিষ্ঠানের কতিপয় মৌলবাদী শিক্ষকের বিরোধিতায় মহতী সেই উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছিল। শুধু বিরোধিতাই নয়, ইসলামী অপব্যাখ্যা দিয়ে ওই মৌলবাদী গোষ্ঠীটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ভাস্কর্যের নামে মানুষের মূর্তি নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে ফিরে আসার হুমকিও দিয়েছিল। তারপরও মহান স্বাধীনতার পক্ষে থাকা পবিপ্রবির শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অর্থায়ানে সাত বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্য নির্মিত কাজ প্রায় শেষ পথে।

ভাস্কর্যের অর্থ: ‘জয়বাংলা’ ভাস্কর্যটি স্থাপনে উদ্যোগ নেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও জনতা ব্যাংক লিমিটেড। এজন্য নয় লাখ টাকা অনুদান দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং দুই লাখ টাকা দেয় জনতা ব্যাংক। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জয়বাংলা ভাস্কর্যটির নির্মাতা হচ্ছে বিশিষ্ট ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান। তিনি জানান, গ্লাস ফাইবার ও প্লাস্টার অব প্যারিস দিয়ে মূল কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে ভাস্কর্যটি। কাঠামোটি ভিত্তির ওপর বসানোর পর পাথর, সিমেন্ট ও রড ব্যবহার করে ঢালাই করা হয়েছে। ভাস্কর্যের উপরিভাগে গ্লাস ফাইবার ব্যবহার করা হয়েছে।

অপরদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ভাস্কর্যটির অর্থায়ন করেছে রূপালী ব্যাংক লিমিটেড। দেশের বিশিষ্ট ভাস্কর শ্যামল চৌধুরী আধুনিক দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্যটির নির্মাণ কাজ করছেন। ৬ লাখ ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ে এটি নির্মিত হবে। ভাস্কর্যের উচ্চতা ৩ ফুট, প্রস্থ ২ ফুট ৬ ইঞ্চি, ভাস্কর্যের বেদীর উচ্চতা ৫ ফুট, দৈর্ঘ্য ৮ ফুট, প্রস্থ ৮ ফুট। ভাস্কর্যের বেদীর নির্মাণ মাধ্যম হচ্ছে আর.সি.সি কাস্টিং (১:২:৪), মার্বেল আচ্ছাদন ও সিরামিক ওয়ার্ক।

শিক্ষার্থীদের ভাবনা: এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীরা জানান, ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন করা এবং দেশ পরাধীনতা থেকে মুক্ত করতে যে যুদ্ধ সংঘঠিত হয়েছিল তা আমি দেখিনি। কিন্তু ঐতিহাসিক এই যুদ্ধ সম্পর্কে ধারনা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ক্যাম্পসে যখনই প্রবেশ করি মনে হয় আমি যেন স্বাধীনতার যুদ্ধের সময়কার পরিস্থিতির মধ্যে আছি। আবার বিজয়ের স্বাধ গ্রহন করি। ক্যাম্পাসে অবস্থান কালীন প্রতিটি মূহুর্তে অনুভব করি মুক্তি যুদ্ধের সেই সকল মহানায়কদের ভূমিকা এবং মুক্তিকামি যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কথা। দেশের জন্য তাদের সকলের ত্যাগ সাহসের জন্যই প্রতিদিন উদ্বুদ্ধ হই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়।

সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম বরিশাল বিভাগের সমন্বয়কারী মুক্তিযোদ্ধা শেখ কুতুব উদ্দীন বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্ত সাতজনের মধ্যে দুই শহীদের জন্মভিটা এই বরিশালে। স্বাধীনতাযুদ্ধে তারা জীবন দিয়েছেন। কিন্তু তাদের আবক্ষ ভাস্কর্য বৃহত্তর বরিশালে নেই। এটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য বড় লজ্জার বিষয়। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাখাওয়াত হোসেন তার ক্যাম্পাসে সাত বীরশ্রেষ্ঠের আবক্ষ ভাস্কর্য নির্মানের মাধ্যমে আমাদের সেই লজ্জা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। যা আগামী প্রজন্মও মনে রাখবে।

বীরশ্রেষ্ঠের স্বজনদের অনুভূতি : বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের গ্রামের বাড়ি ভোলা সদর উপজেলার আলীনগরে। ওই গ্রামেই তাঁর মা মালেকা বেগমের বসবাস। তিনি বলেন, জেলা পরিষদে অর্থায়নে আলীনগরে নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল জাদুঘর। সেখানে মোস্তফা কামালের মুরাল রয়েছে। এর বাইরে তাঁর জানা মতে দক্ষিণাঞ্চলের কোথাও এই বীরশ্রেষ্ঠের মুরাল কিংবা স্মৃতি চিহৃ নেই। তবে পটুয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসে সাত বীরশ্রেষ্ঠের যে আবক্ষ ভাস্কর্য নির্মান করেছে, সে জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি ঋনী। মালেকা বেগম আরো বলেন, পটুয়াখালীর মতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বীরশ্রেষ্ঠদের স্মৃতি চিহৃ একান্ত প্রয়োজন আগামী প্রজন্মের জন্য।

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলা সদরের জাহাঙ্গীরনগর (আগরপুর) গ্রামের সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। তাঁর ভাই মো. মঞ্জুর রহমান বাচ্ছু বলেন, জেলা পরিষদে অর্থায়নে জাহাঙ্গীরনগরে নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাদুঘর। জাদুঘরের প্রবেশদ্বারে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠের মুরাল। এর বাইরে বরিশাল শহরের বঙ্গবন্ধু উদ্যানের ঠিক বিপরীতে শিশুপার্কে বীরশ্রেষ্ঠের আরো একটি মুরাল তৈরী করা হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের কোথাও এই বীরশ্রেষ্ঠের মুরাল কিংবা স্মৃতি চিহৃ নেই। ফলে জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তাদের ইতিহাস ভুলতে বসেছে আগামী প্রজন্ম। দক্ষিণাঞ্চেলের বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি আগামী প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে চেতনা সমুন্নত রাখতে যে উদ্যোগ দিয়েছে, তা দেশবাসীর কাছে প্রশংসানীয়।

সংশ্লিষ্ঠদের বক্তব্য: সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম পবিপ্রবি শাখার আহবায়ক ও শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আ ক ম মোস্তফা জামান বলেন, আগামী প্রজন্মের কর্নধররা পবিপ্রবিতে অধ্যায়নরত। তারা মুক্তিযুদ্ধে দেখেনি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে বিগতদিনে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতভাবে শিখেছে। অন্তত ক্যাম্পাসে স্থাপিত ভাস্কর্যগুলো সেই বিকৃত শেখা থেকে তাদের বিবেককে সচেতন করে তুলবে। মূলত সামাজিক এবং ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমাদের পকেটের টাকা দিয়ে ভাস্কর্যগুলো নির্মান করা হয়েছে। যাতে আগামী প্রজন্মের চিন্তাচেতনায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লালন করে।

পবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাখাওয়াত হোসেন বলেন, নিজস্ব অর্থায়নে মুক্তিযুদ্ধে ভাস্কর্য ‘জয়বাংলা’ এবং জাতীর জনকে ভাস্কর্য নির্মান করা হয়েছে। পরবর্তিতে পবিপ্রবির শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ব্যক্তিগতভাবে সাত বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্য নির্মানের প্রস্তাব দেয়। সে অনুযায়ী আমি তাদেরকে নিয়ে সভা করি। সভা অনুযায়ী শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করে নিজেদের সাধ্যমত সহযোগিতার করেছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের কতিপয় মৌলবাদি ক্যাম্পাসে আবক্ষ ভাস্কর্য নির্মানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্ঠির চেষ্ঠা করেছি। বিজয়ের এই মাসেই ভাস্কর্যগুলো উন্মোচন হতে যাচ্ছে।



সম্পাদনা: বরিশাল ডেস্ক


প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার    সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০। ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।