ভাষা আন্দোলনে পটুয়াখালী
 মহান ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে নির্মিত পটুয়াখালীর শহীদ স্মৃতি পাঠাগার – ফাইল ছবি
বাংলা ভাষার দাবিতে তৎকালীন সমগ্র পূর্ব বাংলা যখন উচ্চকন্ঠ, তখন সেই আন্দোলনের ঢেউ উঠেছিল পটুয়াখালীতেও। সেদিন টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত “রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই” এ সোগানের ঢেউ ব্যাপকভাবে আন্দোলিত করেছিল সাগর বিধৌত মহকুমা শহর পটুয়াখালী।
সে সময় এই এলাকার মানুষ শুধু ঢাকায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই নয় পটুয়াখালীতেও রাখেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে সে কথা আজও রয়ে গেছে অজানা। সেদিনের ভাষা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী ভাষা সৈনিকরা প্রায় সকলেই আজ প্রয়াত।
সে সময় পটুয়াখালী ছিল বরিশাল জেলার একটি মহকুমা। ১৯৫১ সালে যুবলীগ প্রতিষ্ঠার পর বরিশাল জেলা যুবলীগ সভাপতি হন পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ থানার রামপুর গ্রামের আলী আশরাফ ও সম্পাদক হন গলাচিপা থানার বড় বাইশদা গ্রামের আবদুল করিম মিয়া। ভাষা আন্দোলনে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে এই সংগঠন।
ওই বছরের ২৩ ডিসেম্বর পটুয়াখালী শহরের সদর রোড নুতন বাজার এলাকায় আজাদ ফার্মেসীর পূর্ব পার্শ্বে কাদের হাওলাদারের বাসায় গোপন বৈঠকে আবদুল করিম মিয়া কে সভাপতি ও কবি খন্দকার খালেককে সম্পাদক করে গঠন করা হয় “পটুয়াখালী মহকুমা ভাষা আন্দোলন আহ্বায়ক কমিটি”। পরে এ কমিটির নামকরণ করা হয় “রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ”।
বরিশাল যুবলীগের সভাপতি পটুয়াখালীর আলী আশরাফ ছিলেন রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদের অবিসংবাদিত নেতা। বরিশাল জেলা রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ছিলেন পটুয়াখালীর গলাচিপা থানার ইছাদি গ্রামের আবুল হাশেম। উভয়ের বাড়ী পটুয়াখালীতে হওয়ায় তারা সিদ্ধান্ত নেন বরিশালের সাথে তাল মিলিয়ে পটুয়াখালীতেও ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করার।
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ কমিটি পুনর্গঠনের লক্ষ্যে পটুয়াখালী আসেন বরিশাল জেলা কমিটির আহ্বায়ক আবুল হাশেম। ১৯৫২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কাদের হাওলাদারের বাসায় পুনঃরায় গোপন বৈঠকে বসে কবি খন্দকার খালেককে আহ্বায়ক ও জালাল উদ্দিন আহমেদকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় “পটুয়াখালী মহকুমা রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ”। ঐ কমিটিতে অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন- গাজী আজাহার উদ্দিন, আবুল হোসেন আবু মিয়া, এ্যাডভোকেট গোলাম আহাদ চৌধুরী, জয়নাল আবেদীন শিকদার, এ টি এম ওবায়দুলাহ, রাখাল ব্যাণার্জী, আবদুল খালেক, বীরেশ্বর বসু, শিক্ষক অতুল চন্দ্র দাস, ধ্রুব জ্যোতি দত্ত, মজিবুর রহমান নয়া মিয়া, শাহাদত উলাহ, কাজল আহমেদ, দেবী দাস, এ্যাডভোকেট আবদুল মতলেব, শ্যামল চট্টপাধ্যায়, দলিল উদ্দিন আহমেদ সহ অন্যরা।
ওই কমিটির মধ্যে না থেকেও সংকটকালীন সময়ে ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করতে গুরুত্বপূর্ন অগ্রণী ভূমিকা রেখে কর্মীদের সংগঠিত ও সাহস যুগিয়েছেন পটুয়াখালী আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এমএলএ মোহাম্মদ এমদাদ আলী এ্যাডভোকেট। একাত্মতা প্রকাশ করে সহযোগিতার হাত বাড়ান বি ডি হাবিবুলাহ, সৈয়দ আশরাফ হোসেন, এ্যাডভোকেট কে বি এম শামসুল হক, আবদুর রাজ্জাক ভেন্ডার, মোহাম্মদ শামসুল হক ভূইয়া, মাখন লাল দেউরি, শামসুল আলম, রাধেশ্যাম দেবনাথ, শংকর লাল দাস, অধ্যাপক গাজী নেছার উদ্দিন, হোসেন মিয়া মোক্তার, মোশারফ হোসেন বিশ্বাস, আবদুল মন্নান মিয়া, ডাক্তার কামরুন নেছা, এ্যাডভোকেট জেবুন নেছা সহ অন্যান্যরা। গ্রেফতার হুলিয়া গুলির মুখে, আপদকালীন সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছিলেন তারা।
ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়ায় ঢাকায় গ্রেফতার হয়ে ১৮ দিন কারাবরণ করেন এমদাদ আলী এ্যাডভোকেটের কন্যা তখনকার কলেজছাত্রী ডাক্তার কামরুন নেছা। বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনে ঢাকার সাথে পটুয়াখালীর যোগসূত্র রাখার দায়িত্ব পালন করেন বাউফলের এ বি এম আবদুল লতিফ ও সৈয়দ আশরাফ হোসেন। রক্ত ঝরা ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত এ সকল নেতৃবৃন্দের আজ অনেকেই প্রয়াত।
কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বায়ান্নের ২১ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখালীর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ও শহরে সর্বাত্মক শান্তিপূর্ণ হরতাল পালিত হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় পুলিশের এক গোপন সূত্রে ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের মিছিলে গুলিবর্ষণে শহীদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হওয়ার খবর আসলে দেখা দেয় উত্তেজনা। মহকুমা সংগ্রাম পরিষদ কমিটি জরুরী বৈঠকে বসেন আজাদ ফার্মেসীর দোতলায়। সিদ্ধান্ত হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি শহরে হরতাল, বিক্ষোভ মিছিল ও জুবিলী স্কুল ময়দানে গণসমাবেশ কর্মসূচি পালনের।
ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত তাৎক্ষনিক পেয়ে যায় স্থানীয় প্রশাসন। হুলিয়া জারি হয় সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে। তাঁরাও গা ঢাকা দিয়ে চলে যান নিরাপদে। উপায় খোঁজেন কর্মসূচি সফল করার। এ সময় এগিয়ে আসেন আওয়ামীলীগ নেতা এমদাদ আলী এ্যাডভোকেট। রাতে শহরের আদালত পাড়ায় বড় মসজিদ মহলা রোডস্থ তার বাসভবনে গোপন বৈঠকে বসেন জয়নাল আবেদীন শিকদার, খন্দকার খালেক, কে বি এম শামসুল হক, জালাল আহমেদ, আবদুল করিমসহ অন্যরা। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন কর্মসূচি সফলের আহবান জানিয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি শহরে লিফলেট বিতরণ ও সমাবেশ করার। খন্দকার খালেকের লেখা “রক্ত শপথ” নামের লিফলেট ছাপাতে ঐ রাতে একমাত্র রাজি হন তৎকালীন আর্ট প্রেসের মালিক মোহাম্মদ শামসুল হক ভূইয়া।
২২ ফেব্রুয়ারি প্রত্যুষে শহরে বিলি করা হয় ওই লিফলেট। উত্তেজিত হয়ে ওঠে ছাত্র জনতা। চর পাড়া পুরাতন রেজিস্ট্রি পুল সড়কে বের হয় বিক্ষোভ মিছিল। রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে কর্মসূচি সফল করতে শহরের আদালত পাড়ায় বড় মসজিদ মহলা রোডস্থ এমদাদ আলী এ্যাডভোকেটের বৈঠকখানার উত্তর পার্শ্বে বড়মসজিদ সংলগ্ন তৎকালীন মাঠে সকাল ১০ টায় অনুষ্ঠিত হয় সমাবেশ। পটুয়াখালীতে প্রথম প্রকাশ্য এ সভায় সভাপতিত্ব করেন এমদাদ আলী এ্যাডভোকেট। ঐ সভায় ২৩ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি সফল করার আহবান জানিয়ে বক্তৃতা করেন বি ডি হাবিবুলাহ, এ বি এম আবদুল লতিফ, আবদুল করিম মিয়া, আলী আশরাফ, এমদাদ আলী এডভোকেটের দুই কন্যা তৎকালীন কলেজ ছাত্রী ডাক্তার কামরুন নেছা ও এডভোকেট জেবুন নেছা। সমাবেশে সর্বস্তরের ছাত্র জনতার উপস্থিতি দেখে টনক নড়ে মহকুমা প্রশাসনের। কর্মসূচি বানচালে আরো তৎপর হয়ে ওঠে প্রশাসন। শুরু হয় নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতারে পাড়ায় মহলায় পুলিশি অভিযান। তল্লাশি চালানো হয় সকল ছাপাখানায়। সন্দেহ হয় আর্ট প্রেসের উপর। সরকারি কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে পাঁচ বছর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকে ওই প্রেসে।
বায়ান্নোর ২৩ ফেব্রুয়ারি উত্তাল হয়ে ওঠে পটুয়াখালী শহর। ঢাকায় ছাত্র হত্যার খবর এসে পৌঁছালে ছাত্র জনতার ঢল নামে রাস্তায়। শহরের মোড়ে মোড়ে ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়ন করা হয় দাঙ্গা পুলিশ। সবকিছু উপেক্ষা করে সকাল ৯ টার মধ্যে জুবিলী স্কুল ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ । স্মরণকালের বৃহৎ গণসমাবেশে মিলিত হয় ছাত্র জনতা। সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ পলাতক থাকায় সংকট দেখা দেয় হুলিয়া মাথায় নিয়ে কে করবেন এই গণসমাবেশের সভাপতিত্ব। তখন সংকট উত্তোরণে সাহসী ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসেন আওয়ামী লীগ সভাপতি এমএলএ এমদাদ আলী এ্যাডভোকেট। উপস্থিত ছাত্র-জনতা গগণ বিদারী সোগান ও করতালি দিয়ে স্বাগত জানান তাকে। এরপর তার সভাপতিত্বে ওই সমাবেশে বক্তৃতা করেন সৈয়দ আশরাফ হোসেন, এ্যাডভোকেট গোলাম আহাদ চৌধুরীসহ অন্যরা।
বক্তৃতাকালে সৈয়দ আশরাফ হোসেন জনতার উদ্দেশ্যে তুলে ধরেন ঢাকা থেকে নিয়ে আসা শহীদ সালামের রক্ত মাখা জামা। এতে আরো বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে জনতা। গণ সমাবেশ শেষ করে পুরো শহর জুড়ে রাস্তায় বের হয় স্মরণকালের সর্ববৃহৎ বিক্ষোভ মিছিল। পালিত হয় স্বতস্ফূর্ত হরতাল। এ সময় পুলিশ বাধ্য হয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্র জনতা। তখন সভাপতির তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত মোতাবেক চলছিল পটুয়াখালীর সব কিছু।
২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে স্টীমারে আসেন তৎকালীন এমএনএ পটুয়াখালীর গলাচিপার সামছুদ্দিন সানু মিয়া ও বেতাগীর আবদুর রহমান খান নুরু মিয়া। জনতা তাদেরকে ঘেরাও করে। বাধ্য করা হয় পদত্যাগ পত্র লিখে দিতে। ফলাও করে তা ছাপা হয় পত্রিকায়। পরে তারা তা অস্বীকার করে বলেন, জোর করে তাদের কাছ থেকে পদত্যাগ পত্র লিখে নেয়া হয়েছে।
মহান ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে পটুয়াখালীতে একটি পাঠাগার স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের জয়লাভে এম এল এ নির্বাচিত হন ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী মোহাম্মদ এমদাদ আলী এডভোকেট ও আবদুল করিম মিয়া। সুযোগ আসে পাঠাগার স্থাপনের। ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িতরা ওই বছর ১৭ এপ্রিল এম এল এ আবদুল করিম মিয়াকে সভাপতি ও জালাল উদ্দিন আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে শহরের নুতন বাজার পুরাতন স্টীমার ঘাটে সৈজদ্দিন মিয়ার টিনের ঘরের দোতলায় প্রতিষ্ঠা করেন শহীদ স্মৃতি পাঠাগার। পরে নতুন বাজার সমবায় ব্যাংকের পিছনে একটি টিনের ঘরে, পোষ্ট অফিসের সামনে হোসেন মিয়া এ্যাডভোকেটের বৈঠক খানার দোতলা, বর্তমান লঞ্চ টার্মিনাল ঘাটের পশ্চিম পাশে মোড়ে একটি ঘরের দোতলায় পর্যায়ক্রমে স্থান পরিবর্তন হয়ে সদস্যদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় শহরের এস ডি ও পুকুরের উত্তর পাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে স্থায়ী পাঠাগার ভবন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের নানা ভয়ভীতি, হুমকি নিপিড়নের মধ্যেও এই পাঠাগারটি পরিণত হয় আন্দোলনের মিলন ক্ষেত্রে। স্বাধীনতা উত্তরকালে এটি শুধু পাঠাগারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। একচ্ছত্র প্রভাব ফেলে জেলার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গনে। প্রয়োজনীয় আনুকল্য না পাওয়ায় এবং সামাজিক অবক্ষয়ের সাথে সাথে পাঠাগারের অতীত কার্য্যক্রম আজ অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্য। বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছে ভাষা আন্দোলনের পটুয়াখালীর ইতিহাস।
বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে পটুয়াখালীতে ১৯৬৪ সনে প্রথম স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মিত হয় পটুয়াখালী সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে। সেখানে শ্রদ্ধা জানাতো সবাই। পরে নব্বই’র দশকে পটুয়াখালী পৌরসভা কর্তৃক পৌরসভা কার্যালয় প্রাঙ্গণে নির্মান করা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।
লেখক: আমিনুর রহমান
(এই লেখাটি ২০১১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ‘আমাদের বরিশাল ডটকম’-এ প্রকাশিত হয়েছিল। পাঠকদের আগ্রহের কথা বিবেচনা করে কিছুটা পরিমার্জন করে প্রতিবেদনটি আবার প্রকাশ করা হলো)
|