![]() বরগুনার ৭২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ চরম ঝুঁকিতে
৩ November ২০২৬ Tuesday ৩:১৬:১৮ PM
পায়রা, বলেশ্বর ও বিষখালীর অব্যাহত ভাঙনবরগুনা প্রতিনিধি: ![]() সন্ধ্যা নামলেই আতঙ্কে বুক কাঁপে ১০ বছরের শিশু রায়হানের। ঘুমাতে গেলেও চোখে ঘুম আসে না। কখন যেন পায়রা নদীর উত্তাল ঢেউ এসে তাদের শেষ আশ্রয়টুকুও আবার ভাসিয়ে নিয়ে যায়, সেই ভয় তাড়া করে বেড়ায় তাকে। দিনের আলোয় ভয় কিছুটা কমলেও রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে উৎকণ্ঠা। কারণ আগ্রাসী পায়রা নদী এরই মধ্যে তিন তিনবার সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে তার পরিবারের। বরগুনার তালতলী উপজেলার জয়লভাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রায়হানের বর্তমান ঠিকানা নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত একটি বেড়িবাঁধের ওপর তৈরি ঝুপড়ি ঘর। বাবা-মা ও দুই ছোট ভাইবোনের সঙ্গে পলিথিনের ছাউনির নিচে তাদের বসবাস। সাড়ে আট বছরের ভাই রিফাত সাঁতার জানলেও ছোট বোনটি জানে না। তাই নদীভাঙনের আতঙ্কে তিন ভাইবোন সবসময় একে অপরের কাছাকাছি থাকে। নিজেদের ঝুপড়ি ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে রায়হান বলে, ‘সন্ধ্যা নামলেই আমার খুব ভয় করে। মনে হয়, এই বুঝি আমরা ভেসে গেলাম। দিনের বেলায় ভয় কিছুটা কম লাগে।’ রায়হানের মা জমিলা বেগম জানান, গত ১৬ বছরে নদীভাঙনে তিনবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে তাদের পরিবার। তার স্বামী রহমান হাওলাদার পেশায় জেলে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে তাদের ফসলি জমি ও ছোট একটি মাছের ঘেরও। এখন পরিবার নিয়ে মাথা গোঁজার মতো নিজস্ব কোনো জমি অবশিষ্ট নেই। এ সময় আক্ষেপ নিয়ে জমিলা বেগম বলেন, আমরা এখন পুরোপুরি ভূমিহীন। একটা ভাঙা সরকারি বাঁধের ওপর কোনোমতে দিন কাটাচ্ছি। স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না হলে আমাদের মন থেকে কোনো দিন ভয় যাবে না। শুধু রায়হানদের পরিবারই নয়, একই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছে আরও অন্তত ৪০টি পরিবার। নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে এসব পরিবারের কেউ পলিথিন, কেউবা ত্রিপল টাঙিয়ে বসবাস করছেন। একদিকে নদীর অব্যাহত ভাঙন, অন্যদিকে জোয়ার ও ঘূর্ণিঝড়ের আতঙ্ক নিয়েই কাটছে তাদের জীবন। বরগুনা সদর উপজেলার ৬ নম্বর বুড়িরচর ইউনিয়নের পুরাঘাটা ফেরিঘাটের কিছুটা দক্ষিণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধের ঢালে ছোট্ট একটি টিনের ঘরে বসবাস করেন ষাটোর্ধ্ব রুশিয়া বেগম। শৈশবে এক রাতে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় পায়রা নদীর ভাঙনে তাদের ঘরটি বিলীন হয়ে যায়। এরপর একে একে নদীগর্ভে হারিয়েছে তার চারটি বসতঘর। এমনকি দাদা, দাদি ও বাবা, মায়ের কবরও রক্ষা পায়নি পায়রার গ্রাস থেকে। নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে বছরের পর বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন রুশিয়া বেগম। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘দাদা, দাদি, বাপ, মায়ের কবরসহ সবকিছু ভাইঙ্গা লইয়া গেছে এই পায়রা। আমারে ভূমিহীন করেছে। এহন রাস্তার পাশে সরকারি জায়গায় থাহি। সরকার যদি মোগো দিকে একটু নজর দিয়া মাথা গোঁজার ঠাঁই কইরা দিত, তাইলে একটু শান্তিতে মরতে পারতাম।’ রায়হান ও রুশিয়া বেগমদের এই দুর্বিষহ জীবন এখন দক্ষিণের উপকূলীয় জেলা বরগুনার বিস্তীর্ণ জনপদের বাস্তব চিত্র। পায়রা, বলেশ্বর ও বিষখালী নদীর অব্যাহত ভাঙনে জেলার অন্তত ৭২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে চরম ঝুঁকিতে। কোথাও নদীর প্রবল স্রোতে বাঁধের পাড় ধসে পড়ছে, কোথাও প্রতিরক্ষা বাঁধের মাটি সরে তৈরি হচ্ছে বড় বড় গর্ত। আবার কোথাও জোয়ারের পানি উপচে ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে। এতে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও মাছের ঘের। ঝুঁকির মুখে পড়েছে বিস্তীর্ণ জনপদের কৃষি, মৎস্য সম্পদ, যোগাযোগব্যবস্থা ও মানুষের জীবন-জীবিকা। বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, জেলার ২২টি পোল্ডারের অধীনে মোট ৮০৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৭২ কিলোমিটার বাঁধ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। উপজেলাভিত্তিক হিসাবে বরগুনা সদরে ২৬ কিলোমিটার, পাথরঘাটায় ১৮ কিলোমিটার, বেতাগীতে ১১ কিলোমিটার, বামনায় ৭ কিলোমিটার, আমতলীতে ৫ কিলোমিটার এবং তালতলীতে ৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব এলাকার কোথাও নদীর তীব্র স্রোতে বাঁধের পাড় ভেঙে যাচ্ছে, কোথাও প্রতিরক্ষা বাঁধের মাটি সরে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বর্ষা মৌসুম, অমাবস্যা ও পূর্ণিমার জোয়ারে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে নির্দিষ্ট মৌসুমে নদীভাঙন বেশি দেখা গেলেও এখন প্রায় সারা বছরই ভাঙন অব্যাহত থাকে। বর্ষা ও অমাবস্যা-পূর্ণিমার জোয়ারে অনেক সময় পানি বাঁধ উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এতে বসতবাড়ি প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি লবণাক্ত পানিতে নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি ও মাছের ঘের। বারবার ভিটেমাটি হারিয়ে এখনো বাঁধের ওপর আশ্রয় পাথরঘাটার জিনতলা এলাকার মনোয়ারা বেগম গত ১১ বছরে চারবার বসতভিটা হারিয়েছেন। নদীভাঙনে বারবার সর্বস্ব হারিয়ে বর্তমানে তেঁতুলবাড়িয়া এলাকায় একটি ভাঙা বেড়িবাঁধের ওপর বসবাস করছেন তিনি। একই এলাকার সুলতান আকন জানান, নদীভাঙনে তার দুই একর জমি বিলীন হয়ে গেছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভোটের সময় প্রার্থীরা এসে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কত প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে সেই কথা আর কেউ রাখেন না। আরেক ক্ষতিগ্রস্ত কবির মাঝির অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে না তুলে নামমাত্র সংস্কারকাজ করে। দুর্বল এসব কাজের কারণে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। তার দাবি, এতে নদীভাঙন ঠেকানো তো দূরের কথা, সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও কর্মকর্তারা লাভবান হচ্ছেন। পাথরঘাটার কালমেঘা এলাকার ৩৫ বছর বয়সী রাজু মিয়া জানান, বিষখালী নদীর ভাঙনে তাদের জমির বেশির ভাগই বিলীন হয়ে গেছে। এখন মাত্র ৪০ শতাংশ জমি টিকে আছে। আমাদের এখানে দ্রুত কংক্রিট ব্লক দিয়ে বাঁধ রক্ষা করা দরকার। তা না হলে নদীর গ্রাস থেকে বাকি জমিটুকুও রক্ষা করা যাবে না। বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল হান্নান প্রধান বলেন, প্রতি কিলোমিটার বেড়িবাঁধ স্থায়ীভাবে কংক্রিট ব্লক দিয়ে সুরক্ষা দিতে প্রায় ৯০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় বরাদ্দ সংকটে কাজ এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। জিওব্যাগ ও কংক্রিট ব্লক দিয়ে নদীর তীর রক্ষায় দুটি প্রকল্প প্রস্তাব বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে জমা রয়েছে। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে আরও যাচাই-বাছাই করে নতুন প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হবে। বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান ওয়ালীউল্লাহ বলেন, জেলার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জোর প্রচেষ্টা চলছে। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা আমার প্রধান নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল। কাজটি করতে একটু সময় লাগছে। তবে আমার বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন। উল্লেখ্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে বরগুনার উপকূলীয় মানুষের লড়াই দীর্ঘদিনের। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরের ভয়াবহ আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে যায় বরগুনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের উপকূল। প্রাণহানি, ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, ফসলি জমি ও মৎস্য সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে উপকূলের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বরগুনা জেলায় প্রাণ হারান প্রায় ৩৬৩ জন। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতেও উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের আম্পান, ২০২১ সালের ইয়াস ও ২০২৪ সালের ঘুর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবেও উপকূলীয় বাঁধের দুর্বলতা নতুন করে সামনে আসে। এসব ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল জলোচ্ছ্বাস ও ঢেউয়ের আঘাতে বিভিন্ন সময় বেড়িবাঁধের বড় অংশ ভেঙে যায়। কোথাও বাঁধের মাটি সরে গিয়ে তৈরি হয় গভীর ক্ষত। অনেক ক্ষেত্রে দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ স্থায়ীভাবে সংস্কার না করায় পরবর্তী দুর্যোগে সেসব স্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে জলোচ্ছ্বাসের পানি সহজেই লোকালয়ে প্রবেশ করে তলিয়ে দেয় বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত থাকায় কৃষিজমির উৎপাদনক্ষমতা কমে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুকুর, মাছের ঘের ও সুপেয় পানির উৎস। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই নতুন করে নদীভাঙনের শিকার হতে হয় বরগুনা উপকূলের মানুষকে। সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। |
||

