আগের মতো নেই বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা। দোকান ভাড়া তুলতেই বেগতিক অবস্থা। একটা সময় প্রতি মাসে পাঁচ থেকে ছয় জোড়া তবলা তৈরীর চাহিদা থাকলেও, সেসব যেন স্মৃতি। হয়তো কিছুদিন পর এ ব্যবসা টিকবে না। তবলার ফিতা (দোয়ালি) কাটতে কাটতে হতাশার সুরে কথাগুলো বলছিলেন, বরিশাল শহরের বাজার রোডের বাদ্যযন্ত্র ব্যবসায়ী ও কারিগর শম্ভু দাস। তার প্রতিষ্ঠান ‘তবলা ভুবন’। পুরোনো রঙ ওঠা ময়লা সাইনবোর্ড। দোকানে আলোর সরবরাহ দিচ্ছে একটি মাত্র টিউব লাইট।
কথা হলে আক্ষেপের সুরে শম্ভু দাস জানিয়েছেন, একসময় বাদ্যযন্ত্রের রমরমা ব্যবসা থাকলেও তা এখন কোনো রকম চলছে। তিনি জানান, পূর্বে বরিশালের অধিকাংশ বাসা বাড়ি ও স্কুল কলেজে বাজনার চর্চা হতো। গ্রামগঞ্জে, নাটক, জারি গান, পালাগান অনুষ্ঠিত হতো। এখন এসবের চর্চা কমে গেছে।
কথা হয়েছে বরিশাল বেতারের তবলা বাদক চন্দন দাসের সাথে। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন করে যুক্ত হওয়া কোচিংয়ের দৌড়ঝাঁপের কারণে শিশু-কিশোররা হারিয়ে ফেলেছে আগ্রহ। আবার কেউ পান-না তবলা শেখার সময়। কেউ বা শখ করে তবলা কিনলেও কিছুদিন শিখে বন্ধ করে দেয়।’
বরিশাল বেতারের আরেক তবলা বাদক সুশান্ত সাহা আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘শহরের হাসপাতাল রোডে স্বরলিপি সঙ্গীত বিদ্যালয় নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে। সেখানে তবলা শেখার বিভাগ আছে, কিন্তু শিক্ষার্থী পাওয়া দুষ্কর। ২/১ জন শিক্ষার্থী পাওয়া গেলেও তারা তবলা বাজানোর ব্যাকরণ শিখতে চায় না। অনেকেই এখন মোবাইলে সাউন্ড সিস্টেম সেট করে গান গায়।’
তবলা কী? তবলা একটি ঐতিহ্যবাহী দেশীয় বাদ্যযন্ত্র যা সাধারণত সংগীতে ব্যবহার হয়। যারা তবলা বাজায় তাদেরকে ‘তবলচি’ বলা হয়। বাদক- বাদ্যযন্ত্র হিসেবে গানের সাথে তালের মিল রেখে বাজিয়ে থাকেন। তবলা তৈরির জন্য প্রয়োজন এক খণ্ড গোলাকার নিম কাট। নিম কাঠ ঘুনে ধরে না। গোলাকার কাঠখণ্ডকে লেদ মেশিনের সাহায্যে ভেতর ফাঁপা করে উপরের অংশ চামড়া দিয়ে ছাউনি দেওয়া হয়। ছাউনির উপরে কালো অংশকে খিরন, চামড়ার দড়ির নাম দোয়ালি। তবলায় আটটি গুটি থাকে। তবলচি গুটির সাহায্যে দোয়ালি টেনে প্রয়োজনমত ছন্দের পরিবর্তন করেন। ছাউনির চারপাশের আধা ইঞ্চি পরিমাণ অংশকে বলা হয় কানী। তবলা তৈরি হলে খরের সাথে কাপড় পেঁচিয়ে তৈরি হয় বৃত্তাকার বিরা।
তবলা তৈরির প্রক্রিয়া: একজোড়া তবলা তৈরি করতে প্রায় ১০ দিন সময় লাগে। তবলা তৈরির জন্য নিম কাঠের অংশ সংগ্রহ করা হয় মানিকগঞ্জ থেকে। চামড়া আসে নাটোর/রাজশাহী থেকে। চামড়া কাঠ সহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী জোগাড় হলে শুরু হয় তৈরী কাজ। প্রথমে কাঠের গুঁড়িকে মেশিনে মাধ্যমে একটি পাত্রের আকারের ছাঁচে তৈরি করা হয়। তারপর চামড়া দিয়ে ঢাকনা তৈরি করে দোয়ালি দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়।
তবলার তৈরির খরচ: তবলা ভুবনের শম্ভু দাস বলেন ‘তার দোকানটি সত্তর বছরের পুরনো। গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল হলেও আত্মীয়তার সূত্রে বরিশালে আসা। তবলা তৈরি তার তিন পুরুষের ব্যবসা। এক জোড়া বায়া-তবলা সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকায় বিক্রি হয়। চামড়া-কাঠসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী জোগাড় করতে অনেক খরচ পড়ে যায়। আগে প্রতিদিন নতুন বাদ্যযন্ত্র বিক্রি ও সারাইয়ে গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা আয় হতো, সেখানে তা কমে এখন শতকের ঘরে নেমে এসেছে। কোনদিন শুন্য হাতেই ঘরে ফিরতে হয়।’
হতাশার সুরে শম্ভুর বলেন, ‘দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যমণ্ডিত বরিশাল শহরে হারমোনিয়াম, তবলা, বাঁশি, গিটার প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রের বেচাকেনা আর আগের মতো নেই। আধুনিক ইলেকট্রিক বাদ্যযন্ত্রের দাপটে সনাতনী বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসায় মন্দা চলছে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের চর্চা কমে যাওয়ায় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসারও রাশ টেনে ধরেছে।’
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)