দুই নেত্রীর ফোনালাপ কলহ ছাড়া জাতি কি পেল? এম জসীম উদ্দীন
দুই নেত্রীর ফোনালাপের অডিও শুনে বোঝা গেল দেশের রাজনীতির আকাশে যে মেঘ জমেছে তা কতটা গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। আর যাই হোক এর থেকে কোনো সমাধান আশা করা দু:স্বপ্ন ছাড়া কিছু না। বিরোধী নেতার দু’দিনের আল্টিমেটাম দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী যেচে যে ফোনকল করেন তাতে দেশের উদ্বিগ্ন মানুষের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে এসেছিলো। মনে হচ্ছিল সমস্যার জমাট বরফ গলতে শুরু করেছে। কিন্তু গতকাল তাঁদের দুজনের ফোনালাপ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর আশার শেষ আলোটুকু হতাশার কালো চাঁদরে ঢেকে গেছে । এখন কি হবে, দুই নেত্রীর এই অনড় অবস্থানের পরিণতি কি ? এই চিন্তায় গোটা জাতি উদ্বিগ্ন।
দুই নেত্রীর ৩৭ মিনিটের ফোনালাপে আসলে কাজের কথা কিছুই ছিলোনা। ছিলো একে অপরকে দোষারোপ, বিষোদগার আর উত্তেজনায় পরিপূর্ণ। কেউ-ই কাউকে ছেড়ে কথা বলেননি একচুল। বিশেষ করে বিরোধী দলীয় নেত্রীর কন্ঠে প্রকাশ পেয়েছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভুত ক্ষোভ আর উত্তেজনা। প্রধানমন্ত্রী যতটা নমনীয় হয়েছেন তিনি ততটা উত্তেজিত হয়েছেন। দেশের ১৬ কোটি মানুষের নেতৃত্ব দেন যে দুই নেত্রী তাঁদের ৩৭ মিনিটের এই কথপোকথন শুনে মনে হয়েছে গ্রামের বিবাদমান দুই নারীর খুনসুঁটি। মানুষ নেতাদের ভাষা-বাক্যে যে শালিনতা আশা করে তার বিন্দুমাত্র ছিলো না তাতে।
প্রধানমন্ত্রী বললেন, তিনদিনের হরতাল প্রত্যাহার করে গণভবনে আসুন আমরা বসে আলোচনা করি। বিরোধী নেত্রী তা সরাসরি নাকচ করে নানা অজুহাত দেখালেন। বললেন, ১৮ দলের নেতাদের সঙ্গে কথা না বলে তিনি হরতাল প্রত্যাহার করতে পারবেন না। প্রত্যুত্তরে প্রধানমন্ত্রী বললেন , তাদের ডাকুন, কথা বলুন তারপর হরতাল প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিন। বিরোধী নেতা বললেন, এখন তাদের পাওয়া যাবেনা। কারণ, তাঁরা পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এনিয়েই আলোচনা গড়ায় দীর্ঘক্ষণ। পাল্টাপাল্টি দোষারোপ, ঝগড়াঝাটি। শেষমেষ বিরোধী নেতা প্রস্তাব দিলেন, আপনি সম্মতি দিন যে নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে নেবেন। তাহলে হরতাল প্রত্যাহার করে আলোচনায় বসবো আমরা। প্রধানমন্ত্রী সে দাবি সরাসরি নাকচ না করে এড়িয়ে গেলেন। এরপর ফোন-সংযোগ বিচ্ছিন্ন ।
বাস্তবতা হলো, সমস্যা সমাধানে প্রথমে দুই পক্ষ সমঝোতার জন্য আলোচনায় সম্মত হবেন এটাই নিয়ম। আলোচনা হবে কোনো ধরনের শর্তবিহীন। আলোচনায় বসার উদ্দেশ্যই হলো দাবি-দাওয়া আদায়ে উভয়ের দরকষাকষি। আর এতে দুপক্ষের সহনশীলতা, সহমর্মিতা এবং ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হয়। আর এমন তো নয় যে আলোচনায় বসলেই নিজের দাবি-দাওয়া সব জলাঞ্জলী হয়ে যাবে।
গণতান্ত্রিক রীতিনীতির একটি অন্যতম শর্ত হচ্ছে আলাপ-আলোচনা। আলাপ-আলোচনার পরিসমাপ্তি হতে পারে সমঝোতা কিংবা অসমঝোতায় উভয় পথেই। এটা তো ঠিক তাঁরা দেশের প্রধান দুটি দলের নেতা। দেশের স্বার্থে, রাজনীতির স্বার্থে, শান্তির স্বার্থে তাঁদের এ ধরনের আলোচনা কিংবা অন্তত একসঙ্গে বার বার বসা উচিৎ।
দু’নেত্রীর মধ্যে রাজনীতির মতপার্থক্য আছে এবং থাকবে । সেটা মতের, স্বার্থের নয়। কিন্তু তাঁদের কথপোকথনে ও কন্ঠের ঝাঁঝ আর বাক্য বিনিময় শুনে মনে হয়েছে একটা স্বার্থ বিরোধ আছে এমন দুজনের কথপোকথন। মনে হয়েছে কেউ কারো সম্পত্তি জোরজবরদস্তি মূলকভাবে দখল করে আছে। এটা কি কোনো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে ?
তাঁদের এই কথা বলার মধ্যদিয়ে আর কিছু অর্জন হোক বা না হোক দুদলের নেতাকর্মীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সবুজ সংকেতটা অন্তত পেয়ে গেছে। যদি দু’পক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং তা দীর্ঘায়িত হয় তবে তাতে দেশের মানুষই কেবল পুড়বে না বরং তার ঝাঁঝ থেকে কোনো পক্ষই নিরাপদে থাকবে না।
এতোকিছুর পরেও দেশের মানুষ কিঞ্চিৎ আশার আলো বুকের খোলে বাঁচিয়ে রেখেছেন। শেষমেষ হলেও দুই নেত্রী দেশের মানুষের কথা না হোক, অন্তত নিজেদের ভালো চিন্তা করে সমঝোতায় পৌঁছবেন। দুপক্ষই ছাড় দিতে সম্মত হবেন এবং একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানে সম্মত হবেন। হয়তো তাতে কোনো পক্ষের কমবেশী হার-জিত হতে পারে। কিন্তু গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থায় এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। তাতে অন্তত অগণতান্ত্রিক কোনো শক্তির উত্থান নিরুৎসাহিত হবে।
এম জসীম উদ্দীন, নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথম আলো, বরগুনা
|