শিক্ষকের স্মৃতিচারণ হিরনের স্কুল জীবন যেভাবে দেখেছি সৈয়দ আনোয়ার হোসেন
আমি ১৯৬৭ সনে বি.এম কলেজে ভর্তি হই। হিরনদের বাড়ির এক পারিবারিক চিকিৎসক যিনি আমার সম্পর্কে বেয়াই, তৎকালীন পাকিস্তান বাজারে (বর্তমানে বাংলা বাজার) তার ফার্মেসি ছিলো, তার মাধ্যমে এ বাড়িতে হিরনদের ঘরের গৃহ শিক্ষক হিসাবে, এদের বাড়ীর কাচারী ঘরে আরো একজন সহ আমি থাকতাম। ঐ সময় হিরন নুরিয়া হাইস্কুলের ছাত্র ছিলো। দুরন্ত কিশোর, কোন প্রকার ভয় ভাবনা ছিলনা। এলাকার সম্মানের জন্যও অত্যন্ত সচেতন। কোন বহিরাগত এলাকায় এসে কোন প্রকার মাস্তানি বা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে তা প্রতিহত করতে দলগতভাবে কঠোর ছিলো।
এলাকারই হোক বা এলাকার বাহিরেরই হোক নিজে বা তার সমবয়সীদের নিয়ে নিজের দলের কেউ কারো কোন ক্ষতি করেছে বলে আমার জানা নাই। তবে ওদের জন্য বহিরাগত মাস্তানদের সমস্যা হয় বলে তারা (মাস্তানরা) নানা প্রকার মিথ্যা পুলিশ মামলা দিয়ে হয়রানির চেষ্টা করত। এজন্য রাতে বাসায় কখনো সতর্কভাবে থাকত বা বাসায়ই থাকত না।
সেই আমলে হিরনদের বাসার দক্ষিণে একটি পুকুর ছিল। কোনভাবে পুলিশ যদি বাসা রেইড করত তবে সহজ সুবিধা ছিল পুকুরে ঝাপ দিয়ে পালিয়ে যাওযা। রাত পার হলে আর সে কেইস থাকত না কারণ এলাকার মুরুব্বিরা হস্তক্ষেপ করে কেইস বিদায় করে দিত।
তাকে নিয়ে আনেক চমকপ্রদ ঘটনাও আছেঃ
একবার সম্ভবত ১৯৭১ বা বাহাত্তর সালের কথা সাগরদীতে রেডক্রসের একটি গোডাউন ছিল। একদিন রাত দশটার দিকে আমাকে এসে জানালায় দাড়িয়ে বলল ‘স্যার আমরা খবর পেয়েছি আজ রাতে ওই গোডাউনে ডাকাতি হবে’ আমরা তা হতে দেব না। আমি বললাম- সাবধান এটা পুলিশের কাজ তুমি তোমার দল নিয়ে সাবধানে থাকো, এর মধ্যে জড়িয়ে যেও না। কিন্তু না, এ কথা বলতেই সে রাস্তার দৌড়ে গেল, পিছনে পিছনে গিয়েও ধরতে পারলাম না।
হিরনের মা অত্যান্ত বিচক্ষণ মহিলা, তিনি হয়তো কিছু আভাস পেয়ে থাকবেন। আমি ফিরে এসে দেখি তিনি দাড়িয়ে আছেন। বিষয়টি আমি বললাম, তিনিও চিন্তায় পড়ে গেলেন, আমরা কেউই ঘুমালাম না, পায়চারি করতে থাকলাম।
রাত শেষের দিকে ফিরে হিরন এলে বলল স্যার, ‘ডাকাতি ঠেকাতে পারলাম না তবে ডাকাদের নিকট থেকে কিছু কাপড়ের গাইড ছিনিয়ে এসেছি এবং এক জায়গায় রেখেছি।’ বললাম পুলিশ কে দিয়ে দাও, তোমরা ভাল থাকো (ঘটনাগুলি কোন আইন-শৃংখলা জনিত বিষয়ে সম্পৃক্তি করা যাবে না)। কিন্তু সে (হিরন) কথায় রাজি না হওয়ার আমরা বললাম তাহলে এ পুরানো কাপর বিহারী বস্তিতে (বর্তমান রিফুজী কলোনী) গরীবে মাঝে বিলিয়ে দাও নইলে কারণ পুলিশ যার নিকট লুন্ঠিত মালামাল পাবে তাকেই গ্রেফতার করবে। সেটা মেনে নিয়ে ভোর হওয়া আগেই তাই করলো সে।
একবার নুরিয়া হাই স্কুলের বার্ষিক ম্যাগাজিন কমিটির সদস্য হিরন। খুব খুশি, কিন্তু কমিটি সদস্য হলে তাকে কোন একটা লেখা দিতে হবে। সে ঠিক করল একটা কবিতা তার নামে ছাপবে। সন্ধ্যে বেলা আমাকে এসে বলল, স্যার আমাকে একটা কবিতা লিখে দিতে হবে। অমি বললাম, যার কবিতা তাকেই লিখতে হয়, তুমি চেষ্টা করো, আমি সহযোগিতা করব। বলল আমারতো এতো সময় নেই, আপনি একটা লিখুন সকালে কলেজে যাবার আগে দিয়ে যাবেন। বললাম, দেখো আমারতো এ ধরনের লেখার কোন অভিজ্ঞতা নেই। না তাই একটাই কথা – লিখতেই হবে। বললাম অন্তত কোন বিষয় লিখতে চাও বল। বললো- তাও ঠিক করে নিন। সারা রাত ধরে অনেক চেষ্টা করে কোন মতে ছন্দ মিলিয়ে একটি কবিতা লিখে সকালে হাতে ধরিয়ে দিয়ে মুক্তি হলো। তিন দিন পর দেখালো সে কবিতা ম্যাগাজিনে হিরনের নামে ছাপা হয়েছে।
শেষ করব একটি বিষয় লিখে হিরন যে সে সময়ই কত বড় অন্তরের অধিকারি ছিলো তার একটি উদাহরনঃ একদিন সন্ধ্যে বেলা বিহারী বস্তির একটি ছেলেকে সাথে নিয়ে বলল স্যার ওর মার খুব অসুখ হাসপাতালে ভর্তি। জরুরী ১০০ টাকা দরকার। সাইকেলটি বিক্রি করতে চায় তাও পারছে না। আমার নিকট টাকা ছিল, আমি একশত টাকা হিরনকে দিলাম। আর সে ছেলেটির হাতে টাকা দিতেই ছেলেটি সাইকেল রেখে হাসপাতালে দৌড়, সাথে হিরনও। পরদিন হিরনকে পেয়ে বললাম- সাইকেল নিয়ে যাও, এটা আমার লাগবেনা। হিরন বলল- আপনার টাকায় কাজ হয়েছে ওর মা এখন অনেক সুস্থ্য। আপনি পায়ে হেটে কলেজে এত দূরে যান আপনার সাইকেল দরকার, ঠিক করিয়ে ব্যবহার করুন। দেখলাম ইংল্যান্ডের হারকিউলিক্স সাইকেল যা আমি ও আমার পরিবার বহু বছর ব্যবহার করেছি।
এখন বার বার পুরানো সেই কথাগুলো মনে পড়ছে। বৃহস্পতি যার তুঙ্গে ছিল তাকেই মহান সৃষ্টিকর্ত ইচ্ছায় এখন-ই চলে যেতে হলো।
আজ হিরন আমাদের মাঝে নেই, রয়েছে জীবনের স্বল্প সময়ের বিশাল অর্জন যা বরিশাল বাসী চিরদিন মনে রাখবে আর দোয়া করবে। আমি তাঁর রূহের মাগফেরাত কামনা করছি। যাজাকাল্লাহু খাইরুন।
লেখক : সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, গণ বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা।
|