জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও বরিশাল মৎস্য অফিসের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও অস্বচ্ছতার কারণে তারা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ইলিশের নিরাপদ প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময় নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করে সরকার। এ নিষেধাজ্ঞার সময় ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করতে ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’-এর আওতায় বিকল্প আয়ের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়।
এরই অংশ হিসাবে বরিশাল সদর উপজেলায় নিবন্ধিত জেলেদের মাঝে বাছুর বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত জেলেদের বাদ দিয়ে অজেলেদের সুবিধাভোগীদের তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। বিতরণ করা হয়েছে নিম্নমানের বাছুর। একই ব্যক্তি পেয়েছেন একাধিকবার সুবিধা। ফলে সরকারের কোটি টাকার পুনর্বাসন প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন প্রকৃত জেলেরা। সরেজমিন অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৫৫০ জন। ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’-এর আওতায় ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৫০৯টি বাছুর বিতরণ করা হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, মাত্র ৪১ জন নিবন্ধিত জেলে এ সুবিধা পাননি। কিন্তু সরেজমিন তদন্তে এ তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার বড় ধরনের অমিল পাওয়া গেছে।
চন্দ্রমোহন, টুঙ্গিবাড়িয়া, চরমোনাই ও শায়েস্তাবাদ ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, বহু নিবন্ধিত জেলে এখনো কোনো সুবিধাই পাননি। অথচ যারা নিয়মিত মাছ ধরার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন বা জেলে হিসাবে পরিচিত নন, তাদের নাম রয়েছে সুবিধাভোগীর তালিকায়। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রকৃত জেলেরা। চন্দ্রমোহন ইউনিয়নের নিবন্ধিত জেলে খালেক ব্যাপারী জানান, ২৫ বছর ধরে নদীতে মাছ ধরছেন। কিন্তু বাছুর বিতরণের বিষয়ে তাকে কখনো জানানো হয়নি। উপজেলা মৎস্য অফিস থেকেও কোনো ধরনের সহায়তা পাননি। একই ইউনিয়নের আরেক জেলে রহিম সর্দার জানান, তারা এ প্রকল্প সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নের জেলে বাদশা ফকির জানান, বাপ-দাদার আমল থেকে তারা জেলে পেশায় রয়েছেন। সরকার বিভিন্ন সুবিধা দিলেও তার ভাগ্যে এখনো কিছুই জোটেনি। চরমোনাই ইউনিয়নের জেলে সবুজ ঘরামি জানান, ২০২৩ সালে তিনি একটি ছোট বাছুর পেয়েছিলেন। কিন্তু সেটি ছিল অপুষ্টিতে ভোগা, ছোট ও রোগাক্রান্ত। মাত্র তিন মাসের মাথায় বাছুরটি মারা গেছে।
আবার কেউ কেউ অভিযোগ করেন, তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির ও আর্থিক লেনদেন হয়েছে। শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নে ২০২৫ সালে ২২টি বাছুর বিতরণ করা হলেও সেখানকার সুবিধাভোগীরাও বাছুরের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, অনেক বাছুরই ছিল আকারে ছোট ও বাজারমূল্যের তুলনায় নিম্নমানের। শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মালেক গাজী বলেন, প্রকৃত জেলেদের পরিবর্তে অন্য পেশার লোকজনকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এমনকি প্রভাব ও টাকার বিনিময়ে কেউ কেউ দুই থেকে তিনবার বাছুর পেয়েছেন। এতে প্রকৃত দরিদ্র জেলেরা বঞ্চিত হয়েছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বরিশাল সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জামাল হোসেন প্রথমে বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং প্রকল্প পরিচালক এ বিষয়ে তথ্য দিতে নিষেধ করেছেন। পরে বিষয়টি জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জামানকে জানানো হলে তিনি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে তথ্য দেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর জামাল হোসেন দাবি করেন, সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করেই সুবিধাভোগী নির্বাচন ও বাছুর বিতরণ করা হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, দু-এক জায়গায় কিছু অনিয়ম হয়েছে। পরে আমরা বিষয়টি জানতে পেরেছি।
আমাদের বরিশাল ডটকম -এ প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
(মন্তব্যে প্রকাশিত মত মন্তব্যকারীর একান্তই নিজস্ব। amaderbarisal.com-এর সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে এসব অভিমতের মিল আছেই এমন হবার কোনো কারণ নেই। মন্তব্যকারীর বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে amaderbarisal.com কর্তৃপক্ষ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)
বরিশালের নদ-নদীতে ইলিশের দেখা, মা মাছ নিয়ে শঙ্কা