![]() কে যায়? জীবনানন্দ দাশ নাকি মুনির হোসেন…শওকত মিল্টন, অ্যাডিশনাল চিফ রিপোর্টার, এটিএন বাংলা ১৫ September ২০১৩ Sunday ৪:২৫:৫৩ PM
![]() সাংবাদিক মুনির হোসেন – ফাইল ফটো রাতের আঁধার চিরে তীব্র আওয়াজ কানে এসে লাগে। মেঘ শিরীষ বৃক্ষের পাতার সাথে বাতাসের সখ্যতায় সেই আওয়াজকে আরও রহস্যময় করে তোলে। রাজা বাহাদুর সড়কের বাতিগুলো সন্ধ্যায় হয়ে যাওয়া বৃষ্টির জলে তখনও ঘোলাটে, মাঝে মাঝে দু একটি রিক্সা, ইজি বাইক বেলা শেষের যাত্রী নিয়ে ফিরছে, টুং টাং শব্দে বেল বাজিয়ে। ছোট বেলায় এমন আওয়াজ শুনলে ভয় পেতাম। বহুদিন রাতের এমন রূপের দেখা মেলেনি। বহুদিন শুনিনি পারিচিত এই প্রাণীর ডাক। তারা সংখ্যায় একটি বা দুটি না ৪/৫ টি তো হবেই। ব্রাউন পার্কের প্রশস্ত বারান্ধায় বসে আধো আলোতে স্মৃতির ঝাপি খুলে বসেছি। আমি শব্দের উৎসের সন্ধানে দূর আঁধারে চোখ রাখি। তা দেখে জাকির বলে ওঠে, শেয়ালের ডাক। আমি ভাবতে থাকি এই শহরে এখনও জীবনানন্দ দাশের চরিত্ররা হারিয়ে যেতে পারেনি, তাই এখনও মেলে শেয়ালের ডাক। সন্ধ্যার আকাশে সুদর্শন পোকা ওড়ে, রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে ধবল বক উরে যায় নীড়ে। নবমীর চাঁদ নয়, তবে কি অমানিশার এমন রাত দড়ি হাতে হিজলের গাছের কাছে যাবার সময়? সব কিছু থাকার পরেও শুধু কি মৃত্যুর সাধ নিতেই কি আত্মহত্যার আয়োজন? প্রতিটি মানুষেরই জীবনে একবার বোধকরি আত্মহত্যার প্রবনতা জাগে। মনে পড়ে একবার আমরা অনেকে মানে বরিশালের স্বপন, পুলক, লিটন আর চর-ফ্যাশনের আলাল, মঞ্জু সাগরে ছিলাম ট্রলারে, সে রাতটি ছিল কোজাগরী পূর্ণিমার রাত। তরলে গরলে অনেক রাত। হটাত মনে হল বিশাল চাঁদ থেকে একটা আলোর রাস্তা নেমে এসেছে আমাদের ট্রলারের কাছে। আমি এবং আমাদের কেউ কেউ সেই চাঁদের আলোর রাস্তায় হাটতে ইচ্ছে প্রকাশ করে বসি। বিষয়টি আমাদের সাথে থাকা চর পাতিলার বিশাল দেহী বাদশা টের পেয়ে, ঠেলে বসিয়ে ট্রলার ছেড়ে দেয়। সেকথা এখনো মনে হলে গা শিউরে ওঠে। একেই চন্দ্রাহত বা লুনাটিক বলে, সেদিন বুজেছি। ছেড়ে ছেড়ে ডাকছে শেয়ালের দল। আমাদের স্মৃতির ঝাপি থেকে বের হন মুনির হোসেন। বরিশালের এক সময়ের আইকন-অন্তত আমাদের কাছে। তাঁর কথা মনে পরতেই চুরি যাওয়ার ভয়ে নিজের অজান্তেই টেবিলে থাকা গ্লাসটা শক্ত করে ধরি। তার সাথে আমাদের অনেক বিখ্যাত দিন কেটেছে। বিখ্যাত এই অর্থে তিনি আমাদের বুজতেন, আমরা কি তাঁকে বুজতে পেরেছি? জানিনা, হয়ত হাঁ অথবা না। তার একটি বিখ্যাত কবিতা ছিল একজন পঙ্গু, একজন অন্ধ আর একজন ভিখিরি নিয়ে। তবে তার এই কবিতা ছোট আকারে প্রকাশ হয়ে ছিল যতদূর মনে পড়ে লোকবাণী পত্রিকার সাহিত্য পাতায়। তবে আমি তার ভরাট গলায় বহুবার শুনেছি, প্রথমবার এক নিদাঘ দুপুরে খবর অফিসে। তার সাথে আড্ডার শরীক হয়েছি বহুবার, এমনকি ভাবী বরগুনা গেলে খালি বাসায়। আমার জীবনসঙ্গী বীথিকে সে ফোনে কখনও ভাল ভাষায় কথা বলেছেন- এমন নজির নেই। এমনটা আমরা স্বাভাবিক মনে করতাম অন্তত তাঁর বেলায়, বীথিও তাঁকে যা তা ভাষায় বলত। বহুদিন কথায় না পেড়ে মুনির ভাইকে বলতে শুনেছি, ‘এই ছেমরি। আমি তোর ভাশুর না। মুখ সামলাইয়া কথা বলিস।’ এমনটাই ছিলেন তিনি। বাসায় গেলে টেবিল উলটে দেখেচেন কি রান্না হয়েছে। পছন্দ হলেই খেতে বসে যেতেন। আমার সাথে তার অনেক কিছুর মিল ছিল, এই যেমন দুজনের নামের সুরুটা ম দিয়ে। দুজনে কাজ করেছি দক্ষিণাঞ্চল, খবর, জনকণ্ঠ এমনকি তার অল্প সময় বেঁচে থাকা পত্রিকা ‘ইতিবৃত্ত’। তার সাথে মতের অমিলও ছিল, তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগার, আর আমি বামপন্থি। তারপরেও সম্পর্কের ঘাটতি হয়নি। জাকির বলে ওঠে, মেজদার কারনেই বরিশাল চলে আসা। মুনির হোসেনের স্বপ্ন ছিল, তিনি স্বপ্ন দেখতেন, দেখাতেন। এই স্বপ্নবাজ মানুষটি আমাদের ভেতর থেকে একদিন স্বপ্ন দেখার দেশে পাড়ি জমালেন। জাকির আমাকে বলছিল, মুনির ভাই কেমন মানুষ ছিলেন। পরিবার নিয়ে তিনি কখনও কোন চিন্তা করতেন না। ভালবেসে বিয়ে করেও কোনদিন আদিখ্যেতা করেননি। এক ছেলে আর এক মেয়ে নিয়ে এই শহরে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। জীবনানন্দ দাশের সাথে মুনির হোসেনের কোথায় যেন একটা মিল রয়েছে। প্রায় নিশ্চুপ জীবনানন্দ দাশের সাথে সারাদিন বক বক করা মুনির হোসেনের মিলটা কোথায় হতে পারে? জীবনানন্দ দাশের বরিশাল প্রেম ছিল প্রশ্নাতীত, মুনির হোসেনও ছিলেন তাই। শুধু একটা এসএমএস এর কথা মনে পড়ে। তিনি লিখেছিলেন, ‘আবার আসিব ফিরে এই বরিশালে——।’ বরিশাল ছাড়া তাঁকে কল্পনা করা যেতো না। ঢাকায় থেকে প্রতিষ্ঠা পাবার মোহ তাঁর দেখিনি। রাত বাড়ে, ব্রাউন পার্ক এর আলো আরও কমে আসে, আড্ডাবাজরা ক্লাব ছেড়ে চলে গেছেন সেই কখন। ক্লান্ত টেবিল, গ্লাস আর রেফ্রিজারেটরের গুন গুন শব্দ, যেন কারো কান্নার আওয়াজ। আমরাও ডেরায় ফেরার জন্য উঠে দাড়াই, চাপ চাপ অন্ধকারে রাজা বাহাদুর সড়ক ধরে কার যেন ছায়া মিলিয়ে যেতে থাকে। কে যায়? জীবনানন্দ দাশ নাকি মুনির হোসেন, যারা এই শহর থেকে কখনও যেতে চাননি, তারাই হয়ত নির্জন রাতকে ভালবেসে পথে নেমেছেন এই রাতে। – প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। |
||

