" />
AmaderBarisal.com Logo

ব্লগ থেকে নেয়া

মৃত্যুর রতিমুদ্রা – জীবনানন্দ

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়
আমাদেরবরিশাল.কম

১৭ February ২০১৪ Monday ২:১২:১৫ AM

sanjoy-mukhopadhay সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

কার্ত্তিক মাসে আজ আর হিম পড়ে না। রাসবিহারীর ট্রামলাইনে আজ আর ঘাস নেই। তবু সম্মুখ সমরে পাড়ি বীরচূড়ামণি জীবনানন্দ দাশ-কে আমি দেখতে পাই দেশপ্রিয় পার্কের অদূরেই। আকাদেমিয়ার আপাত নিরীহ দাঁত-নখ যে সমরপতিদের অনুরূপ – একথা জানার জন্য জীবনানন্দ দাশকে ফুকো পড়তে হয়নি। শব থেকে উৎসারিত স্বর্ণের বিস্ময় আমাদের সভ্যতাকে যে সমস্ত মেধাবী যন্ত্রণা উপহার দিয়েছে তা কখনও উত্তর কলকাতার মেসবাড়ি, কখনও দক্ষিণ কলকাতার ফুটপাথ থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে সৌন্দর্যের সারা‍ৎসার – নশ্বরতা থেকে অমরতা।

আমাদের অবিরাম পতনের মধ্যে আমরা কি চন্দন ও মালার কোন দেবতাকে বেছে নেব পরিত্রাণের আলোকবিন্দু হিসেবে? না, বরং দময়ন্তীর স্বয়ংম্বর সভায় যেমন ছদ্মবেশী দেবতাদের থেকে মানুষ নলকে আলাদা করে যেমন চেনা গিয়েছিল। তার দেহে ঘামের দানা ছিল‌, তার মালায় ফুল শুকিয়ে এসেছিল । তেমনভাবেই আমরা আমাদের স্বেচ্ছা-নির্বাচিত প্রান্তিকতা উৎসর্গ করেছি জীবানন্দ দাশকে। অবিরাম আবৃত্তি, নির্দেশপ্রাপ্ত গীতিকার, রাষ্ট্র-অনুমোদিত বাগ্মীদের এই নরকের মধ্যেই আমাদের খুঁজে পেতে হবে পরিত্যক্তদের কক্ষ। তাঁকে আর আমাদের মডেলমথিত উড্ডয়নশীল প্রদেশের কথ্যভাষায়, পয়ার ও উদ্ধৃতিতে ধরা যাবে না। শাপগ্রস্ত আমাদের ভাষাশহরের শরীরকে পরিত্যাগ করে তার কাব্যের আত্মা চলে গেছে অন্যত্র। আমাদের, অতএব খুঁজে পেতেই হবে প্রত্যাখ্যানের মুদ্রা। জীবনানন্দই শেষ বিপ্লব। বৃহন্নলা সমাবেশে তিনিই এখনও বিবেক ও পোতাশ্রয়। যার রাজনৈতিক আশ্রয় ছিল না, সাহিত্যকুলপতিদের বৈঠকখানা যাকে নিরাপত্তাচ্যুত করেছে, এমন একজন যিনি বিপন্নতাকে বন্দনা করেছেন, বিপন্নতার দ্বারা ব্যবহৃত হবেন এরকম সংকল্প থেকে জীবনকে শাসন করেছেন তাঁর রচনা যদি প্রসাধনগ্রন্থ হয়, মায়ার দর্পণ হয় তাকে আমরা কীভাবে সুরক্ষিত রাখব?

কবিকে আর্বান পুরোহিত অথবা পপচারণ হতে হবে না। সমাজ তাঁর কাছ থেকে আরোগ‍্য কামনাও করে না। তিনি দৈনিক -সাপ্তাহিক-মাসিক কোনওকিছুরই সম্মান ও প্রচার বাড়াতে পারেন না। এ পর্যন্ত বিজ্ঞাপনকর্মী ও ইমপ্রেসারিওরা তাকে দেখে থতমত খেয়েছে। একজন কবি তাহলে কী করেন? তিনি আমাদের ভাষাস্থাপত্য পালটে দেন। তার অন্তর্ঘাতনা এটুকুই যে সম্পূর্ণ নিঃসম্বল ও একাকী কোনও ছত্রীসেনার মতো আমাদের চিন্তার বিন্যাস তিনি পালটে দেন আমাদের অজ্ঞাতেই।

যেমন ধরা যাক, হাতের পাঁচ, কোনও উদাহরণ। ‘নীড়’ শব্দটি বাংলা কবিতায় অনেক কিছুর মত খ্যাতি পায় রবীন্দ্রনাথের হাত যশে। “পাখি আমার নীড়ের পাখী” পদবন্ধ যখন জীবনানন্দের হাতে “পাখি নীড়ের মতো” হয়ে গেল – এ যেন হেগেল থেকে মার্কস, এক অলৌকিক উল্টে দেওয়া – আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেলাম দ্বিতীয়টিতে। সংস্কার থেকে শব্দ প্রতিস্থাপনের দায় কবির মৌলিক দায়। একেই ভাষাবিহার বলে। আইজেনস্টাইন একবার বলেছিলেন, এল গ্রেকো ও ভ্যানগগের শ্রেষ্ঠ আত্মপ্রতিকৃতি হল তাদের ল্যান্ডস্কেপসমূহ। প্রাথমিক বিস্ময়ের পর আমরা বুঝতে পারি শিল্পীরা যে অনিঃশেষ অবলোকন করে থাকেন তা শেষ পর্যন্ত নিজেকেই দেখা। লেখকেরা লেখে হয়ত ডান হাত দিয়ে। কিন্তু তাতে পড়ে বা হাতের বুড়ো আঙুলের ছাপ। এ ছাপের কোনও নকল হয় না। যার বৃদ্ধাঙ্গুলী নেই, সে লেখকই নয়। মৃত্যুকে ভাষাশিল্পী জীবনানন্দের উপহার ওই বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ। পৃথিবীতে তো আর দ্বিতীয় জীবনানন্দ দাশ হয় না।

লেখক : ব্লগার এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম স্টাডিজের অধ্যাপক।





প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার    সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০। ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।