Home » পাঠকের লেখা » মেজর জলিলের ভারত বিরোধীতা, যারা জেনেভা কনভেনশন ও শিমলা চুক্তি জানেনা এবং অর্জিত স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধের কৌশল
৭ March ২০২৬ Saturday ১০:৫৯:৫৫ PM
মেজর জলিলের ভারত বিরোধীতা, যারা জেনেভা কনভেনশন ও শিমলা চুক্তি জানেনা এবং অর্জিত স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধের কৌশল
সৈয়দ মুন্নাঃ আমি একজন “মেজর জলিল” কে মূল্যায়ন করবো কি দিয়ে? তার মুক্তিযুদ্ধের কাজ দিয়ে নাকি তার ভারত বিরোধীতার জন্য?
মেজর জলিল কে যতটা না মুক্তিযুদ্ধের কাজের জন্য বীর ভাবা হয় তার চাইতে বড় বীর বানায় সবাই ভারত বিরোধীতার জন্য। অর্থ্যাৎ মেজর জলিল ভারত বিরোধীতার জন্য মহাবীর অনেকের কাছেই। সেই অনেক লোকজন কারা?
মেজর জলিলের ভারত বিরোধীতার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হল, ৯ নং সেক্টরে বলবীর সিং এর কাছে পাকিস্তানি সৈন্যদের স্যারেন্ডারের বিষয়টা মেজর জলিল মেনে নিতে পারেননি, সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তিনি চাইছিলেন তার নিকট সবাই স্যারেন্ডার করুক। অথবা পাকিস্তান প্রীতি।
পাকিস্তানী সৈন্যদের সমর্পিত অস্ত্র ভারতীয় সৈন্য বলবীর সিং এর কাছে জমা দেয়া নিয়ে মেজর জলিলের বিরোধ এবং সেই অস্ত্র ভারতে নিয়ে যাওয়া নিয়ে বিরোধ যত চরমে। যেটিকে ভারতীয়দের লুটপাট বলেও আমরা জানি। মেজর জলিলের বিভিন্ন বর্ননায় যেটা আমরা পাই আরকি।
এখন প্রশ্ন ভারত বিরোধীতা করলে লাভ কাদের আর ক্ষতি কাদের?
প্রশ্ন কিন্তু হয়ে ওঠে, কিসের জন্য এতো ভারত বিরোধীতা?
৭১ এ মার্চ মাসে পুর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য হামলে পড়ায়, যুদ্ধ শুরু হয়। প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে বাঙালীরা, তারপর ১৮ ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন করে ৭০ এর নির্বাচনে যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন তারা সবাই মিলে এবং সেই সরকারের নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালিত হয়ে ডিসেম্বরে পাকিস্তানিদের পরাজিত করে পাকিস্তানিদের স্যারেন্ডারের মাধ্যমে ৭১ এর যুদ্ধ শেষ হয়।
ভারত পুর্ব পাকিস্থানে যুদ্ধ করতে আসে ৭১ এর নভেম্বর মাসে। এর আগে বাঙালীরাই শুধু যুদ্ধ করছে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। কথা হচ্ছে পাকিস্তান ভারতীয় বিমান ঘাটি গুলোয় হামলা না করলে, নভেম্বরে ও ভারত পূর্বপাকিস্তানে যুদ্ধে আসতো না। বাঙ্গালীরা যখন পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত , ৭১ এর নভেম্বরে ভারত ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে ভারতের বিমান ঘাটিতে পাকিস্তান হামলা চালায় সে কারনে।
এই অবস্থায় পাকিস্তান যখন বাঙ্গালী ও ভারতীয় সৈন্যদের হাতে নাস্তানাবুদ হতে থাকলো তখন পাকিস্তানিরা তারা তাদের পরাজয় মেনে নিল; এখন পাকিস্তান পরাজয় স্বীকার করবে কার কাছে! বাঙ্গালীদের কাছে না কি ভারতের কাছে? সবাইর এখানে ধারনা বাঙ্গালীদের কাছে।
কিন্তু ঘটনা হল উল্টো; পাকিস্তান স্যারেন্ডার কেরছে ভারতের কাছে। আর এখান থেকেই যত ভারত বিরোধীতা।
আমাদের মেজর জলিলের ভারত বিরোধীতা কি এখান থেকেই শুরু?
তাইলে মেজর জলিল কি জেনেভা কনভেনশন জানতেন না? তিনি একজন মেজর ছিলেন, আবার কলকাতা থেকে যুদ্ধের উপর অনেক বড় বই কিনে কিনে পড়তেন। আমরা তো সেটাই জানি। আমাদের কে এভাবেই জানানো হয়েছে।
ভারত তখন জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষর করা দেশ। আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত সম্পন্ন রাষ্ট্র। তারা রাষ্ট্র হিসেবে যুদ্ধবন্দীদের বন্দী করতে পারে স্যারেন্ডারের মাধ্যমে। একটা রাস্ট্রের স্বাধীনতা অর্জন করতে যুদ্ধবন্দীদের সাথে জেনেভা কনভেনশন আইন মেনে চলতে হয়। সে হিসেবে পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের কাছে আত্মসমর্পন করতে পারেনা। আতাউল গনি ওসমানির স্যারেন্ডার অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকার কারন শুধু এটাই ছিল না, স্যারেন্ডার অনুষ্ঠানে যদি ভারতের সেনা প্রধান থাকতেন তবে জেনারেল আতাউল গনি ওসমানি উনি ও থাকতে পারতেন।
মাত্র স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের হাতে যদি স্যারেন্ডারের মাধ্যমে পরাজিত পাকিস্তানিদেরকে যুদ্ধবন্দী করা হতো, বাংলাদেশ তো রাগে ক্ষোভে ৯৩ হাজার পাকিস্তানীদের পিডাইয়াই মাইরা ফেলাইতে; যুদ্ধবন্দী আইন ভঙ্গ হত,আর এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে চরম ভাবে ব্যহত হত। আর নিয়ম ও নাই এরকম। পরাজিত সৈন্যদের স্যরেন্ডার করতে হবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সম্পন্ন রাস্ট্রের সেনাদের হাতে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ তো সদ্য জন্ম নেবে এমন একটি স্থান ছিল তখন । পাকিস্তানিরা স্যারেন্ডার করার পর তারপর জন্ম নেবে একটি দেশ। একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা অর্জন অত সহজ নয়। এসব তো একজন মেজর হিসেবে মেজর জলিলের অজানা কিছু নয়। তাইলে জলিল সাহেবর এমন আচরন কেন ছিল? তিনি কি এদেশের স্বাধীনতাটাকে চাচ্ছিলেন না?
পাকিস্তান জেনে বুঝেই চির শত্রু ভারতের হাতে স্যারেন্ডার করে। ভারত পাকিস্তানীদের বন্দী করে পাকিস্তানী সৈন্যদের অস্ত্র সমেত যুদ্ধ বন্দী হিসেবে ভারত নিয়ে যায়। ৯ নং সেক্টরে ভারতের প্রতিনিধি সৈন্য বলবীর সিং ঐ একই কাজ করলে মেজর জলিল একজন ৯ নং সেক্টর কমান্ডার হিসেবে ভারতের বিরুদ্ধে লুটপাটের অভিযোগ তোলে, অস্ত্র লুটের অভিযোগ তোলে; এখন প্রশ্ন হল মেজর জলিল কি আসলেই যুদ্ধবন্দীর নিয়ম জানতেন না? মেজর জলিল সব কিছুই জানতেন। তিনি এও জানতেন জেনেভা কনভেনশন ভঙ্গ হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিতর্কের মুখে পড়বে। প্রশ্নবিদ্ধ হবে বাংলাদেশ।
যাইহোক খুব দ্রুতই যুদ্ধবন্দী হস্তান্তর হয় ভারত পাকিস্থানের সাথে। ১৯৭২ সালের ২ রা জুলাই শিমলা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ইন্দিরা গান্ধী ও ভুট্টোর সাথে। ৯৩ হাজার পাকিস্তানী সৈন্য ও অস্ত্র পাকিস্তানের ভুট্টো বুঝে নিয়ে সিমলা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে দিনটি ছিল ১৯৭২ সালের ৩ রা জুলাই। এই সিমলা চুক্তিতে বাংলাদেশ কিন্তু উপস্থিত ছিল না। তবে যুদ্ধবন্দী ও আটক ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত ১৯৭৩ সালের ২৮ আগস্ট ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে দিল্লি চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন দিল্লি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন, যা যুদ্ধবন্দী ও তাদের অস্ত্র ফেরতের বিষয়টি সমাধান করে জেনেভা কনভেনশন আইন প্রতিপালিত হয়। বাংলাদেশের পতাকা মুক্ত আকাশে উড়তে আর কোন বিপত্তি থাকেনা।
মেজর জলিলকে যে কারনে তাকে মহান বীর ভাবা হয় সেই ভারত বিরোধীতা যদি সফল হতো, তাহলে জেনেভা কনভেনশন ও সিমলা চুক্তি ব্যহত হত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঝুলে থাকতো। এতে লাভের লাভ কার হতো? স্বাধীনতা বিরোধী দল জামাত, পরাজিত পাকিস্তান এদের?
কথা হচ্ছে যারা জেনেভা কনভেনশন ও শিমলা চুক্তি জানেনা তাদের কাছে বিষয়টা বাংলাদেশ প্রেমেরই মতন করে আবেগ কাজ করে। কিন্তু যারা জেনেভা কনভেনশন ও শিমলা চুক্তি জানে তাদের কাছে বিষয়টার আবেগ কাজ করে অর্জিত স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধের কৌশল হিসেবে। ডিরেক্ট। কোন ভেজাল নাই।
স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমানের আমল গেল, হুসাইন মোঃ এরশাদের আমল গেল, বেগম খালেদা জিয়ার আমল গেল, কোন সরকার মেজর জলিল কে কোন খেতাব দেইনি। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের জন্য ও না। কেন দেইনি?
অবশ্যই তিনি অনেক সম্মানিত এজন্য অনেক কিছুর নাম করন করা হয়েছে তার নামে যা তার অবশ্যই প্রাপ্য।
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এত পরিমান ঘৃন্যা নিয়ে মেজর জলিল যুদ্ধ করেছে যে সেই যুদ্ধের পরিনাম অত্যন্ত ভয়াবহ ছিল, এরকমটাই আমরা জেনেছি তার গেরীলা যুদ্ধের বীরত্ব সম্পর্কে। আমাদেরকে জানানো হইছে এরকম ভাবে। বাস্তবতায় আমরা আবার কি দেখতেছি? ঘৃন্য সেই পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থান কালে ১৯৮৯ সালে ১৯ নভেম্বর হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাত ১০টা ৩০ মিনিটে মেজর জলিল ইহলোক ত্যাগ করেন। পরে ২২ নভেম্বর তাঁর মৃতদেহ ঢাকায় আনা হয় এবং সামরিক মর্যাদায় মিরপুরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। এথেকে কি বোঝার আছে?
স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। স্বাধীনতার এত বছর পরেও সেই স্বাধীনতা বিরোধীরা ষড়যন্ত্র করেই যাচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ভুলুণ্ঠিত করার জন্য। ৭১ এর স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি আজ এই দেশের প্রধান বিরোধী দলে। এদেশের মানুষ কে ভুল ভাল বুঝিয়ে এই দেশের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি হয়েও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে নাকি কাজ করতে চাইছে। অবস্থা এখন এরকম। এতে স্বাধীনতা বিরোধীরা যদি স্বাধীনতা পদক পেয়েও বসে তাতে অবাক হবার কিছুই নেই।
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বৃক্ষ রোপণের বড় চ্যালেঞ্জ পরিচর্যা নিশ্চিত করা : তথ্যমন্ত্রী
বরিশালে বাড়ছেই ডেঙ্গু, চলতি মাসে আক্রান্ত ১৪৫০
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়: অর্ধেক শিক্ষকের পদ ফাঁকা শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ
আগুনে পোড়া ভবনে ৭.৪২ কোটি টাকার ‘ভুতুড়ে’ সংস্কার: বিসিসির অর্থ লোপাটের চাঞ্চল্যকর চিত্র