Home » পিরোজপুর » মঠবাড়িয়া » মঠবাড়িয়ায় সোয়া হাতের জুতার গল্প, ২০০ বছরের কুঠিবাড়িতে যত রহস্য
২০ September ২০২৬ Sunday ২:২৫:২৭ PM
মঠবাড়িয়ায় সোয়া হাতের জুতার গল্প, ২০০ বছরের কুঠিবাড়িতে যত রহস্য
মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি:
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা ইউনিয়নে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো একটি কুঠিবাড়ি। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘ক্যাসপার সাহেবের কুঠিবাড়ি’ নামে পরিচিত। প্রায় সোয়া ৯ একর জায়গাজুড়ে থাকা এই স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জমিদারি পরিচালনা, খাজনা আদায়, বিচারকার্য, পুণ্যাহ উৎসবসহ নানা ইতিহাস ও লোককথা। তবে দীর্ঘদিনের অযত্ন আর সংস্কারের অভাবে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এখন জরাজীর্ণ।
স্থানীয়দের মুখে সবচেয়ে বেশি শোনা যায় কুঠিবাড়ির ‘সোয়া হাতের জুতা’র গল্প। কথিত আছে, খাজনা বকেয়া রাখা কিংবা অপরাধের অভিযোগে প্রজাদের শাস্তি দিতে সোয়া হাত মাপের একজোড়া জুতা ব্যবহার করা হতো। ওই জুতা দিয়ে অপরাধী প্রজাদের পেটানো হতো বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে এ বিষয়ে কোনো লিখিত দলিল পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, আঠারো শতকের গোড়ার দিকে ইংরেজ জমিদার এডওয়ার্ড প্যারি ক্যাসপার এখানে কুঠিবাড়ি নির্মাণ করেন। সাপলেজায় আসার পর স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তি ফরাজউল্লাহ তাকে জমি উপহার দেন বলে প্রচলিত আছে। পরে সেখানে ক্যাসপারের জমিদারি বিস্তৃত হয়।
একসময় পৌষ মাসের শেষদিকে এই কুঠিবাড়িতে আয়োজন করা হতো পুণ্যাহ উৎসব। খাজনা আদায়ের পাশাপাশি উৎসবে জাদু প্রদর্শনী, লোকগান, যাত্রাপালা ও নিমাই সন্ন্যাস পালার আয়োজন করা হতো। এসব দেখতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষের সমাগম ঘটত।
কুঠিবাড়ির মূল ভবনটি ব্রিটিশ স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত। চৌকোণাকৃতির ১৮টি খিলানের ওপর নির্মিত ভবনটি দোতলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর সঙ্গে ছিল আরও কয়েকটি স্থাপনা এবং বড় একটি পুকুর। স্থানীয়দের দাবি, ভবনের ওপরের তলায় ক্যাসপারের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী ও তৈজসপত্র সংরক্ষিত থাকত।
কুঠিবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘শিলারগঞ্জ’ নামটিও। স্থানীয়দের ভাষ্য, ব্রিটিশ আমলের জমিদার শিলার সাহেবের নাম থেকেই এলাকার নাম হয়েছিল শিলারগঞ্জ। তার ছেলে এডওয়ার্ড প্যারি ক্যাসপার এখানে কুঠিবাড়ি নির্মাণ করেন। পরে এলাকার নাম সাপলেজা হলেও ডাকঘরের নাম পরিবর্তন হয়নি। এখনো ‘শিলারগঞ্জ পোস্ট অফিস’ নামটি চালু রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কুঠিবাড়িতে নায়েব ও পাইক-পেয়াদাদের থাকার জন্য আলাদা ভবন ছিল। একটি দ্বিতল ভবনের নিচতলায় অফিসে বসে খাজনা আদায় ও বিচারকার্য পরিচালনা করা হতো। ক্যাসপারের একটি বড় বোটও ছিল বলে জানান তারা। শীত মৌসুমে তৎকালীন চন্দ্রদ্বীপ, বর্তমান বরিশাল, থেকে তিনি ওই বোটে করে কুঠিবাড়িতে আসতেন বলে প্রচলিত আছে।
শীতকালে থাকার উপযোগী রাখতে ভবনটি উষ্ণ রাখার বিশেষ ব্যবস্থাও ছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। তাদের ভাষ্য, মূল ভবনের নিচের চার কোণে কয়লার আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা ছিল।
তবে কুঠিবাড়ির ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত লিখিত তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। ফলে ক্যাসপারের ব্যক্তিজীবন, তার জমিদারি পরিচালনা এবং কুঠিবাড়ি নির্মাণের নানা বিষয় এখনো অনেকটাই অজানা। স্থানীয়দের কাছে থাকা ক্যাসপারের ব্যবহৃত দুটি তরবারিসহ বেশ কিছু পুরোনো তৈজসপত্রও এখন আর দেখা যায় না।
বর্তমানে কুঠিবাড়ির তিনটি ভবনই সংস্কারের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পুকুরের শানবাঁধানো ঘাটও হারিয়েছে আগের জৌলুশ। দেয়ালের বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে ক্ষয়ের চিহ্ন। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে স্থাপনাটির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি মালিকানায় গেলেও ঐতিহাসিক এই স্থাপনা সংরক্ষণে এখনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
মঠবাড়িয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অল্প কিছু বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছিল। তা দিয়ে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বরাদ্দ পাওয়া গেলে আরও ভালোভাবে সংস্কার করা হবে, যাতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসতে পারেন।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কুঠিবাড়িটি শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়; এটি মঠবাড়িয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে এর ইতিহাস অনুসন্ধান, প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও যথাযথ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তা না হলে অযত্নে হারিয়ে যেতে পারে দুই শতকের পুরোনো এই ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা গল্প ও স্মৃতি।
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বরিশালের নদ-নদীতে ইলিশের দেখা, মা মাছ নিয়ে শঙ্কা