
চারকোনা ঘর ‘আরজ মঞ্জিল’
তৌফিক মারুফ আমাদেরবরিশাল.কম ১৫ March ২০১৫ Sunday ৮:০৯:১৯ AM
চারকোনা ঘর। দেয়াল আছে, ছাদ আছে, দরজা-জানালা নেই। ভেতরটা ফাঁকা। না, একেবারে ফাঁকা নয়। মাটির মেঝেতে রাখা আছে একটি কলস। কলসে পানি নেই, অন্য কোনো খাবারও নেই। আছে কিছু চুল, নখ। ঘরের ছাদের ওপর বিশেষ ধরনের ফলকে লেখা ‘আরজ মঞ্জিল’।
স্থাপনাটি আসলে ঘর নয়। চার ফুট বাই আট ফুট মাপ। উচ্চতা আড়াই ফুটের মতো। লোকে বলে, কবর। দেহ ছাড়া কি কবর হয়! এই কবরে তো লাশ নেই, ছিলও না। কবরের প্রশ্ন এড়িয়ে অনেকেই সহজ সমাধান দেন ‘সমাধি’ বলে। তবু কারো কারো কৌতূহল থেকেই যায়। কার সমাধি এটা। আরজ আলী মাতুব্বরের! কিন্তু তিনি কি কবরে, সমাধিতে বিশ্বাস করতেন! তিনি তো গেছেন সত্যের সন্ধানে! নিজের দেহ নিজেই দিয়ে গেছেন মানুষের কল্যাণে, কবরে নয়।
১৫ মার্চ চারণ দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের মৃত্যু দিবস। বাংলা ১৩৯২ বঙ্গাব্দের ১ চৈত্র স্বশিক্ষিত এই আলোকিত মানুষটির মৃত্যু হয়, মৃত্যুর আগে যিনি মানুষের মাঝে মুক্তচিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন নিজের অপরিসীম যুক্তিবাদের আলোকে, যিনি সৃষ্টিধর্মের আলোকবর্তিকায় ধর্মীয় অন্ধকার দূর করার স্বপ্ন দেখেছেন, দেখিয়েছেন।
বরিশালের লামচড়ি গ্রামের কাদামাটির ভেতর বেড়ে ওঠা অসাধারণ জ্ঞানী আরজ আলী মাতুব্বর যুদ্ধ করেছেন নিজের চারপাশ ঘিরে থাকা ধর্মীয় গোঁড়ামি-অন্ধকার কাটানোর জন্য। তিনি লিখিতভাবে তাঁর দেহ বরিশাল শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজে দান করে যান। মেডিক্যালের ছাত্রছাত্রীরা যাতে তাঁর দেহ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রয়োজনমতো নিজেদের শিক্ষার কাজে লাগাতে পারে, সে জন্যই এই দেহদান। মৃত্যুর পর তা-ই করেন স্বজন ও সতীর্থরা। তবু স্মৃতিচিহ্ন রাখার জন্য শুধু কিছু চুল ও নখ সংরক্ষণ করা হয়।
লামচড়ি গ্রামের নিজ বাড়ির আঙিনায় নিজের প্রতিষ্ঠিত আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরি চত্বরে কবরাকৃতির একটি পাকা স্থাপনার ভেতর কলসে রাখা আছে ওই স্মৃতিচিহ্নটুকু। আরজ আলী মাতুব্বরের মায়ের কবরের পাশেই তাঁর সমাধি স্থাপন করা হয়েছে। জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে আরজ আলীর প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরিটি এখন অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকে।
 বাংলা ১৩৯২ সালের ১লা বৈশাখ নববর্ষে বাংলা একাডেমী আরজ আলী মাতুব্বরকে আজীবন সদস্য পদ প্রদান করে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে বাংলা একাডেমি। ছবিতে সর্বডানে আরজ আলী মাতুব্বর।
গত ২৫ বছরে একাধিকবার ওই লাইব্রেরির নামমাত্র সংস্কার করা হয়। এমনকি তাঁর জন্ম-মৃত্যু দিবসও পালিত হয় তুলনামূলক দায়সারাভাবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে আরজ আলী মাতুব্বরের স্মৃতিরক্ষায় একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হবে বলে অনেক দিন ধরে শোনা গেলেও তা হয়নি। ফলে একদিকে যেমন দেশ-বিদেশের আরজভক্ত এবং পর্যটকরা তাঁর ভূমিতে এসে হতাশ হন, ব্যথিত হন, তেমনি তাঁর সম্পর্কে নতুন প্রজন্ম বেশি করে জানাশোনার সুযোগ পাচ্ছে না। যেমনটা হচ্ছে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজেও। ওই কলেজের বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই জানেন না, চারণ দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের দেহদান হয়েছে তাঁদেরই প্রতিষ্ঠানে।
শিক্ষার্থীরা বলেন, কলেজ থেকে এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানতে পারেন না তাঁরা।আরজ আলী মাতুব্বরের নামে একটি ট্রাস্ট থাকলেও তা অনেক দিন ধরেই অকার্যকর। ঢাকা ও বরিশালে তাঁর স্মরণে মাঝেমধ্যে কিছু অনুষ্ঠান হয় বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে। কেউ কেউ তাঁর পাণ্ডুলিপি হাতিয়ে নেয়, তাঁকে নিয়ে এটা-সেটা করার কথা বলে দায় সারে। পরিবারের পক্ষ থেকে বারবারই অভিযোগ করা হয়, আরজ আলী মাতুব্বরের মূল্যবান পাণ্ডুলিপিসহ বেশ কিছু উপকরণ বিভিন্ন অজুহাতে বেহাত করেছে কোনো কোনো প্রকাশক ও সংস্কৃতিসেবী।
আরজ আলী মাতুব্বরের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘সত্যের সন্ধান’ (১৯৭৩), ‘সৃষ্টিরহস্য’ (১৯৭৭), ‘অনুমান’ (১৯৮৩) ও ‘মুক্তমন’ (১৯৮৮)। এসব বইয়ের পরতে পরতে তিনি দেখিয়েছেন যুক্তির আলোয় মুক্তির পথ, যে আলোয় আলোকিত হওয়ার অবারিত সুযোগ রয়েছে আমাদের নতুন প্রজন্মের। আঁধার বিনাশে পথ সত্যের সন্ধানে!
[লেখাটি দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত হয়েছিল। লেখকের অনুমতি নিয়ে আমাদের বরিশাল ডটকমের পাঠকদের জন্য লেখাটি পুন:প্রকাশ করা হলো।]
সম্পাদনা: বরিশাল ডেস্ক
প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
|