হিরণ, হিরো অফ বরিশাল সাঈফ ইবনে রফিক
১.
হিরণ মিয়ারে ছোটকাল থেকেই চিনতাম। তিনিও আমাকে চিনতেন। এলাকায় ভালো ছাত্র হিসেবে আমার একটা সুনাম আছে। নূরিয়া স্কুলের পিছে খানলজ আমার ফুপুবাড়ি। এর পেছনেই হিরণ খানের বাড়ি। পাশাপাশি দুই খানবাড়ির মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্কও আছে। আমার বাসা থেকে শর্টকাটে ৫ মিনিটের হাটা পথ। জাতীয়পার্টির আমলে কন্ট্রাকটারি করে আলেকান্দার যে কয়েকজন কোটিপতি হয়েছেন, হিরণ তাদের একজন। তবে, অন্যদের মতো তার খুন-ধর্ষণের স্ক্যান্ডাল নেই।
২.
উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার পর ক্যাডেট কলেজে জমা দেয়ার জন্য তার কাছ থেকে একটা আয়কর সংক্রান্ত সনদ নিতে গিয়েছিলাম। বাড়ির কাছেই থানা কাউন্সিলে ছিল তার অফিস। হাসিমুখে সার্টিফিকেটটা দেয়ার সময় বললেন, বড় অফিসার হওয়ার পর বরিশাল, বাড়িঘর ভুইল্যা যাইও না।
৩.
আলেকান্দা-কাউনিয়া ঐহিত্যবাহী মারামারির আসল কারণটা আমি জানতাম না। ১৯৮৬ সালে লিবিয়ায় মার্কিন বিমান হামলার পর যখন ১০ বছরের আমি বাংলাদেশে এলাম, তখন আলেকান্দা-কাউনিয়া দ্বন্দ্বে বরিশাল এক আতংকের শহর। বাবা আলেকান্দায় বাড়ি করলো। মারামারি, কোপাকোপি, খুরের পোচ– পরিচিত শব্দ হয়ে উঠতে লাগলো। (সত্য-মিথা জানি না, আমার এই লেখা কোনও আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণের জন্য প্রযোজ্য নয়) একদিন শুনলাম, সারোয়ার নামের এক মাস্তান একটা ছেলের সারা শরীরে কারেন্টের তার প্যাচাইয়া শক দিয়া মাইর্যা ফেলাইসে। কাউনিয়া এলাকার ওই মাস্তান আবার উকিল। সে ভালো করেই জানে যে, ইলেকট্রিক শকে মারা গেলে কেইস হালকা হয়ে যাবে। এই সরোয়ারই পরে বিএনপির দুর্জয় ঘাঁটি বরিশাল সদর আসনের এমপি হন। বরিশাল সিটি করপোরেশন হওয়ার পর তিনিই হন বরিশালের প্রথম নির্বাচিত মেয়র। তবে বাড়িঘরের ট্যাক্স বাড়ানো ছাড়া পৌরসভা থেকে উন্নীত বরিশাল সিটির কোনও উন্নয়ন তিনি করতে পারেননি। ক্যাডার পলিটিক্সের হাত ধরেই ১৯৯৬ সালের পর বরিশালে আওয়ামী রাজনীতির শোডাউন শুরু করেন আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ। তার ক্যাডার মিল্টনের আধিপত্যও কাউনিয়ায়। মিল্টনবাহিনীর একটা দৃষ্টিনন্দন সাজোয়া যান ছিল।
৪.
আলেকান্দায় সড়ক ও জনপথের অফিস। অফিসতো নয় যেন সোনার খনি। এই অফিসে কনটাক্টরি করেই আলেকান্দার বহু পরিবারে স্বচ্ছলতা এসেছে। সিএন্ডবি অফিসের একটু সামনেই মেডিকেল কলেজ। কাঁচা টাকার খনি। শওকত হোসেন হিরণের বড়ভাই হারুণ চাচার একটা অষুধের দোকান আছে মেডিকেলের সামনে। হিরণের মামা ওহাব খানেরও একটা অষুধের দোকান ছিল ওখানে। মেডিকেলের রোগীদের পথ্য সরবরাহের কনটাক্টরিতে বেশ আগ্রহ আছে আলেকান্দার প্রভাবশালী পরিবারগুলোর।
৫.
গুলজার বা ঝুনু ছিল আলেকান্দার মারকশা। হিরণের এ ধরনের কোনও স্ক্যান্ডাল ছিল না। গুলজারের ছোট ভাই মেহেদি মার্ডার কেসের আসামী হলেও বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। বিএনপিজোটের শাসনামলেই র্যাবের ক্রসফায়ারে মারা যান বিএনপির ওয়ার্ড কমিশনার মেহেদি। এলাকায় নতুন বিল্ডিং উঠলে এই মারকশাদের চাদা দিতে হতো। বরিশাইল্যারা একে বলে চৌদ। টেন্ডারের দিন ছিল এদের মারকশাগিরির গ্রান্ড ফিনালে, পারফরমেন্স শোয়ের দিন।
৭.
আঞ্চলিক জনপ্রিয়তায় কিভাবে জাতীয় নেতা হওয়া যায়, তা হিরণই দেখিয়েছেন। আওয়ামী ক্যান্ডিডেট হিসেবে নির্বাচিত মেয়র থাকা অবস্থায় যখন খালেদা জিয়া বরিশাল গেলেন, শহরটাকে তিনি সাজিয়ে দিলেন। বিএনপির মিছিলে বাধা দিলো না আওয়ামী লীগ। বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়ার পোস্টার-বিলবোর্ড ছেয়ে ফেলল শহর। বরিশালের মাটিতে এই রাজনৈতিক ম্যাচিউরিটি শেরে বাংলাও দেখাতে পেরেছিলেন কি না, জানি না।
৮.
মসজিদ গড়ে রাস্তার গতিপথ রোধ করার সংস্কৃতিতে যখন ঘুরপাক খাচ্ছে মসজিদের শহর ঢাকা, তখন বরিশালে হিরণ অন্য এক নজির গড়লেন। বাংলাবাজারে খাদেম হোসেনের বাড়ির সামনের মসজিদটা ভেঙে রাস্তা বের করলেন, একটু জায়গা ছেড়ে বহুতল এক মসজিদ নির্মাণ করে দিলেন। আর এখানেই বরিশালের আধুনিকতা পরবর্তী উত্তরাধুনিক বিকাশ।
৯.
সদররোডে বিবির পুকুরের পাড়ে দাঁড়ালে হিরণকে মনে পড়ে। মনে পড়ে, `বড় অফিসার হওয়ার পর বরিশাল, বাড়িঘর ভুইল্যা যাইও না।’
লেখক: সাঈফ ইবনে রফিক, কবি ও সাংবাদিক saifibnerafiq@yahoo.com
|