
স্ম র ণ
আমাদের শেরে বাংলা
আমাদেরবরিশাল.কম
২৭ April ২০১৫ Monday ৪:৫৫:১৯ PM
২৭ এপ্রিল। অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৬২ সালের এই দিনে সকাল ১০টা ২০ মিনিটে ৮৬ বছর ৬ মাস বয়সে মৃত্যুবরণ করেন গরীবের নেতা বরিশালের এই কৃতি সন্তান।
ফজলুল হক সাধারণ মানুষের কাছে ‘হক সাহেব’ নামে পরিচিত ছিলেন। তবে, কেবল এই একটি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ ছিলেন না তিনি। বহু গুণের অধিকারী এ মানুষটিকে বলা হতো ‘শেরে বাংলা’ অর্থ্যাৎ ‘বাংলার বাঘ’।
পাকিস্তানের দ্বিতীয় সবোর্চ্চ পদক “হেলাল-ই-পাকিস্তান” খেতাব প্রাপ্ত ফজলুল হক ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, গভর্নর, অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রী। তারই হাত ধরে গড়ে ওঠে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ।
২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা, ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতিতে ‘শহীদ মিনার’ নির্মাণ, বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বর্ধমান হাউসকে বাংলা ভাষা গবেষণা কেন্দ্র বা বাংলা একাডেমী ঘোষণা করা, জমিদারি ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদের ব্যবস্থা নেওয়া- এ সুপারিশগুলো করেন তিনি।
১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর বরিশাল জেলার (তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলা) রাজাপুর থানার সাতুরিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন ফজলুল হক।
কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ এবং সাইদুন্নেসা খাতুনের একমাত্র ছেলে এ. কে. ফজলুল হকের প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু হয় গৃহ শিক্ষকদের কাছে আরবি, ফার্সি এবং বাংলা ভাষা শেখার মধ্যে দিয়ে নিজ বাড়িতে।
১৮৮১ সালে তিনি বরিশাল জিলা স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন।
১৮৮৯ সালে ফজলুল হক প্রবেশিকা পরীক্ষায় তৎকালীন ঢাকা বিভাগে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ফজলুল হক তার স্মৃতিশক্তির কারণে শিক্ষকদের খুবই স্নেহভাজন ছিলেন।
১৮৯১ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ.এ. পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং নিজের মেধার কারণে ফজলুল হক ওই সময় প্রেসিডেন্সি কলেজের রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপক আচারয্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের দৃষ্টি কাড়েন।
এফ.এ. পাস করার পর তিনি গণিত, রসায়ন ও পদার্থ বিদ্যায় ১৮৯৩ সালে অনার্সসহ প্রথম শ্রেণীতে বি.এ. পাস করেন এবং ইংরেজি ভাষায় এম.এ. ক্লাসে ভর্তি হন।
পরীক্ষার মাত্র ৬ মাস আগে তাকে এক বন্ধু ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, ‘মুসলমান ছাত্ররা অঙ্ক নিয়ে পড়ে না, কারণ তারা মেধাবী নয়।’
এ কথা শুনে ফজলুল হক প্রতিজ্ঞা করেন তিনি অঙ্কশাস্ত্রেই পরীক্ষা দেবেন। এরপর, মাত্র ৬ মাস অঙ্ক পড়েই প্রথম শ্রেণীতে পাস করেন তিনি।
খেলাধুলার প্রতি ফজলুল হক খুবই আগ্রহী ছিলেন। তিনি প্রথম জীবনে নিজে বিভিন্ন খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন খেলাধুলার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
তিনি মোহামেডান ফুটবল ক্লাবের প্রতিষ্ঠার সময় থেকে জড়িত ছিলেন। এছাড়া দাবা, সাঁতারসহ বিভিন্ন খেলা পছন্দ করতেন।
এ. কে. ফজলুক হকের পূর্বপুরুষ আঠারো শতকে ভারতের ভাগলপুর থেকে পটুয়াখালী জেলার বাউফল থানার বিলবিলাস গ্রামে বসতি স্থাপন করেন।
এ বংশের একজন নাম করা ব্যক্তি ছিলেন কাজী মুর্তজা। তারই বংশধর কাজী ওয়াজেদের একমাত্র ছেলে ছিলেন এ. কে. ফজলুক হক। ফজলুক হকের পিতা কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ ১৮৪৩ সালে চাখারে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ালেখা করেন। বাংলার মুসলমানদের মধ্যে তিনি ষষ্ঠ গ্রাজুয়েট ছিলেন।
এ. কে. ফজলুক হক এম.এ. পাস করার পর নবাব আবদুল লতিফ সি. আই. ই.-এর পৌত্রী খুরশিদ তালাত বেগমের সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন।
১৮৯৭ সালে কলকাতার রিপন কলেজ থেকে বি.এল. পাস করে স্যার আশুতোষ মুখার্জির হাত ধরে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টে শুরু হয় এ. কে. ফজলুল হকের কর্মজীবন।
দু’বছর শিক্ষানবিশ কাজ করার পর ১৯০০ সালে তিনি সরাসরি আইন ব্যবসা শুরু করেন। বাবার মৃত্যুর পর ১৯০১ সালে তিনি বরিশালের ফিরে আসেন এবং বরিশাল আদালতে যোগদান করেন।
১৯০৩ – ১৯০৪ সালে বরিশাল বার এসোসিয়েশনের সহকারী সম্পাদক পদে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। এ সময়ই তিনি বরিশাল রাজচন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ ডক্টর হরেন্দ্রনাথ মুখার্জির অনুরোধে ওই কলেজে অঙ্কশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।
১৯০৬ সালে আইন ব্যবসা ছেড়ে ফজলুল হক সরকারি চাকরি গ্রহণ করেন।
পূর্ব-বাংলার গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলার তাকে ডেকে সম্মানের সঙ্গে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেন। সরকারি চাকরিতে তিনি কিছুদিন ঢাকা ও ময়মনসিংহে কাজ করেন। এরপর তাকে জামালপুর মহকুমার এস.ডি.ও হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।
বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে জামালপুরে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা তারই আন্তরিক প্রচেষ্টায় বন্ধ হয়।
১৯০৮ সালে এস.ডি.ও এর পদ ছেড়ে দিয়ে তিনি সমবায়ের সহকারী রেজিস্ট্রার পদ গ্রহণ করেন। এসময় তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে কৃষক শ্রমিকদের বাস্তব অবস্থা নিজের চোখে দেখেন। সরকারের সঙ্গে বনাবনি না হওয়ায় অল্পদিনের মধ্যেই তিনি চাকুরি ছেড়ে দিয়ে ১৯১১ সালে এ. কে. ফজলুক হক কলকাতা হাইকোর্টে যোগ দেন। কলকাতায় নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহর সভাপতিত্বে তাকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
শিল্প সাহিত্যের সঙ্গে এ. কে. ফজলুক হকের সান্নিধ্যও ঘটে বরিশালেই। কিশোর-কিশোরীদের জন্য এ সময় তিনি নিজের সম্পাদনায় “বালক” নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এর কিছুদিন পর তিনি “ভারত সুহৃদ” নামে যুগ্ম সম্পাদনায় আরও একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এ সময় কলকাতা থেকে প্রকাশিত “নবযুগ” পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
প্রখ্যাত বামপন্থি রাজনীতিবিদ কমরেড মুজাফফর আহমেদের প্রস্তাবে এ. কে. ফজলুক হক নবযুগের প্রকাশনাতে সাহায্য করতে সমর্থ হন। নজরুলের আগুন ঝরানো লেখার কারণে “নবযুগ” হু হু করে বিক্রি হতে লাগলো। কলকাতা হাইকোর্টের ইংরেজ বিচারপতি টিউনন ফজলুল হককে নিজের খাস কামরায় ডেকে নিয়ে বৃটিশ সরকার বিরোধী লেখার জন্য হুঁশিয়ার করে দেন।
কিন্তু ফজলুল হক ভয় না পেয়ে টিউননের কাছ থেকে ফিরেই নজরুলকে খবর দিয়ে বলেন, “আরও গরম লিখে যাও, ইংরেজ সাহেবদের টনক নাড়িয়ে দাও।”
একসময় বৃটিশ সরকার “নবযুগ” পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করে কাগজটি বন্ধ করে দিলেও হক সাহেবের চেষ্টায় আবার নবযুগ চালু হয়। তবে নজরুল নবযুগের কাজ ছেড়ে দেন।
১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল শুক্রবার সকাল ১০টা ২০ মিনিটে গরীবের নেতা এ. কে. ফজলুক হক ৮৬ বছর ৬ মাস বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
২৮ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত তার মরদেহ ঢাকার টিকাটুলি এলাকায় তার ২৭ কে. এম. দাস লেনের বাসায় রাখা হয়। ওইদিন সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে ঢাকার পল্টন ময়দানে তার জানাজার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাকে সমাহিত করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বরের পাশে তিন নেতার মাজার হিসেবে পরিচিত সমাধি সৌধে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দিনের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন আমাদের শেরে বাংলা অর্থাৎ বাংলার বাঘ এ. কে. ফজলুল হক।
লেখা: আবু তালহা
সম্পাদনা: বরিশাল ডেস্ক
প্রকাশক: মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন তালুকদার সম্পাদক: মো: জিয়াউল হক
সাঁজের মায়া (২য় তলা), হযরত কালুশাহ সড়ক, বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, মুঠেফোন : ০১৮২৮১৫২০৮০ ই-মেইল : hello@amaderbarisal.com
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
|