" />
AmaderBarisal.com Logo

আলোর দিশারী আরজ আলী মাতুব্বর

খসরু নোমান
আমাদেরবরিশাল.কম

১৫ March ২০১৫ Sunday ১২:০৩:৩৯ AM

aroj-ali-matubbar-philosopher আলোর দিশারী আরজ আলী মাতুব্বরআরজ আলী মাতুব্বর। প্রখর যুক্তিবাদী, মুক্ত চিন্তার প্রতীক অনন্য এক দার্শনিকের নাম। একজন বিদগ্ধ জ্ঞানসাধক ছিলেন আরজ আলী। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না, ছিলেন স্বশিক্ষিত। তার কোনো ডিগ্রি ছিল না কিন্তু ছিল জিজ্ঞাসা ও অদম্য জ্ঞানস্পৃহা। আসলে প্রকৃত শিক্ষিত বা জ্ঞানীরা সবাই স্বশিক্ষিতই হয়ে থাকেন। তিনি ছিলেন প্রকৃত জ্ঞানান্বেষী ও আলোর দিশারী। সারাজীবন জ্ঞানালোকের সন্ধান করেছেন মাতুব্বর।

বলা বাহুল্য, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করেই আমরা যারা নিজেদের শিক্ষিত বা জ্ঞানী মনে করি তারা একথা জানলে বিস্মিত হবো যে, আরজ আলীর দর্শনভাবনা বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য। বিশ্ববিদ্যালয় তো দূরের কথা স্কুলের চৌকাঠও পেরোননি মাতুব্বর। অথচ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবর্জিত সেই ব্যক্তি আজ বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে মুক্তবিশ্বের মুক্তচিন্তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘know thyself- ‘নিজেকে জান’। আরজ আলী মাতুব্বর ‘নিজেকে জানা’র নিরলস অধ্যবসায়ে আমৃত্যু নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন। জীবনের বিদ্যাপীঠ থেকে তিনি যে জ্ঞান অর্জন করেন তার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাপীঠের তুলনা করা অমূলক। আরজ আলী বলেন, ‘বিদ্যাশিক্ষার ডিগ্রি আছে কিন্তু জ্ঞানের কোনো ডিগ্রি নেই। জ্ঞান ডিগ্রিবিহীন ও সীমাহীন। সেই অসীম জ্ঞানার্জনের মাধ্যম স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, তা হচ্ছে লাইব্রেরি।’ আর এই লাইব্রেরি ছিল তার জীবনের আনন্দসুধা, প্রধান অনুষঙ্গ।

জ্ঞানসন্ধানী এ দার্শনিককে কোনো প্রতিকূলতাই টলাতে পারেনি। জ্ঞানের প্রবল তৃষ্ণা ও আকাক্সক্ষাকে পাথেয় করে নিজ গ্রাম থেকে ১২ কিলোমিটার দূরের বরিশাল গণগ্রন্থাগারে নিয়মিত যাতায়াত করতেন আরজ আলী। নুন আনতে পান্তা ফুরাতো তবুও বালক বয়স থেকেই তার ছিল বই পড়ার প্রচুর নেশা। নিজের বই ছিল না বলে সহপাঠীদের বই ধার করে পড়ত বালক আরজ আলী। প্রথমে মক্তবে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু অর্থাভাবে ওই মক্তব বন্ধ হয়ে গেলে এবং লামচারি গ্রামে আর কোনো মক্তব বা স্কুল না থাকায় তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথ বন্ধ হলেও লেখাপড়া বন্ধ হলো না। কখনো বই ধার করে কখনো বা পাঠাগার থেকে বই এনে জ্ঞানতৃৃষ্ণা মেটাতেন কৃষক আরজ আলী মাতুব্বর। কৃষিকাজের পাশাপাশি আমিন বা জমি জরিপকারীর কাজও করতেন তিনি।

নিজ গ্রামবাসীদের আলোকিত করতে প্রায় তিন যুগ আগে ষাট হাজার টাকা খরচ করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘আরজ মঞ্জিল’ নামের লাইব্রেরি। জ্ঞান অন্বেষণ করতে গিয়ে তিনি যে বৈরী পরিবেশের মুখোমুখি হয়েছিলেন তার গ্রামের ভবিষ্যৎ প্রজš§কে যাতে সে অবস্থায় পড়তে না হয়, সে জন্য তিনি ওই গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন জ্ঞানের বাতিঘর। যুক্তিপূর্ণ ভাষায় লেখালেখির মাধ্যমে ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ করেন আরজ আলী। অকুণ্ঠচিত্তে তিনি বলতেন, ‘ধর্ম হলো মানবতাবাদ।’

আরজ আলী ১৯০০ সালে (বাংলা-১৩০৭) বরিশাল শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে লামচারি গ্রামে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আরজ আলীর শৈশবেই তার বাবা এন্তাজ আলী মাতুব্বর মারা যান। এরপর থেকেই মাকে নিয়ে রূঢ় বাস্তবতা ও বৈরী সময়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে শেখেন তিনি। স্নেহময়ী মায়ের মৃত্যু-পরবর্তী একটি ঘটনা তার মনোজগতে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। মায়ের স্মৃতি রক্ষার্থে তার লাশের ছবি তোলেন আরজ আলী। এর প্রতিক্রিয়ায় সংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামবাসীরা তার মায়ের জানাজা না পড়েই লাশ ফেলে চলে যায়।

এ ঘটনা আরজ আলীর মনে গভীর দাগ ফেলে। এরপর থেকেই তিনি অন্ধবিশ্বাস, অজ্ঞানতা, যুক্তিহীনতা থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে শুরু করেন। আমৃত্যু তিনি কুসংস্কারাবদ্ধ মানুষকে আলোর পথে আনার সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন। দেনার দায়ে পৈতৃক কৃষিজমি হাতছাড়া হয়ে যায়।

যে ঘরে তিনি থাকতেন তার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘দৈর্ঘ্যে পাঁচ হাত ও প্রস্থে চার হাত। ঘরখানা তৈরির সরঞ্জাম ছিল ধইঞ্চার চাল, গুয়াপাতার ছাউনি, মাদারের খাম, খেজুর পাতার বেড়া ও ঢেঁকি লতার বাঁধ। আর তারই মধ্যে ছিল ভাতের হাঁড়ি, পানির কলসি, পাকের চুলো, কাঁথা-বালিশ সবই। রাতে শুতে হতো পা গুটিয়ে। ঘুমের ঘোরে কখনো পা মেলে ফেললে হয়তো ভাতের হাঁড়ি কাত হয়ে পড়ত বা জলের কলসি পড়ে গিয়ে কাঁথা-বালিশ ভিজে যেত। একটি এঁটেকলা দ্বারা তখন আমরা মায়ে-পুতে পান্তাভাত খেতাম দু’বেলা।’ মাতুব্বরের জ্ঞানান্বেষী মনন ও অদম্য স্পৃহার কাছে এরকম বৈরী পরিস্থিতি ও পরিবেশ হার মানতে বাধ্য হয়।

পশ্চাৎপদ সমাজ সাধারণত যৌক্তিক প্রশ্ন উত্থাপনের বিষয়টিকে সহজে মেনে নিতে চায় না। কিন্তু এ দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে সমর্থ হয় আরজ আলীর যুক্তিবাদী মন। তিনি মানুষের বিশ্বাস, লৌকিক প্রথা, যুক্তিহীন মতবাদ, বিজ্ঞানহীন বিধিবিধান ও অনুশাসনকে কেন্দ্র করে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করতেন। আর এ প্রশ্নগুলোকে একত্রিত করে তিনি লিখেন ‘সত্যের সন্ধানে’ নামের একটি বই। বইটি তিনি লেখেন মাত্র একমাস দশদিনে (বাংলা-১৩৫৯ সালে)। কিন্তু নানা বাধাবিপত্তি ও নিষেধাজ্ঞা পেরিয়ে বইটি আলোর মুখ দেখতে ২১ বছর সময় লেগেছিল। তার ওই প্রশ্নগুলো যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের চিন্তা-চেতনায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। ধর্ম ও মনুষ্যজীবন নিয়ে তার মনে কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা উদয় হলে তিনি সে বিষয়ের ওপর ব্যাপক পড়াশোনায় মগ্ন হতেন।

মুক্ত চিন্তার প্রতিভু আরজ আলী মাতুব্বর ১৯৮৫ সালে (বাংলা-১৩৯২) ৮৬ বছর বয়সে মারা যান। তিনি এতটাই বিজ্ঞানমনস্ক ছিলেন যে, মৃত্যুর পরও তার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। মরদেহটি মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের জন্য উৎসর্গ করে যান। মরণোত্তর চক্ষুও দান করেন তিনি।

বাংলা একাডেমী প্রকাশিত জীবনী গ্রন্থমালা সিরিজের ‘আরজ আলী মাতুব্বর’ বইটি সবার বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অবশ্যই পড়া উচিত। কেননা এতে এ দার্শনিক সম্পর্কে তারা শুধু জানতেই সমর্থ হবে না, মুক্তবুদ্ধি ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হওয়ারও প্রেরণা পাবে।



সম্পাদনা: বরিশাল ডেস্ক


প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার    সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০। ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।