Current Bangladesh Time
Wednesday October ২৮, ২০২৬ ৮:১৬ PM
Barisal News
Latest News
Home » পিরোজপুর » পিরোজপুর সদর » মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা: আতঙ্কে মানিক পশারীর স্বজনেরা, নেই পুলিশ পাহারা
২৮ October ২০২৬ Wednesday ৬:১০:২৭ PM
Print this E-mail this

মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা: আতঙ্কে মানিক পশারীর স্বজনেরা, নেই পুলিশ পাহারা


অনলাইন নিউজ ডেস্ক:

পিরোজপুরের চিতলিয়া গ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনার পর এখনো আতঙ্কে রয়েছেন তার স্বজনেরা। গ্রামের বাসিন্দা ও স্বজনেরা বলেছেন, কারও লাশ দাফনে বাধা এবং খোঁড়া কবর মাটি ফেলে ভরাট করে দেওয়ার মতো ঘটনা এ গ্রামে আগে কখনো ঘটেনি।একজন মুক্তিযোদ্ধার এমন শেষবিদায় মানতে পারছেন না তারা।

লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনে বাধা, খোঁড়া কবরে মাটি ভরাট করা, কবর খোঁড়ায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলার ভীতি—দিনভর চলা এসব ঘটনার পর গত শনিবার গভীর রাতে পুলিশি পাহারায় মানিক পশারীকে দাফন করা হয়। জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নেতৃত্বে মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।

স্থানীয়রা জানায়, পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট তার বিরুদ্ধে পিরোজপুর সদর থানায় মামলা হয়। এ মামলার বাদী মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলাকালে মানিক পশারী এ মামলায় সাক্ষ্য দেন।

এলাকায় কথা বলে জানা যায়, মানিক পশারী মারা যান শনিবার সকালে মেয়ে আফরোজা পশারীর গোপালগঞ্জের বাড়িতে।দুপুর ১২টার দিকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তার মরদেহ নেওয়া হয় পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে। এ খবর পেয়ে পিরোজপুর শহরের বটতলা, পুলিশ লাইনস সড়ক, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, পাড়েরহাট বাজার, পৌর কবরস্থানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জামায়াত-শিবিরের কর্মী-সমর্থকেরা জড়ো হয়ে মিছিল বের করেন। মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করে নানা স্লোগান দেন তারা। তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা (গার্ড অব অনার) না দিতে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনকে চাপ দেওয়া হয়। পিরোজপুরে কবর দিতে দেওয়া হবে না বলেও ঘোষণা দেন তারা।

পুলিশ সূত্র জানায়, লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে হামলা ও দাফনে বাধা দেওয়া হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে মানিক পশারীর মরদেহ পিরোজপুর পুলিশ লাইনস মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জানাজা হয় এবং ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়। এ সময় দাফনে বাধা দেওয়ার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে স্থানীয় সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফোন দিয়ে বলেন, দলীয় নেতা-কর্মীদের বলে দেওয়া হয়েছে, তাঁরা লাশ দাফনে আর বাধা দেবেন না। পরে গভীর রাতে পুলিশি পাহারায় বিকল্প সড়ক দিয়ে মরদেহ গ্রামে নিয়ে দাফন করা হয়।

পিরোজপুর জেলার পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে মৃতদেহ পুলিশ লাইনসের ভেতরে নিয়ে জানাজা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সংঘাত, সহিংসতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে কিছু কৌশল নেওয়া হয়েছিল।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা, দাফন ও গার্ড অব অনারে বাধা দিতে শহরের বিভিন্ন স্থানে মিছিল-সভার নেতৃত্ব দেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি আব্দুল রাজ্জাক, পৌর জামায়াতের আমির ইসহাক আলী, জিয়ানগর উপজেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি ও সাবেক শিবির নেতা মামুন হোসাইন। আর মানিক পশারীর গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে খোঁড়া কবরে মাটি ভরাট করা, কবরের জন্য আনা বাঁশ সরিয়ে ফেলা ও নেতা-কর্মীদের নিয়ে মিছিল করেন পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুইন উদ্দিন।

পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদের সামনে ওই দিন দেওয়া বক্তব্যে আব্দুল রাজ্জাক বলেছিলেন, লাশ দাফনে তারা কোনো বাধা দেবেন না। কিন্তু মানিক পশারী একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। তাকে কেন গার্ড অব অনার দেওয়া হবে—সেটার প্রতিবাদ জানাতে জড়ো হয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে আব্দুল রাজ্জাক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গার্ড অব অনার যাতে দেওয়া না হয়, সেটা বলেছিলাম।’ তার দাবি, যখন প্রশাসন থেকে বলা হলো, মানিক পশারী সরকারি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা, তখন আর বাধা দেওয়া হয়নি; বরং লাশ দাফনে তারা সহযোগিতা করেছেন।

এ বিষয়ে জামায়াতের কর্মী মুইন উদ্দিন বলেন, তিনি লোকজন নিয়ে মানিক পশারীর গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে নেতা-কর্মীদের নিয়ে মিছিল করেছেন। তবে খোঁড়া কবরে মাটি দিয়ে ভরাট করার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।

ভয় কাটেনি গ্রামবাসীর

মানিক পশারীর গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর শহর থেকে আট কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে। মানিক পশারীর বাড়িতে কাউকে পাওয়া যায়নি। বাড়ির একটি ঘরে ছোট মেয়ে শিমু পশারী ও পাশের আরেকটি ঘরে একমাত্র ছেলে আসাদুল পশারীর স্ত্রী সন্তান নিয়ে থাকতেন। মানিক পশারীর দাফন শেষে ওই রাতেই মেয়ে ও পুত্রবধূ এলাকা ছেলে চলে যান।

আশপাশের পাঁচটি বাড়িতে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও কেউ কিছু বলতে রাজি হননি। পরে খোঁজাখুঁজি করে পাওয়া যায় মানিক পশারীর বোন হেনা পশারীকে। তিনিও প্রথমে কথা বলতে রাজি হননি। পরে বাড়ির ভেতরে ডেকে নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, চব্বিশের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর তার ভাইয়ের বাড়ির ঘরটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ওই দিন রাতেই ভাই বাড়ি ছেড়ে চলে যান। স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের নেতারা তার ভাইয়ের ঘরে আগুন দেন। এখন প্রভাবশালীরা তার পরিবারের জমি দখলের চেষ্টা করছেন। মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন। তিনি বলেন, তার পরিবারের অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে গত দুই বছরে একাধিক মামলা হয়েছে।

মানিক পশারীর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পুড়িয়ে দেওয়া ঘরের পাকা ভিটে খালি পড়ে আছে। স্বজনেরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করলেও এলাকায় কোনো পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাদে শ্যাম সরকার বলেন, টহল পুলিশকে নজর রাখতে বলা হয়েছে। তারা সেখানে মাঝেমধ্যে যাচ্ছে।

স্থানীয় একজন বাসিন্দা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মানিক পশারীর চাচা রইসউদ্দিন পশারীর বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তখন যারা বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল, ২০২৪ সালে তারাই মানিক পশারীর ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, মরদেহ দাফনে বাধা দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে চলা মামলার আরেকজন সাক্ষীর বাড়িও চিতলিয়া গ্রামে। তার নাম জলিল শেখ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জলিল শেখের দোকানও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ওই দিন রাতেই পরিবার নিয়ে গ্রাম ছাড়েন তিনি, আর ফেরেননি।

খোঁড়া কবর মাটি ফেলে ভরাট

মানিক পশারীর মৃত্যুর খবর গ্রামে থাকা আত্মীয়স্বজন জানতে পারেন শনিবার সকাল ৯টার দিকে। মরদেহ গ্রামের বাড়ি নিয়ে এলে কোনো ঝামেলা হতে পারে, এ আশঙ্কা আগেই করেছিলেন মানিক পশারীর ভাগনে আজিজুল ইসলামসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য। আজিজুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, স্থানীয় প্রভাবশালীরা তার মামার মরদেহ গ্রামে আনলে পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। সে জন্য তিনি গোপালগঞ্জেই দাফন করতে বলেছিলেন। কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যরা গ্রামে নিয়ে আসেন।

আজিজুল ইসলাম স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কবর খোঁড়েন। তখন স্থানীয় কয়েকজন এসে বলেন, যারা কবর খুঁড়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে। এ খবর শুনে ভয়ে সেখান থেকে চলে যান তারা।

স্থানীয় লোকজন বলেন, মাগরিবের নামাজের পর ৭ থেকে ৮টি মোটরসাইকেল মানিক পশারীর বাড়ির সামনে আসে। কিছুক্ষণ পর শতাধিক লোক এসে মিছিল শুরু করেন। তারা স্লোগান দেন ‘মানিক পশারীর গালে গালে জুতা মারো তালে তালে’, ‘মানিক পশারীর আস্তানা জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও।’ একপর্যায়ে মিছিল থেকে লোকজন গিয়ে খোঁড়া কবরে মাটি ফেলে ভরাট করে দেন। কবরের পাশ থেকে বাঁশগুলো দূরে ফেলে দেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত সাড়ে ১০টার দিকে গ্রাম পুলিশের দুজন সদস্য এসে আবার কবর খোঁড়ার কথা বলেন। তখন সেখানে কোনো পুরুষ মানুষ খবর খুঁড়তে এগিয়ে আসার সাহস পাননি। একপর্যায়ে মানিক পশারীর বোন হেনা পশারীসহ তিনজন নারী প্রতিবেশী রিয়াজকে সঙ্গে নিয়ে কবর থেকে মাটি সরান। এরপর রাত দেড়টায় মানিক পশারীকে দাফন করা হয়।

সম্পাদনা: আমাদের বরিশাল ডেস্ক

শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে পৌর টোলের নামে অর্থ আদায়
ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ ঘিরে বরিশালের উপকূলে সতর্কতা, পায়রা বন্দরে ৩ নম্বর সংকেত
বরিশালের ৩ কমিটি: যুবদলে ১০ বছর ধরে ঘুরেফিরে একই নেতৃত্ব
বরিশাল মহানগরে বাড়ছে থানার সংখ্যা, হচ্ছে আরও চারটি
চাঁদাবাজি বন্ধে শিগগিরই নতুন আইন আসছে : আইজিপি
Recent: Mayor Hiron Barisal
Recent: Barisal B M College
Recent: Tender Terror
Kuakata News

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
আমাদের বরিশাল ২০০৬-২০২০

প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক: মোয়াজ্জেম হোসেন চুন্নু, সম্পাদক: রাহাত খান
৪৬১ আগরপুর রোড (নীচ তলা), বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, ই-মেইল: hello@amaderbarisal.com