বামনায় ধান-চাল ক্রয়ে ‘অনিয়ম’: বিপাকে কৃষক মিজানুর রহমান টিপু, বামনা
বরগুনার বামনা উপজেলায় সরকারি ভাবে বোর ধান ও চাল সংগ্রহে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কৃষকদের সাথে প্রতারণা করে ধান সংগ্রহের ভতুর্কির টাকা লুটে নেয়ার অভিযোগ করেছেন একদল নিরীহ কৃষক।
অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করে বামনা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মো. এনায়েত হোসেন মোল্লা জানান, ‘জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা আমাদের সাথে আলোচনা না করে নিজ স্বীদ্ধান্তে ৭৮ মেট্রিক টন চাল ক্রয় করে গুদাম জাত করার জন্য বামনায় পাঠান।’
এদিকে ধান-চাল কেনার বিষয়টিই জানেন না স্বয়ং সংগ্রহ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘চাল ক্রয় করার বিষয়টি আমার জানা নেই।’
অভিযোগে জানাগেছে, প্রান্তিক কৃষকদের ভতুর্কির কথা চিন্তা করে বোর মৌসুমে উপজেলা পর্যায়ে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ও স্থানীয় রাইচ মিল থেকে চাল ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহন করে খাদ্য মন্ত্রনালয়। কিন্তু বামনায় উপজেলা খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে বোর ধান ও চাল ক্রয় না করে অন্য উপজেলা থেকে নাম সর্বস্ব রাইচ মিলের নাম ব্যবহার করে কাগজে কলমে ৭৮ মেট্রিক টন চাল ক্রয় দেখিয়ে টাকা উত্তোলন করার অভিযোগ উঠেছে।
ফলে সরকারি টাকায় ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযান ব্যর্থ হয়ে ভতুর্কির টাকা কৃষকের পরিবর্তে চলে গেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পকেটে। অন্যদিকে স্থানীয় বোর চাষীরা ফসলের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে লোকসান গুনছেন।
বামনা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস সূত্রে জানাযায়, সরকার চলতি বোর মৌসুমে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ২৩ টাকা কেজি দরে ধান এবং স্থানীয় মিল মালিকের কাছ থেকে ৩২ টাকা কেজি দরে চাল ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। এ সংগ্রহ অভিযান গত ৫ মে থেকে শুরু হয়ে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধার্য্য করা হয়।
এতে বামনা উপজেলার জন্য ১৫ মেট্রিক টন বোর ধান এবং ৭৮ মেট্রিকটন বোর চাল ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়। কিন্ত নির্ধারিত সময় অতিক্রম হলেও এখন পর্যন্ত বামনা উপজেলার কোন কৃষকের কাছ থেকে ধান কিংবা চাল সংগ্রহ করা হয়নি। এমনকি স্থানীয় কোন কৃষক ও মিল মালিক ধান কিংবা চাল ক্রয়ের বিষয় অবগত নয়। এ অবস্থায় কৃষকরা ধান ও চালের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
অপরদিকে সকলের অগোচরে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা যোগসাজশে বরগুনা সদর উপজেলার নলটোনা ইউনিয়নের নাম সর্বস্ব মেসার্স জমাদ্দার রাইস মিলের নাম ব্যবহার করে কাগজে কলমে তিন দফায় ৭৮ মেট্রিক টন চাল ক্রয় দেখিয়ে কোষাগার থেকে সমূদয় অর্থ উত্তোলন করেন।
নীতিমালা অনুযায়ী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের অনুমোদিত রাইচ মিলের মালিকদের সাথে স্ব-স্ব উপজেলার ক্রয় কমিটি চুক্তি করে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তার অনুমোদন সাপেক্ষে চাল ক্রয়ের কথা থাকলেও ক্রয় কমিটির সভাপতি এবং সদস্যরা চাল ক্রয়ের বিষয়টি জানেন না।
বামনা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বোর মৌসুমে উপজেলায় ২০ হেক্টর জমিতে বোর আবাদ করা হয়েছে এবং ৯০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে।
বামনা উপজেলার বুকাবুনিয়া ইউনিয়নের কালাইয়া ব্লকের বোর চাষী মো. কামাল বেগ জানায়, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উদ্যোগে এ বোর মৌসুমে আট একর জমিতে তিনি বোর আবাদ করেছেন। বর্তমানে বাজারে ধানের চাহিদা কম থাকায় লোকসান দিয়ে ১৫ টাকা কেজি দরে ধান এবং ২৩ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রয় করতে হচ্ছে। সরকার কর্তৃক বোর ধান অথবা চাল ক্রয়ের বিষয়টি আমাদের জানা নেই।
শুধু কামাল বেগ নন, উপজেলার অনেক প্রান্তিক কৃষক খাদ্য বিভাগের ধান, চাল সংগ্রহ অভিযান নিয়ে নানা অভিযোগ করেছেন। তাদের অভিযোগ, কৃষকেরা চাষ করে লোকসান গুণলেও সরকারি ধান, চাল ক্রয়ে লাভবান হয়েছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। সরকারি বিশাল অঙ্কের টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। কৃষকদের চাষাবাদে উদ্বুদ্ধকরণের উদ্যোগটি দুর্নীতিতে ডুবে ভেস্তে যেতে বসেছে।
এ বিষয়ে বরগুনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের অনুমোদিত কোন রাইচ মিল বামনাতে না থাকায় বরগুনা সদর থেকে বোর চাল ক্রয় করে বামনা খাদ্য গুদামে পাঠানো হয়েছে।’
তবে নিম্ম মানের চাল বামনা খাদ্য গুদামে পাঠানোর অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘আমি বরগুনা সদরের বাবুগঞ্জ বাজারের মেসার্স জমাদ্দার রাইস মিলের মালিকের সাথে বোর চাল ক্রয়ের চুক্তি করেছি। ওই চাল বুঝে নেওয়ার দ্বায়িত্ব বামনা গুদাম রক্ষকের।’
সম্পাদনা: বরি/প্রেস/মপ |