অব্যবস্থাপনা ও অবহেলায় জৌলুস হারাচ্ছে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী দুর্গা সাগর আরিফুর রহমান
অব্যবস্থাপনা ও অবহেলায় জৌলুস হারাচ্ছে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের সববৃহৎ দীঘি ‘দুর্গাসাগর’। পর্যটনের অন্যতম স্থান হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত এ দীঘিটির উন্নয়নে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বরিশাল শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা গ্রামে অবস্থিত এ দীঘিটি ১৭৮০ সালে রাজা জয় নারায়ণের মা রানী দুর্গাবতী খনন করেছিলেন। মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যে ভরপুর এ দীঘির মাঝখানে ছোট দ্বীপের মতো জঙ্গলাকীর্ণ একটি টিলা/টিবি রয়েছে।
২৫০০ হেক্টর আয়তনের দুর্গাসাগর দিঘিকে সাগর হিসেবে কল্পনা করলে, এ টিলাটি যেন একটি দ্বীপ। বাতাসের বেগ একটু বেশি হলেই দুর্গাসাগরে ঢেউ ওঠে। আর সেসব ছোট ছোট ঢেউয়ে ভেসে ওঠে পাড়ের বৃক্ষরাজির ছায়া।
বিগত বছরগুলোতে শীত মৌসুমে সুদূর সাইবেরিয়া ও শীতপ্রধান দেশগুলো থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী (অতিথি) পাখি দুর্গাসাগরে বেড়াতে আসত। আর এসকল পাখি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা দুর্গাসাগর দীঘিতে ছুটে আসত। কিন্তু পরিবেশ বিপর্যয় ও শিকারীদের উৎপাতে অতিথি পাখিরা এখন আর আসে না। পাঁচ প্রজাতির কয়েক হাজার পাখির কলকাকলিতে যে দীঘি শীতকালে মুখরিত থাকত, আজ সেখানে বিরানভাব।
দুর্গা সাগরে দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষন মাঝখানের দ্বীপটির সৌন্দর্য। তবে ওই দ্বীপটি এখন ঘন জঙ্গলে ছেয়ে গেছে। দ্বীপটি রক্ষণাবেক্ষণে দীর্ঘদিনেও কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এছাড়া পাড় থেকে দ্বীপে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই এবং যাওয়ার অনুমতিও দেয়াও হয়না।
দুর্গা সাগরের প্রধান প্রবেশদ্বার আবদুর রব সেরনিয়াবাত গেটটির রং চটে এবং পলেস্তারা উঠে জরাজির্ণ অবস্থা হলেও দীর্ঘদিনেও তা মেরামত বা রং করা হয়নি।
এছাড়া স্থানীয় উচ্ছৃঙ্খল যুবকরা দুর্গা সাগরের প্রধান প্রবেশদ্বারের পাশেই সীমানা দেয়াল ভেঙ্গে ফেলেছে। সীমানা দেয়ালটি এভাবে পড়ে থাকলেও তা মেরামতের কোন উদ্যেগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আর এতে সন্ধ্যা হলেই দুর্গা সাগর নেশাখোরদের দখলে চলে যাচ্ছে। এছাড়া দিনের বেলায় বখাটেদের উৎপাত তো আছেই। সীমানা দেয়াল ভাঙ্গা থাকায় দুর-দুরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখানে এসেও ভোগেন নিরাপত্তাহীনতায়।
এছাড়া দুর্গাসাগর দীঘি এলাকায় নিষেধ থাকা সত্ত্বেও অবাধে গবাদী পশু চড়ান স্থানীয় লোকজন। এতে যেমন দর্শনীয় এ স্থানটির সৌন্দর্য ম্লান হচ্ছে তেমনি এসব পশুর যত্রতত্র মলত্যাগে নষ্ট হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এ দীঘির পরিবেশ।
মাধবপাশার ঐতিহ্যবাহী দুর্গাসাগরের সেই জৌলুস এখন আর নেই। তবুও প্রতিনিয়ত দর্শনার্থীরা এ দীঘির সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসছেন দূর-দূরান্ত থেকে। সর্বশেষ ১৯৭৫ সালে আবদুর রব সেরনিয়াবাত দিঘিটি পুনঃখনন ও সংস্কার করেছিলেন। কিন্তু এরপর থেকে অদ্যবধি দীঘিটি সংস্কার বা উন্নয়ন করতে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ২৩২ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ দীঘিটির সংস্কার ও উন্নয়নে যথাযথ উদ্যেগ নেয়া হলে দুর্গাসাগর আবারও তার হারানো জৌলুস ফিরে পেয়ে হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান।
–
লেখা ও ছবি: আরিফুর রহমান
সম্পাদনা: সেন্ট্রাল ডেস্ক |