Current Bangladesh Time
Tuesday July ২৮, ২০২৬ ৩:২৩ AM
Barisal News
Latest News
Home » পাঠকের লেখা » ভারতীয় আধিপত্যবাদের নেপথ্যে….
২৬ March ২০২৬ Thursday ৩:৫৯:৩৪ PM
Print this E-mail this

ভারতীয় আধিপত্যবাদের নেপথ্যে….


সৈয়দ মুন্নাঃ

ভারতীয় আধিপত্যবাদ জিনিসটা কি?ভারতের কথা ছাড়া বাংলাদেশ চলছে না? ভারতের লোকজন এসে এদেশের লোকদের শাসন করতেছে? ভারতের কথা মতন চলতে হবে এরকম প্রভাব খাটাচ্ছে? বাংলাদেশের টাকা সব ভারতে চলে যাচ্ছে? লক্ষ লক্ষ ভারতের লোকজন এসে বাংলাদেশে সরকারী চাকুরী করতেছে?বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন সব চুক্তি ভারত করিয়ে নিছে?

আরো প্রশ্ন আছে, মাত্র এই কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিন না!

ভারতীয় আধিপত্যবাদ কথাটি ব্যবহার করে সর্বজন স্বীকৃত রক্তচোষা মাসুম হয়ে যায়! চরম লেবেলের সুদ খোর ও সুফি দরবেশ পর্যায়ে পৌছে যায়। রাজমিস্ত্রীর ছেলে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়। ফকির টোকাই পোলাপানের ঘর হয়, বাড়ি হয়, গাড়ি হয়, ব্যবসা হয়, বড় জায়গায় বিয়ে হয়, বিটকয়েনে টাকার লেনদেন শেখে, ঐ ভারতেই জমি কেনে, ভারতে টাকা পাচার করে। ইলিশের ব্যবসা করে। তেলের ব্যবসা করে। তারপর আবার দিল্লী না ঢাকা স্লোগান দিয়া দিয়া হিন্দুদের প্রতি ঘৃনায় বমি করে।

এই ভারতীয় আধিপত্যবাদ সাধারন মানুষরে বুঝ দিয়া স্বার্থ হাসিলের সুন্দর একটি পন্থা। বাটপারি আরকি!

আসিফ নজরুল নামে একটা লোক আছে, যিনি এই ভারতীয় আধিপত্যবাদ নিয়া খু্ব চিল্লাইছেন, দাবী করেছেন ২৬ লক্ষ ভারতীয় লোক বাংলাদেশে সরকারী চাকরী করে।

ভারতীয় আধিপত্যবাদ কথাটি শুনলে মানুষের মনে একটা অন্যরকম ভাব কাজ করে। মানুষ আসিফ নজরুলের কথা বিশ্বাস করেছিল এবং ভাবছিলো এই ২৬ লক্ষ লোক যদি চাকুরী চ্যুত হয়, আমরা যারা তরুন বেকার তারাও চাকরী পাবো। মানুষ যখন লোভে পড়ে তখন জ্ঞান বুদ্ধি কাজ করে কম। তাইলে ভারতীয় আধিপত্যবাদ রুখে দিতে হলে কি করতে হবে? সরকারকে ফেলায়ে দিতে হবে। আসিফ নজরুলের কথায় মানুষ রাস্তায় নেমে গেল, সরকার ফেলায়ে দিল। তিনি আইন উপদেষ্টা হলেন। কিন্তু সেই ২৬ লাখ ভারতীয়র তালিকা তিনি দিতে পারেন নাই, তাদের চাকরীও বাতিল করতে পারেন নাই, অথবা বেকার যারা আন্দোলন করেছিলেন তারা কেউই ভারতীয়দের স্থলে চাকরি পেয়েছেন এমনও হয় নাই।

এরপর দেখলাম সেভেন সিস্টার খাইয়া মাইয়া দিমু, গলার সার রগ ফুলাইয়া এই দিল্লি না ঢাকা এমন চিল্লান চিল্লাইতে চিল্লাইতে অনেক লোক জুটলো। সেভেন সিস্টার খাওয়ার কথাতে অনেক মানুষ উৎফুল্ল হইলো। কেন হইলো, কিসের জন্য হইলো? জানতে চাইলে তারা জানেনা।

এই দিল্লি না ঢাকা, বললেই তারা বলে ঢাকা ঢাকা। মানুষে ভাবছে কি না কি! বাবারে। এরপর তিনি যখন এমপি হইলেন তখন কিছু মানুষে জিগায়া জানতে চায়, ওস্তাদ দিল্লি না ঢাকা আর কইবেন না? সেই সোভেন সিস্টার কিন্তু এখনও সেভেন সিস্টারই আছে। লাভের লাভ যা হইছে তা হল এম্পি হতে পেরেছেন। এই হইল অবস্থা! এখন আর ওসব স্লোগান শোনা যায়না। শুনিনা আরকি।

ভারত বিরোধীতার আর একটা সহিহ কারন হচ্ছে ভারতেরা সব হিন্দু, মালাউন। ওদের বিরোধীতা করে যদি একটু ভাল মুসলমান হওয়া যায়, একটু সওয়াব। বেহেস্ত। শর্টকার্টে। এই লোভেও….

এই বাংলাদেশ স্বাধীন হোক পাকিস্তান কোনদিনও চায়নি। যুদ্ধটা পাকিস্থানের সাথেই ছিল। বাংলাদেশ ছিল পুর্ব পাকিস্থান আর ওরা ছিল পশ্চিম পাকিস্তান। যুদ্ধটা এমনে এমনে হয় নাই। দীর্ঘ দিনের শোষন বঞ্চনা, অপ্রাপ্তী, নির্যাতন, বৈষম্য, অধিকার বঞ্চিত করা, এরপর সংবিধান প্রণয়ণের জন্য ৭০ এর নির্বাচন এবং জনরায় কে অপমান করা, নিরীহ বাঙ্গালীদের উপর হামলে পড়া এবং আরো অনেক কারনে যুদ্ধ নামক লড়াইটা শুরু হয়।

এই যুদ্ধে ভুট্টোর প্রতিজ্ঞা ছিল পুর্ব পাকিস্তানের সাড়ে তিন হাত মাটি তামা করে দিতে যাতে কাউকে দাফন পর্যন্ত দিতে না পারে। আর নিয়াজির আদেশ ছিল পুর্বপাকিস্তানি নারীদের গর্ভে পশ্চিম পাকিস্তানি দের বীজ ঢুকাইয়া দিতে, যাতে পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিরোধীতা না করতে পারে কোন দিন। এই আদেশ গুলো পালন করতো পাকিস্তানি সৈন্যদের পাশাপাশি জামায়াত ইসলামী দল ও তাদের সহযোগী সংঘঠন আল বদর, আল শামছ ও বেতন ভুক্ত রাজাকার বাহীনী। বিভিষীকাময় ছিল সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা। লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালী নারী বেইজ্জতি হইছিল, ৩০ লক্ষ মানুষরে মাইরা ফেলছিল। নির্যাতনের শিকার হয়েছিল ৪ থেকে ৬ লক্ষ নারী, ধর্ষনের শিকার হয়ে গর্ভবতী হয়েছিল প্রায় ২ লক্ষ নারী এর ভেতর ১ লক্ষ ৬০ হাজার নারীকে গর্ভপাত করানো হয়েছিল। গর্ভনিয়ে আত্মহত্যা করেছিল প্রায় ৩০০০০ নারী। যুদ্ধ শিশুর জন্ম হয়েছিল প্রায় ১০০০০ এর মতন (তাদের মধ্যে অনেককে বিদেশে দত্তক দেওয়া হয়েছিল) এইরকম একটা ভয়াবহ ভীতিকর যুদ্ধে পাকিস্তানিদের স্যারেন্ডার করানোর মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জিত হয় বাংলাদেশের। এবং আন্তর্জাতিক সব নিয়ম কানুন মেনেই। সেদিন পাকিস্তানি সৈন্যরা স্যারেন্ডার করলেও জামাত ইসলামীরা স্যারেন্ডার করেনি।

একটা স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে অনেক গুলো নিয়ম মেনে চলতে হয়, যেমনঃ স্বাধীনতার ঘোষনা, যুদ্ধ কালিন সরকার, জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী স্যারেন্ডার, যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যার্পন। বৈদেশিক সৈন্য প্রত্যাহার।

স্বাধীনতার ঘোষনাঃ

ঘোষনা দিয়ে যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করা প্রকৃত বীরের কাজ।

পৃথিবীতে এমন স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করা দেশ মূলত দুটি— একটি বাংলাদেশ (১৯৭১) এবং অন্যটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (১৭৭৬)।

এই দুই দেশেরই নিজস্ব স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (Declaration of Independence) রয়েছে, যা যুদ্ধের শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার করা হয়েছিল।

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে।
এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৭৭৬ সালের ৪ঠা জুলাই স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং পরবর্তীতে লড়াইয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করে।

তবে সামগ্রিকভাবে, বিশ্বের দশটিরও বেশি দেশ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করেছে, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ঘোষণাপত্র’ ব ডিক্লারেশন অফ ইন্ডিপেন্ডেন্স এর মাধ্যমে স্বাধীনতা পাওয়ার দিক থেকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রই প্রধান।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও গৌরবময় অধ্যায়। দীর্ঘদিনের শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের চূড়ান্ত ফলস্বরূপ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বৈষম্যের শিকার হয়। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ধীরে ধীরে গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেও শেখ মুজিবুর রহমান-এর নেতৃত্বাধীন দলকে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। এর ফলে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর সেই ভাষণ ছিল কার্যত স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা। পরবর্তীতে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর নির্মম হামলা চালায়, যা ইতিহাসে অপরেশন সার্চ লাইট নামে পরিচিত।

পাকিস্থানীদের এমন নৃশংস হামলার প্রেক্ষিতে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁর ঘোষণাটি পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত হয় এবং সারা দেশে স্বাধীনতার বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। শেখ মুজিবুর রহমানকে ঐ রাতেই পাকিস্থানীরা রাস্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগ এনে গ্রেফতার করে পাকিস্থানে নিয়ে বন্দী করে রাখে।

একই সঙ্গে ২৭ মার্চ তারিখে মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন, যা মুক্তিযুদ্ধকে আরও সংগঠিত করে।

২৬ শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধের পথে অগ্রসর হয় যা দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, এটি ছিল একটি জাতির আত্মমর্যাদা, অধিকার ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এই ঘোষণার মাধ্যমেই বাঙালি জাতি বিশ্ব দরবারে নিজেদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু করে।

কেন প্রয়োজন হয় স্বাধীনতা ঘোষনার?

রাষ্ট্র স্বাধীন করতে স্বাধীনতার ঘোষণা একটি আইনানুগ ও রাজনৈতিক ভিত্তি। এটি কোনো অঞ্চল বা জনগণের পক্ষ থেকে সার্বভৌমত্ব বা স্বশাসনের আনুষ্ঠানিক দাবি, যা যুদ্ধের আইনি বৈধতা প্রদান করে। এই ঘোষণা বিশ্বের দরবারে নতুন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অর্জন, জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং শত্রুর আক্রমণের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য।

আইনগত বৈধতাঃ (Legal Validity) স্বাধীনতার ঘোষণা একটি অঞ্চলকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী বিদ্রোহ’ থেকে আলাদা করে ‘স্বাধীনতার যুদ্ধ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রের আইনি ভিত্তি তৈরি করে।

ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধঃ জনগণের প্রতি ডাক দেওয়ার মাধ্যমে এটি একটি সাধারণ লক্ষ্য—স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সবাইকে একত্রিত করে ।

সার্বভৌমত্বের দাবিঃ এটি একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ওপর জনগণের স্ব শাসনের অধিকার এবং পূর্বের শাসন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘোষণা ।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিঃ নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হিসেবে অন্য দেশগুলোর কাছ থেকে স্বীকৃতি বা সমর্থন পাওয়ার জন্য এটি একটি প্রাথমিক দলিল।

প্রথম সংবিধানঃ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১০ এপ্রিল ১৯৭১-এ গৃহীত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ ছিল প্রথম সাংবিধানিক দলিল, যার মাধ্যমে মুজিবনগরে স্বাধীন সরকার শপথ গ্রহণ করে ।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ রাত ১২টার পর (২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে) আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, যা জাতিকে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অনুপ্রাণিত ও বৈধতা দিয়েছিল।

যুদ্ধ কালিন সরকারঃ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় একটি সুসংগঠিত নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার জন্য যে সরকার গঠিত হয়েছিল, সেটিই ইতিহাসে “মুজিবনগর সরকার” বা অস্থায়ী সরকার নামে পরিচিত। এই সরকারই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জন এবং দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সরকার গঠনের প্রেক্ষাপট-

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর হামলার (Operation Searchlight) পর বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই যুদ্ধকে সংগঠিত ও বৈধতা দেওয়ার জন্য এবং যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি কেন্দ্রীয় সরকার গঠন অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

মুজিবনগর সরকারের ঘোষণা-

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়ার বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমান মুজিবনগর) এই সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এ কারণেই এটি “মুজিবনগর সরকার” নামে পরিচিত।

সরকারের নেতৃত্ব-

এই সরকারের প্রধান ব্যক্তিবর্গ ছিলেন—

রাষ্ট্রপতি: শেখ মুজিবুর রহমান (তৎকালীন পাকিস্তানে বন্দি অবস্থায়)
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি: সৈয়দ নজরুল ইসলাম
প্রধানমন্ত্রী: তাজউদ্দীন আহমদ
পররাষ্ট্রমন্ত্রী: খন্দকার মোশতাক আহমেদ
সেনাবাহিনীর প্রধান: এম এ জি ওসমানী

যুদ্ধকালীন সরকারের কার্যক্রম-

মুজিবনগর সরকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করে, যেমন—

মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য সেক্টরভিত্তিক সামরিক কাঠামো গঠন।

আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনের চেষ্টা।

শরণার্থীদের সহায়তা ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা।

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও সংগঠন করা।

মুজিবনগর সরকার ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার বৈধ ও রাজনৈতিক ভিত্তি। এই সরকারই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন আন্দোলন নয়, বরং একটি সংগঠিত জাতির মুক্তির সংগ্রাম।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে যুদ্ধকালীন সরকারের সুদূরপ্রসারী নেতৃত্ব, কৌশল এবং আত্মত্যাগের ফলে বাঙালি জাতি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে।

কেন প্রয়োজন ছিল এই সরকারের?

রাষ্ট্র স্বাধীন করতে যুদ্ধকালীন সরকার (যেমন: মুজিবনগর সরকার) অপরিহার্য ছিল, কারণ এটি যুদ্ধের বৈধতা, সাংগঠনিক ও কূটনৈতিক নেতৃত্ব প্রদান করে। এই সরকার মুক্তিবাহিনী গঠন ও পরিচালনা, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়, জনগণের মনোবল ধরে রাখা এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনি ভিত্তি স্থাপনে প্রধান ভূমিকা পালন করে, যা যুদ্ধের প্রতিটি পর্যায়ে দিকনির্দেশনা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখে।

যুদ্ধকালীন সরকারের প্রয়োজনীয়তার প্রধান কারণসমূহ ছিল-

বৈধ নেতৃত্ব ও সামরিক পরিচালনাঃ যুদ্ধকালীন সরকারই যুদ্ধের আইনগত এবং রাজনৈতিক বৈধতা দেয়। এটি মুক্তিবাহিনী ও নিয়মিত সেনাবাহিনীকে (যেমন: মুক্তিবাহিনী) একটি কাঠামোর অধীনে এনে সুশৃঙ্খলভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কঃ অন্য কোনো দেশ বা বিশ্বজনমত তখনই একটি স্বাধীনতাকামী আন্দোলনকে স্বীকৃতি দেয়, যখন তার পেছনে একটি সরকার থাকে। মুজিবনগর সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দূত পাঠিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও সাহায্য আদায় করেছিল।

স্বাধীনতার আইনি ও প্রশাসনিক ভিত্তিঃ যুদ্ধকালীন সরকারই প্রমাণ করে যে, এটি একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের যুদ্ধ। এটিই একটি ‘রাষ্ট্রের’ আইনি অস্তিত্বের ঘোষণা দেয় ।

জনগণের মধ্যে মনোবল ও ঐক্যঃ সরকার যুদ্ধরত দেশবাসীর মধ্যে সাহস ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করে এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রাখা এলাকাগুলোতে (মুক্তাঞ্চল) আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ১০ এপ্রিল গঠিত মুজিবনগর সরকার (১৭ এপ্রিল শপথ) এই সব দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছিল, যার ফলে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী স্যারেন্ডারঃ

আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মূল ভিত্তি হলো যুদ্ধের মধ্যেও মানবতা রক্ষা করা। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে International Committee of the Red Cross-এর উদ্যোগে প্রণীত Geneva Conventions যুদ্ধক্ষেত্রে আহত, অসুস্থ, বেসামরিক ব্যক্তি এবং আত্মসমর্পণকারী সৈন্যদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। “স্যারেন্ডার” বা আত্মসমর্পণ এই কনভেনশনগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

আত্মসমর্পণের অর্থ-

যুদ্ধক্ষেত্রে যখন কোনো সৈন্য বা বাহিনী আর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক হয়ে অস্ত্র ত্যাগ করে এবং প্রতিপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন তাকে “স্যারেন্ডার” বলা হয়। এটি একটি আইনি ও মানবিক অবস্থান—যেখানে আত্মসমর্পণকারী আর বৈধ লক্ষ্য (legitimate target) থাকে না।

আত্মসমর্পণকারীর অধিকার-

জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী আত্মসমর্পণকারী সৈন্যকে যুদ্ধবন্দী (Prisoner of War – POW) হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তাদের জন্য কিছু মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে—

জীবনের নিরাপত্তা:
আত্মসমর্পণের পর তাকে হত্যা করা বা আঘাত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

মানবিক আচরণ:
কোনো ধরনের নির্যাতন, অপমান বা অমানবিক আচরণ করা যাবে না।

চিকিৎসা সুবিধা:
আহত বা অসুস্থ হলে যথাযথ চিকিৎসা দিতে হবে।

খাদ্য ও আশ্রয়:
পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

পরিবারের সাথে যোগাযোগ:
যুদ্ধবন্দীরা নির্দিষ্ট নিয়মে পরিবারের সাথে যোগাযোগের সুযোগ পাবে।

আত্মসমর্পণ গ্রহণের নিয়ম-

যে পক্ষ আত্মসমর্পণ গ্রহণ করবে, তাদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে—

আত্মসমর্পণের স্পষ্ট সংকেত (যেমন অস্ত্র ফেলে দেওয়া, হাত উঁচু করা) দেখলে আক্রমণ বন্ধ করতে হবে
বন্দীদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করতে হবে
আন্তর্জাতিক আইনের নিয়ম মেনে তাদের সাথে আচরণ করতে হবে

লঙ্ঘনের ফলাফল-

যদি কোনো পক্ষ আত্মসমর্পণকারীকে হত্যা বা নির্যাতন করে, তা আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ (War Crime) হিসেবে গণ্য হয়। এসব অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক আদালতেও হতে পারে। অর্জিত স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

জেনেভা কনভেনশন যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝেও মানবিকতা রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

“স্যারেন্ডার” বা আত্মসমর্পণের নিয়মগুলো প্রমাণ করে—যুদ্ধের মধ্যেও কিছু নৈতিক ও আইনি সীমা রয়েছে, যা অমানবিকতা ঠেকাতে অপরিহার্য। মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় এসব নিয়ম মেনে চলা সকল রাষ্ট্র ও যোদ্ধার দায়িত্ব। নাইলে একটি রাস্ট্রের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

প্রশ্ন হল M. A. G. Osmani কেন স্যারেন্ডার অনুষ্ঠানে ছিলেন না?

এম এ জি ওসমানী ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। কিন্তু ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স গ্রাউন্ডে-এ অনুষ্ঠিত আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন না—এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।

যৌথ বাহিনীর কাঠামো-

বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতের সেনাবাহিনী একসাথে “মিত্রবাহিনী” হিসেবে যুদ্ধ করে।
এই যৌথ বাহিনীর সামগ্রিক কমান্ডে ছিলেন জগজিৎ সিং অরোরা। তাই আত্মসমর্পণ গ্রহণের দায়িত্বও তার ওপরই বর্তায়।

আনুষ্ঠানিক সামরিক প্রটোকল-

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে সাধারণত যে বাহিনী সরাসরি শত্রুপক্ষকে ঘিরে ফেলে
এবং যাদের কমান্ডার সেই মুহূর্তে অপারেশন পরিচালনা করেন। তারাই আত্মসমর্পণ গ্রহণ করেন। ঢাকায় সরাসরি অপারেশন পরিচালনা করছিল ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড।আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত খুব দ্রুত নেওয়া হয়।
A. A. K. Niazi ঢাকায় আত্মসমর্পণ করেন এবং সেই সময় যে কমান্ডার মাঠে উপস্থিত ছিলেন, তার কাছেই আত্মসমর্পণ করা হয়।

প্রটোকল সমস্যাঃ আত্মসমর্পণের দলিলে সই করার কথা ছিল পাকিস্তানের নিয়াজি ও ভারতের অরোরার, যারা উভয়েই ছিলেন লেফট্যানেন্ট জেনারেল। ওসমানী ছিলেন জেনারেল পদমর্যাদার (৪ তারকা), যা নিয়াজি বা অরোরার চেয়ে এক ধাপ উপরে। সামরিক প্রটোকল অনুযায়ী, সিনিয়র হয়ে জুনিয়রদের সই করা অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থাকতে চাননি।

যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যার্পন বা শিমলা চুক্তি ও দিল্লি চুক্তিঃ

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৯৩,০০০ সদস্য মিত্রবাহিনীর (বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড) কাছে আত্মসমর্পণ করে। আন্তর্জাতিক আইন ও জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী এই বিপুল সংখ্যক সেনাকে যুদ্ধবন্দী (POW) হিসেবে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। এই বন্দীদের মুক্তি এবং দুই দেশের সীমানা নির্ধারণ নিয়ে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনেই শিমলা চুক্তির অবতারণা।

১৯৭২ সালের ২ জুলাই ভারতের হিমাচল প্রদেশের শিমলায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

১. দ্বিপাক্ষিক সমাধানঃ ভারত ও পাকিস্তান তাদের মধ্যকার সমস্ত বিরোধ (বিশেষ করে কাশ্মীর ইস্যু) কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবে।

২. সীমানা নির্ধারণঃ (LoC)জম্মু ও কাশ্মীরে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বরের যুদ্ধবিরতি রেখাকে ‘লাইন অফ কন্ট্রোল’ (LoC) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

৩. যুদ্ধবন্দী ও ভূখণ্ড ফেরতঃ চুক্তির পর ভারত পাকিস্তানের দখলকৃত এলাকাগুলো ছেড়ে দেয়।

তবে ৯৩,০০০ যুদ্ধবন্দীর মুক্তি নিয়ে বিষয়টি ছিল জটিল, কারণ তারা যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল এবং বাংলাদেশ তাদের বিচারের দাবি জানিয়ে আসছিল।

যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যর্পণঃ শিমলা চুক্তিতে যুদ্ধবন্দীদের মুক্তির পথ প্রশস্ত হলেও এটি বাস্তবায়িত হয় মূলত ১৯৭৩ সালের
দিল্লি চুক্তি’র মাধ্যমে। বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে অটল থাকলেও, পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চাপ এবং পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিদের ফিরিয়ে আনার স্বার্থে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা হয়।

এর ফলে ভারত ধাপে ধাপে ৯৩,০০০ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীকে মুক্তি দেয়।

পাকিস্তান তাদের দেশে আটকে পড়া কয়েক লাখ বাঙালিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।

বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী সেনাকে পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করে (পাকিস্তান তাদের বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে তা রাখেনি)।

১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি সেনার বিচার ও পাকিস্থানিদের বাটপারিঃ

পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তনঃ ১৯৫ জন সেনাকে ভারতের বন্দী শিবির থেকে সরাসরি পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়। পাকিস্তান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা নিজেদের দেশে এসব অপরাধীদের বিচার করবে।

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও পদোন্নতিঃ পাকিস্তান তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। এই ১৯৫ জনের কাউকেই কোনো সাজা দেওয়া হয়নি। বরং তাদের অনেককে সেনাবাহিনীতে পদোন্নতি দেওয়া হয় এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করা হয় ।

বর্তমান পরিস্থিতিঃ মুক্তিযুদ্ধের পর ৫৩ বছর পেরিয়ে যাওয়ায় এই তালিকার শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব বড় কর্মকর্তাই (যেমন: নিয়াজি, রাও ফরমান আলী, টিক্কা খান) বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন।

বিচারহীনতাঃ পাকিস্তান আজ পর্যন্ত এই ১৯৫ জনের কারো বিচার করেনি কিংবা বাংলাদেশের কাছে তাদের বিচারের জন্য হস্তান্তরও করেনি।

বাংলাদেশ সরকার ২০১৬ সালে এই ১৯৫ জনের তথ্য সংগ্রহের জন্য পুনরায় একটি কমিটি গঠন করে এবং পরবর্তীতে তালিকার পরিধি বাড়িয়ে ২৬১ জনের একটি তালিকাও বিভিন্ন সংগঠন প্রকাশ করেছে।

গণহত্যাকারী ১৯৫ জনের তালিকা এবং তাদের বর্তমান অবস্থান।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় দিল্লি চুক্তির পর তাদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয় ।

এই ১৯৫ জনের পূর্ণাঙ্গ তালিকা বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে বেশ কয়েকবার প্রকাশিত হয়েছে।

১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর তালিকা (শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন) গণহত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে জড়িত শীর্ষ কর্মকর্তাদের কয়েকজনের নাম নিচে দেওয়া হলো।

১. লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজি (পূর্ব কমান্ডের প্রধান)

২. মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী (গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী)

৩. মেজর জেনারেল নাজর হোসেন শাহ (১৬ ডিভিশন)

৪. মেজর জেনারেল মোহাম্মদ হোসেন আনসারি (৯ ডিভিশন)

৫. মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জামশেদ (ডিজিইপিসিএএফ)

৬. মেজর জেনারেল কাজী আব্দুল মজিদ খান (১৪ ডিভিশন)

৭. ব্রিগেডিয়ার মঞ্জুর হোসেন আতিফ

৮. কর্নেল ইয়াকুব মালিক

পদমর্যাদা অনুযায়ী বিভাজনঃ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ১৯৫ জনের এই তালিকায় ১ জন লেফটেন্যান্ট জেনারেল, ৫ জন মেজর জেনারেল, ২০ জন ব্রিগেডিয়ার, ৩৯ জন লেফটেন্যান্ট কর্নেল, ৫ জন কর্নেল, ৪৪ জন ক্যাপ্টেন এবং ৮১ জন মেজরসহ নৌ ও বিমান বাহিনীর কর্মকর্তারাও ছিলেন।

১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার কেন হয়নি?
বাংলাদেশ শুরুতে এই ১৯৫ জন উচ্চপদস্থ পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার বিচারের ব্যাপারে অনড় ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু আন্তর্জাতিক ও কৌশলগত কারণে সেটা হয়নি।

আটকে পড়া বাঙালিদের নিরাপত্তাঃ পাকিস্তানে তখন প্রায় ৪ লাখ বাঙালি আটকে ছিলেন।

পাকিস্তান সরকার তাদের ‘জিম্মি’ হিসেবে ব্যবহার করে এবং হুমকি দেয় যে বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাদের বিচার শুরু হলে বাঙালিদের ওপরও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আন্তর্জাতিক চাপ ও স্বীকৃতিঃ পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিচ্ছিল না, যার ফলে ওআইসি (OIC) বা জাতিসংঘের মতো সংস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছিল না। ১৯৭৪ সালে লাহোরে ওআইসি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার শর্ত হিসেবে পাকিস্তান বাংলাদেশকে এই ১৯৫ জন বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব দেয়।

ত্রিপক্ষীয় চুক্তিঃ ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়। সেখানে পাকিস্তান ১৯৭১ সালের ঘটনার জন্য অভিনয়ে ‘দুঃখ প্রকাশ’ করে এবং প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা নিজেদের দেশে এই ১৯৫ জনের বিচার করবে (যদিও পাকিস্তান পরে সেই প্রতিশ্রুতি রাখেনি)। মানবিক ও শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে বঙ্গবন্ধু সরকার তাদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

চুক্তির পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সম্পর্কের পরিবর্তন

শিমলা ও দিল্লি চুক্তির পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পর্যায় দেখা যায়:

স্বীকৃতি ও কূটনৈতিক যাত্রাঃ ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

এর ফলে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

সম্পর্কের শীতলতাঃ স্বীকৃতির পর বাণিজ্য ও যোগাযোগ শুরু হলেও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ১৯৭১-এর গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা না চাওয়ায় সম্পর্কে সবসময়ই একটি তিক্ততা রয়ে গেছে।

সম্পদ বণ্টন ও দায়দেনাঃ যুদ্ধের পর অবিভক্ত পাকিস্তানের সম্পদের ভাগ এবং বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের দায় নিয়ে কোনো সমাধান আজও হয়নি, যা সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা।

পরবর্তী দশকগুলোঃ পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার (২০১৩ পরবর্তী) শুরু হওয়ার পর পাকিস্তান পার্লামেন্টে এর নিন্দা প্রস্তাব পাস করায় দুই দেশের সম্পর্ক আবার তলানিতে ঠেকে।

মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিদের ফিরে আসাঃ

মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিদের ফিরে আসার প্রক্রিয়াটি ছিল দীর্ঘ ও জটিল, যা মূলত আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সম্পাদিত কয়েকটি চুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হয় ।

জিম্মি দশা ও বন্দি শিবিরঃ যুদ্ধের পর পাকিস্তান সরকার সেদেশে কর্মরত বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা, সরকারি চাকুরিজীবী এবং সাধারণ নাগরিকদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বা ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে বন্দিশিবিরে আটকে রাখে । মূলত ভারতে বন্দী ৯৩,০০০ পাকিস্তানি সৈন্যকে মুক্ত করার জন্য তাদের ‘চাপের অস্ত্র’ বা জিম্মি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল ।

দিল্লি চুক্তিঃ (১৯৭৩)১৯৭৩ সালের ২৮ আগস্ট ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে (বাংলাদেশের সম্মতিতে) একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়।

এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত থেকে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দী, পাকিস্তান থেকে আটকে পড়া বাঙালি এবং বাংলাদেশ থেকে অ-বাঙালিদের (বিহারি) মধ্যে ‘ত্রিমুখী প্রত্যাবাসন’ (Three-way Repatriation) শুরু হয়।

জাতিসংঘের ভূমিকা (এয়ারলিফট): জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (UNHCR) এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রস (ICRC) এই বিশাল প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি তদারকি করে।

যেহেতু তখন পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সরাসরি কোনো যোগাযোগ ছিল না, তাই ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত এয়ারলিফটের (বিমান যোগে) মাধ্যমে কয়েক লাখ মানুষকে পারাপার করা হয়।

প্রত্যাবর্তনের পরিসংখ্যানঃ এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১,২১,৬৯৫ জন বাঙালি পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসেন ।

প্রথম সপ্তাহে ১,৩০৮ জন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীর বিনিময়ে ১,৪৬৮ জন বাঙালি দেশে ফেরেন ।

ত্রিপক্ষীয় চুক্তি ও সমাপ্তিঃ ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে এই মানবিক সংকট নিরসনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছায়।

এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে এই প্রক্রিয়া আরও গতি পায়।

এই দীর্ঘ অপেক্ষায় অনেক বাঙালি পরিবার পাকিস্তানে মানবেতর জীবনযাপন করেছিল এবং অনেককে জেল খাটতেও হয়েছিল।

দিল্লি চুক্তি ও ড কামাল হোসেন এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীর সুত্রপাতঃ

১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল স্বাক্ষরিত দিল্লি চুক্তি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক অনন্য কূটনৈতিক মাইলফলক। এই চুক্তির মাধ্যমে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের অবশিষ্টাংশ এবং মানবিক সংকট নিরসনের একটি চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি হয়।

১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বৈরিতা নিরসনে ১৯৭২ সালে শিমলা চুক্তি হলেও, বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের জট খোলেনি। এই জট খুলতে ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে দিল্লিতে আয়োজিত হয় এক ঐতিহাসিক ত্রিপক্ষীয় বৈঠক। বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং এবং পাকিস্তানের আজিজ আহমেদ এই বৈঠকে নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

ড. কামাল হোসেনের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি একজন দক্ষ আইনজ্ঞ হিসেবে বাংলাদেশের ন্যায়সঙ্গত দাবিগুলো তুলে ধরেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ প্রশস্ত রাখা। ড. কামালের কূটনৈতিক মুন্সিয়ানায় পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত ১৯৭১-এর নৃশংসতার জন্য সুবিধা আদায়ের জন্য অভিনয় করে দুঃখ প্রকাশ করতে বাধ্য হয়।

ত্রিপক্ষীয় সমঝোতাঃ এটি ছিল ইতিহাসের প্রথম চুক্তি যেখানে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান সমমর্যাদায় স্বাক্ষর করে।

১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীঃ বাংলাদেশ ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী সেনার বিচারের দাবিতে অটল ছিল। তবে পাকিস্তান তাদের দেশে ফিরে নিয়ে বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিলে এবং আটকে পড়া বাঙালিদের জীবন সংকটাপন্ন হওয়ায়, বাংলাদেশ মানবিক কারণে তাদের প্রত্যর্পণে রাজি হয়।

ক্ষমা ও দুঃখ প্রকাশঃ চুক্তিতে উল্লেখ করা হয় যে, পাকিস্তান সরকার ১৯৭১-এর অপরাধের জন্য অনুতপ্ত এবং তারা এর জন্য (সুবিধা আদায়ের জন্য অভিনয় করে) দুঃখ প্রকাশ করছে।

যুদ্ধাপরাধের বিচারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিঃ
দিল্লি চুক্তির একটি বড় সাফল্য ছিল যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। যদিও কৌশলগত কারণে ১৯৫ জনকে তখন ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এই চুক্তির মাধ্যমে:

অপরাধের স্বীকৃতিঃ পাকিস্তান পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেয় যে তাদের সেনাবাহিনী বাংলাদেশে অপরাধ সংঘটন করেছে।

জেনেভা কনভেনশনের প্রয়োগঃ যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি ও বিচারের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইন ও জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছিল, যা বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের আইনি অবস্থানকে শক্তিশালী করে।

আইনি ভিত্তিঃ এই চুক্তিটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তার ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধের বিচার করার পূর্ণ অধিকার রাখে। পরবর্তী সময়ে (২০১০ সালে) বাংলাদেশে যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়, তখন এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি বিচারের নৈতিক ও আইনি ভিত্তিকে আরও মজবুত করেছিল।

ভারতের দিল্লি চুক্তি (১৯৭৪) অনুযায়ী পাকিস্তান ১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী সেনা কর্মকর্তার বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিলেও, পরবর্তীতে তারা তা ভঙ্গ করে। পাকিস্তানের এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ফলে বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক মহলে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

অভ্যন্তরীণ বিচারহীনতাঃ পাকিস্তান ওই ১৯৫ জন সেনাকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো অনেককে সেনাবাহিনীতে পদোন্নতি দেওয়া হয় এবং রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান করা হয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে ছিল এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রতিবাদঃ পাকিস্তান প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায় বাংলাদেশ বারবার আন্তর্জাতিক ফোরামে এবং দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, পাকিস্তান ১৯৭১-এর গণহত্যার জন্য আজ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি।

সম্পর্কের টানাপোড়েনঃ পাকিস্তানের এই অবস্থানের কারণে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক কখনোই স্বাভাবিক আস্থার জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। বাণিজ্য ও যোগাযোগের পথ খুললেও যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি সবসময়ই একটি বড় কাঁটা হয়ে থেকেছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (২০১০): পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কয়েক দশক পর বাংলাদেশ নিজস্ব আইনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে। যদিও ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনার বিচার করা সম্ভব হয়নি (কারণ তারা পাকিস্তানে অবস্থান করছিল), তবে তাদের স্থানীয় দোসরদের (রাজাকার, আলবদর) বিচারের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেই দীর্ঘদিনের অন্যায়ের দায়মুক্তি ঘটিয়েছে ।

পাকিস্তানের নিন্দনীয় অবস্থানঃ ২০১৩ সালের পর যখন বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দেওয়া শুরু হয়, তখন পাকিস্তান তাদের পার্লামেন্টে এর বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব পাস করে। এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নগ্ন হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হয় এবং এর ফলে দুই দেশের সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

২০১০ সালের ট্রাইব্যুনালে বিদেশি আইনজীবী বা পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় পাকিস্তানের দেওয়া নিন্দা প্রস্তাবের প্রভাব২০১০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ফাঁসি কার্যকরের ঘটনায় পাকিস্তান সরকার এবং তাদের পার্লামেন্ট একাধিকবার নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল ।

আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপঃ পাকিস্তান এই বিচার প্রক্রিয়াকে ‘বিতর্কিত’ ও ‘প্রতিহিংসামূলক’ বলে অভিহিত করে, যাকে বাংলাদেশ তাদের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্বে নগ্ন হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য করে।

পাল্টা প্রতিবাদঃ পাকিস্তানের এই ধৃষ্টতার প্রতিবাদে বাংলাদেশ সরকার ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাই কমিশনারকে একাধিকবার তলব করে এবং কঠোর প্রতিবাদ লিপি (Aide Memoire) হস্তান্তর করে।

ঐতিহাসিক অবিশ্বাসের পুনর্জাগরণঃ

অপরাধীদের পক্ষাবলম্বন: পাকিস্তানের পার্লামেন্টে যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে গৃহীত প্রস্তাবগুলো প্রমাণ করে যে পাকিস্তান আজও ১৯৭১ সালের তাদের স্থানীয় দোসরদের (যেমন: আব্দুল কাদের মোল্লা, মতিউর রহমান নিজামী) পক্ষাবলম্বন করছে ।

ক্ষমা না চাওয়াঃ এই উত্তেজনার ফলে ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার দাবিটি আরও জোরালো হয় এবং দুই দেশের স্বাভাবিকীকরণের পথ আরও রুদ্ধ হয়ে যায়।

শিমলা ও দিল্লি চুক্তির অপব্যাখ্যাঃ

পাকিস্তান দাবি করেছিল যে ১৯৭৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ কারো বিচার করতে পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশ স্পষ্ট করে দেয় যে ওই চুক্তি কেবল ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনার জন্য ছিল, বাংলাদেশের নাগরিক বা স্থানীয় রাজাকারদের জন্য নয়।

জনরোষ ও বয়কটঃ

পাকিস্তানি নিন্দা প্রস্তাবের পর বাংলাদেশে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। অনেকে পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার এবং পাকিস্তানি পণ্য বয়কটের দাবি জানান। এর ফলে দুই দেশের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘ সময় শীতল ছিল।

বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (ICT-BD) অধীনে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের বিচার ও দণ্ড কার্যকর হয়েছে।

যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছেঃ
বিচারের রায় অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ছয়জন শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।

আব্দুল কাদের মোল্লাঃ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল (১৩ ডিসেম্বর ২০১৩)।

মুহাম্মদ কামারুজ্জামানঃ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল (১১ এপ্রিল ২০১৫)।

আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদঃ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল (২১ নভেম্বর ২০১৫)।

সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীঃ বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী (২১ নভেম্বর ২০১৫)।

মতিউর রহমান নিজামীঃ জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমির ও সাবেক মন্ত্রী (১১ মে ২০১৬)।

মীর কাসেম আলীঃ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য (৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬)।

কারাগারে বা আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্তঃ

গোলাম আযমঃ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির; তাকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীঃ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির; আমৃত্যু কারাদণ্ড চলাকালীন চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০২৩ সালে মারা যান।

আব্দুল আলীমঃ বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী; আমৃত্যু কারাদণ্ড ভোগকালে মারা যান।

পলাতক বা অনুপস্থিতিতে সাজাপ্রাপ্ত:

আবুল কালাম আজাদঃ (বাচ্চু রাজাকার ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে তাকে তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানঃ বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে তাদের অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

বৈদেশিক সৈন্য প্রত্যাহারঃ

নব্য স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার ছিল আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম দ্রুততম এবং বিরল একটি সামরিক ঘটনা। স্বাধীনতার মাত্র তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশের মাটি ত্যাগ করে চলে যায়।

আলোচনা ও চুক্তিঃ ৭২ এর ৮ জানুয়ারী পাকিস্থান থেকে ছাড়া পেয়ে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সময় দিল্লিতে যাত্রাবিরতি করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ৬-৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বঙ্গবন্ধু আবারও এই বিষয়টি উত্থাপন করেন।

বৈদেশিক সৈন্য প্রত্যাহারের তারিখঃ প্রাথমিকভাবে ২৫ মার্চের মধ্যে সৈন্য প্রত্যাহারের কথা থাকলেও, বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে তা এগিয়ে আনা হয়। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন তাঁর জন্মদিন অর্থাৎ ১৭ মার্চের আগেই বিদেশি সৈন্যমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে। সে অনুযায়ী, ১২ মার্চ ১৯৭২ থেকে প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় এবং ১৫ মার্চ ১৯৭২ তারিখের মধ্যে সকল ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশ ত্যাগ করে।

বিদায়ী কুচকাওয়াজঃ ১২ মার্চ ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম) ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি বর্ণাঢ্য বিদায়ী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বঙ্গবন্ধু সালাম গ্রহণ করেন।

কোনো দেশ অন্য দেশকে স্বাধীন করতে সাহায্য করার পর এত দ্রুত সৈন্য প্রত্যাহার করার নজির পৃথিবীতে কম। এটি বঙ্গবন্ধুর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের পরিচয় হিসেবে দেখা হয়, যা পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের কূটনৈতিক স্বীকৃতি পেতে সহায়ক হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্থানের কারাগারে কেন বন্দী ছিল এবং কবে ছাড়া পেল এবং কেন ছাড়ল?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে (২৫শে মার্চ দিবাগত রাত) পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে।

কেন বন্দী ছিলেন?

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে মূলত রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং বিদ্রোহে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে বন্দী ছিলেন। ১৯৭১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা আন্দোলনের ডাক দেন এবং গ্রেপ্তারের ঠিক আগমুহূর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন ২৫ শে মার্চ দিবাগত রাত্র ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে। পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার পর লয়ালপুর কারাগারে তাঁর বিরুদ্ধে গোপন সামরিক আদালত গঠন করা হয়, যেখানে ১২টি অভিযোগের মধ্যে ৬টির জন্য তাঁর মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত ছিল।

কবে কিভাবে ছাড়া পেলেন?

বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পান। দীর্ঘ ৯ মাস ১৪ দিন বন্দী থাকার পর পাকিস্তান সরকার তাঁকে মুক্তি দিয়ে বিশেষ বিমানে করে লন্ডনে পাঠিয়ে দেয়। সেখান থেকে দিল্লি হয়ে ১০ই জানুয়ারি তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন, যা ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস’ হিসেবে পরিচিত।

কেন ছেড়ে দেওয়া হলো?

পাকিস্তান সরকার মূলত আন্তর্জাতিক এবং কৌশলগত চাপের কারণে বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

আন্তর্জাতিক চাপঃ ইন্দিরা গান্ধীসহ বিশ্বের ২৪টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং জাতিসংঘ বঙ্গবন্ধুর প্রাণ রক্ষায় পাকিস্তান সরকারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছিলেন।

বাংলাদেশের বিজয় ও ৯৩ হাজার বন্দীঃ ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর ৯৩,০০০ পাকিস্তানি সৈন্য ভারতের যৌথ কমান্ডের হাতে বন্দী ছিল। পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো উপলব্ধি করেছিলেন যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলে পাকিস্তানের এই বিশাল সংখ্যক সৈন্যের জীবন ও দুই দেশের সমঝোতার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।

ভুট্টোর কৌশলঃ ভুট্টো ভেবেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিলে হয়তো তিনি বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের কোনো ধরণের শিথিল রাজনৈতিক সম্পর্ক বা ফেডারেশন বজায় রাখতে রাজি হতে পারেন। তবে মুক্তি পাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট করে দেন যে বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র।

পুর্ব পাকিস্তানে ২৫ শে মার্চ কাল রাত্রীতে নিরীহ বাঙ্গালীর উপর অপারেশন সার্চ লাইট নামক হামলা না করলে বাঙ্গালী হয়তো প্রতিরোধ যুদ্ধে নামতো না স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে। পাকিস্থানের একচেটিয়া খামখেয়ালী অত্যাচার, স্বেচ্ছাচারীতা ও কাউকে পরোয়া না করার মানষিকতা, বাঙ্গালীদের মারলে কি হবে, কিছুই হবে না এই যে অহংবোধ নিরিহ বাঙ্গালীকে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে নামাতে বাধ্য করেছিল পাকিস্থান।

এর আগে ১৯৭১ সালের ৩০ জানুয়ারি, ভারতের একটি যাত্রীবাহী বিমান ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৮১৪ যা তখন “গঙ্গা” নামে পরিচিত দুই কাশ্মীরি যুবক ছিনতাই করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। বিমানটি পাকিস্তানের
লাহোর-এ অবতরণ করে। যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার পর ছিনতাইকারীরা বিমানটিতে আগুন ধরিয়ে দেয় পুরো ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়। এরপর ভারত আকাশপথ বন্ধ করে দেয়। ভারত সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তানের কোনো বিমান আর ভারতের আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে না। এর ফলে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে পাকিস্তানের সেনা ও সরবরাহ পাঠানো কঠিন হয়ে যায়। ফলে পূর্ব পাকিস্তান সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তারপরতো আক্রমন করে বসে পুর্বপাকিস্তানে। অস্রের চেয়ে ধর্মের ব্যবহার প্রাধান্য দেয় দুর্বল পাকিস্তান। তাতেও পুর্বপাকিস্থানের নিকট পরাজয় নিশ্চিত ছিল পশ্চিম পাকিস্থানিদের। এখন মিডিয়ার উম্মুক্ততায় মানুষ যখনের খবর তখন পেয়ে যায়, ৭১ এ এরকম জানার কোন সোর্স ছিলোই না। পুর্বপাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান যুদ্ধরত অবস্থায় এবং চারিদিক থেকে কোনঠাসা হয়ে পড়তেছিল এমতাবস্থায় ৩রা ডিসেম্বর ১৯৭১ এ ভারতকে আক্রমন করে বসে পশ্চিম পাকিস্তান, এবং গর্বের সাথেই আক্রমন করে, এবং এই আক্রমনের একটা নাম ও দেয় অপারেশন চেঙ্গিজ খান নামে। অর্থ্যাৎ পাকিস্তানের এটা সুপরিকল্পিত আক্রমন ছিল। পাকিস্তান আক্রমণ করার আগে ভারত কোন যুদ্ধে নামেনি। কিন্তু এই হামলার ফলে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে প্রবেশ করে বলারচলে হাত ধরে টেনে নামানো হয় যুদ্ধে এবং শুরু হয় ইন্দো পাকিস্তান ওয়ার অফ ১৯৭১।অর্থাৎ, পাকিস্তান নিজেই শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে যুদ্ধের সুযোগ করে দেয়। নিজেকে পরাজিত করার জন্য। আজকে দিল্লি না ঢাকা অথবা ভারতীয় আধিপত্যবাদ প্রশ্ন তোলার জন্য।

ভারত ১৯৭১ সালের এই যুদ্ধকে কোনো আলাদা বিশেষ কোডনেম দেয়নি যেভাবে পাকিস্তান দিয়েছিল অপরেশন চেঙ্গিজ খান।

অমৃতসর বিমানঘাঁটি, পাঠানকোট বিমানঘাঁট, শ্রীনগর বিমানঘাঁটি, অম্বালা বিমানঘাঁটি, আগ্রা বিমানঘাঁটি, হালওয়ারা বিমানঘাঁটি, জোধপুর বিমানঘাঁটি, উত্তরলাই বিমানঘাঁটি, অবন্তীপুর বিমানঘাঁটি, ফরিদকোট বিমানঘাঁটি, সিরসা বিমানঘাঁটি, জামনগর বিমানঘাঁটি, এছাড়াও কিছু রাডার স্টেশন ও সামরিক অবকাঠামোতেও হামলা করেছিল পশ্চিম পাকিস্তান।

এই হামলার সিদ্ধান্তটি সামরিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে বড় একটি ভুল হিসেবে বিবেচিত হয়।

পাকিস্তান প্রথম আক্রমণকারী হওয়ায় বিশ্ববাসীর চোখে আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়। ফলে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি ভারতের ও বাংলাদেশের দিকে চলে যায়। পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) পাকিস্তানের অবস্থা আগেই দুর্বল ছিল। পশ্চিম ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু করায় তাদের সেনাবাহিনী বিভক্ত হয়ে যায় এবং পূর্বাঞ্চল আরও অসহায় হয়ে পড়ে।
পাকিস্তান ভেবেছিল হঠাৎ আক্রমণ করে ভারতের বিমান শক্তি ধ্বংস করতে পারবে। এবং দোষটা পুর্বপাকিস্তানের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে বিশ্বের কাছে পুর্বপাকিস্তানকে হে হেয় করে ভারত আক্রমন করলে পুর্বপাকিস্তান কে পরাজিত করে স্যারেন্ডার করালে দুই পাকিস্তান মিমাংশায় বসে সমাধান হবে। কিন্তু তা সফল হয়নি, বরং ভারত দ্রুত পাল্টা আক্রমণ করে শক্তিশালী অবস্থান নেয়। ভারত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় মুক্তিযুদ্ধ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যায়। যৌথ বাহিনী (ভারত + মুক্তিবাহিনী) অল্প সময়েই পাকিস্তানকে পরাজিত করে স্যারেন্ডারে বাধ্য করে। পশ্চিম পাকিস্থানিদের বরাবর একটা সুবিধা সব সময়ই ছিল নিজেরা চরম অন্যায় করেও দোষটা ভারতের কাঁধে চাপিয়ে দিলেই সাত খুন মাফ পেতে পারতো। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে ভারত ইস্যু সব সময়ই উত্তেজনাকর। এখন এসব কাজে লাগায় ইতর শ্রেনীর টাউটার বাটপারেরা। আর মানুষ উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে ইউজ হয়ে যায়।

এই সব নিয়ম মেনে যখন বাংলাদেশের বিজয় সুচিত হল এবং এই বিজয়ের গর্বকে ম্লান করতে অথবা “ধিক্কার জানানো পরাজয়” কে মেনে নিতে না পেরে ঐ পাকিস্তান পন্থী লোকজনেরা জামায়াত বদ্ধ হয়ে আর অনেকে জামায়াত বদ্ধ না হয়েও বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে, বাংলাদেশের ভাষাকে, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত কে, বাংলাদেশের বাঙ্গালীকে, বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে অপমার বাঙ্গালীকে প্রত্যাখান ও বিরোধীতা করতে কখনো ইসলামের সংজোযন আবার কখনো ভারতীয় আধীপত্য দেখিয়ে বাঙ্গালীর মানষীকতা বিষিয়ে তুলছে, এই বিষীয়ে তোলার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিনের। সেই ৭১ এর পর থেকে ৭১ বিরোধীরাই যুদ্ধে পরাজয়ের পর থকে।

আপনি দেশের সর্বোচ্চ উন্নয়ন করবেন, আপনি দেশের মানুষকে সব দিক থেকে ভালো রাখবেন। আপনি সব দিক থেকে সৎ থাকবেন, তারপরেও আপনাকে ইসলাম বিরোধী ট্যাগ যদি দেয়া যায় কোনমতে তাইলে আপনার ঐ অর্জিত উন্নয়ন, সব মানুষকে ভালো রাখা আর আপনার হান্ড্রেড পার্সেন্ট সততা ওসব মানুষ মনে রাখবে না। ওসব মানুষ আর খাবে না, মানুষ আপনাকে পিষে ফেলবে, উৎখাত করবে।

ভারতকে হিন্দুস্থান জানে সবাই। অনেক মানুষই বোঝে ভারত ইসলামের পক্ষে নয়, অর্থ্যাৎ ভারতের পক্ষে যারা- তারাও ইসলামের পক্ষে নয়। এরকম বোঝানো হয় ৭১ এর পরাজিত দল জামায়াতের পক্ষ থেকে। মানুষ তাদের বাহ্যিক সুরত দেখে বিশ্বাস ও করে। মানুষ এও বিশ্বাস করে বাংলাদেশে ভারত আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, আর এর জন্য বাংলাদেশের ভেতর থেকেই কিছু মানুষ এর সহযোগীতা করে, এরা ভারতের দালাল। এই ভারতের দালালেরা অবশ্যই ইসলাম বিরোধী। এটা হল সূত্র। এই সুত্র যার উপর প্রয়োগ করা হবে সে যতই বড় ভাল মানুষ হউক অথবা যতই বড় ইসলামীক মানুষ হউক অথবা সৎ সে ফাইনাল।

৭১ এ পাকিস্থানীরা বাঙ্গালীদের হাতে পরাজীত হবার পরে তাদের বাংলাদেশ নিয়ে আর কোন প্রশ্নের উপায় ছিল না বা নেই। কারন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সকল নিয়ম মেনেই পাকিস্থান কে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে তারপর লড়াই সংগ্রাম করে তারপর পরাজিত করেছে। এই স্বাধীনতা শক্তি বিপন্ন করতে দেশের অভ্যন্তরেই অনেক চক্রান্ত গেছে, সেই সুযোগের সুযোগ নিয়েছে, যুদ্ধে পরাজিত জামাত; যাদের এই বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলার মতন কোন উপায় নেই; যদিও বলবেও না কোন দিন; সেই জামায়াত ইসলাম ও ভারতীয় আধীপত্যবাদকে পুজি বানিয়ে রাজনীতি চালাচ্ছে সহজ সরল বাঙ্গালীদের ঘীরে। একদিন সফলকাম হলে ৭১ এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত করবে এই বাংলাদেশকে পুর্ব পাকিস্তান নামে। অনেকেই এসব বোঝে এবং প্রকাশ্যেও স্বীকার করে এবং এসব যারা বোঝেনা তাদের জন্য হুক বা চুম্বক হল সমস্থ বাঙ্গালীয়ানাকে ইসলাম বিরোধী বোঝানো আর ভারতীয় আধীপত্যবাদ নামক বায়বীয় এক ঘৃন্যা তৈরীর মাধ্যমে কিছু মানুষ বা দলকে ভারতীয় দালাল ট্যাগ দিয়ে তাদেরকে ইসলাম বিরোধী বোঝানো। ব্যস ইসলাম বিরোধী খতম করতে সবাই প্রস্তুত তাতে সে যতই ইসলামিক হউক মুমিন হউক আর ভাল মানুষ হউক।

৭১ এ বাংলাদেশ স্বাধীনতায় বিজয় অর্জনের পর পাকিস্থানিদের পক্ষে নেতৃত্ব দেয়া জামায়াত দলটি বাংলাদেশের পক্ষে কোনদিন কাজ করবেনা এটা বাংলাদেশের সব মানুষই ভাল ভাবে জানে। তাইলে বাংলাদেশে তাদের রাজনীতিটা কি? প্রশ্ন থেকে উত্তর ও জানে সবাই।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে নেতৃত্ব দেয়া দলটির সরাসরি বিরোধীতা করতে গেলে, বোকা মানুষও সমর্থন করবে না। কিন্তু স্বাধীনতার বিপক্ষে থাকা দলটির বাংলাদেশ স্বাধীনতার পক্ষের দলটিকে ঘায়েল করতে পারলেই ৭১ এর পরাজয়ের প্রতিশোধ হবে চরমের এবং এই বাংলাদেশ কে পুর্বপাকিস্তানে ফিরিয়ে নেবার রাস্তা হবে প্রসস্থ। তাতে লাভের লাভ কি হবে? তাদের শোধ প্রতিশোধ। পুর্ব পুরুষদের অপমানের বদলা। আর আমাদের লাভ? পাকিস্থানের মতন অবস্থা হবে আমাদের।

তারা নিজেদের ডেভেলপমমেন্টের জন্য আমাদের চুষে চুষে তারা মোটা তাজা হবে। সাম্প্রদায়িক বৈষম্য বাড়বে প্রচন্ড। ফলে ভারতে রয়ে যাওয়া মুসলমানদের প্রতি আরো অত্যাচার বাড়বে। আমাদের জীবন মান ধ্বংস হবে। আমরা বাঙ্গালী আমাদের নিজস্বতা বিঘ্নিত হবে। আমাদের স্বাধীনতা ভুলুন্ঠিত হবে। চাইলেও আর কোনদিন আমাদের স্বাধীনতার আর অর্জিত হবে না।

যারা মনে করে এই দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা বলে শ্লোগান দিয়ে সোয়াব অর্জন করা যায়, অথবা ভারতের দালাল বলে কাউকে চিন্হিত করে তারে পিটাইলে বেশী সোয়াব হবে এই রকম মানষিকতা সম্পন্ন মানুষ তৈরীতে যাতে করে এই বাংলাদেশ কে পুর্বের পাকিস্তানে রিটার্ন করা যায় এবং ৭১ এর পরাজয়ের প্রতিশোধ চরম ভাবে নেওয়া যায় সেই লক্ষে যারা কাজ করে যাচ্ছে ইসলামের লেবাসে ভারতীয় আধীপত্যবাদকে পুজি করে এসব বিষয় এখন গোপন কিছু না। অর্থ্যাৎ যার কিছুই নাই তার সফল হতে একমাত্র পুজি হল ভারতীয় আধিপত্যবাদ।

গোপন যা তা হল, যখনি দেখবেন ভারতীয় আধীপত্য নিয়ে যখন কেউ ম্যাতাচ্ছে বা চিল্লাচ্ছে বুঝে নিবেন আসলে সে হয় টাউটার, নইলে বাটপার, আর নাহয় জামাত শিবির, আসিফ নজরুল, হাসানাত, ইউনুস এদের টাইপের কেউ।


শেয়ার করতে ক্লিক করুন:

আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বৃক্ষ রোপণের বড় চ্যালেঞ্জ পরিচর্যা নিশ্চিত করা : তথ্যমন্ত্রী
বরিশালে বাড়ছেই ডেঙ্গু, চলতি মাসে ‍আক্রান্ত ১৪৫০
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়: অর্ধেক শিক্ষকের পদ ফাঁকা শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ
আগুনে পোড়া ভবনে ৭.৪২ কোটি টাকার ‘ভুতুড়ে’ সংস্কার: বিসিসির অর্থ লোপাটের চাঞ্চল্যকর চিত্র
Recent: Mayor Hiron Barisal
Recent: Barisal B M College
Recent: Tender Terror
Kuakata News

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
আমাদের বরিশাল ২০০৬-২০২০

প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক: মোয়াজ্জেম হোসেন চুন্নু, সম্পাদক: রাহাত খান
৪৬১ আগরপুর রোড (নীচ তলা), বরিশাল-৮২০০।
ফোন : ০৪৩১-৬৪৫৪৪, ই-মেইল: hello@amaderbarisal.com